সরকারি দলের সদস্য অ্যাডভোকেট ফজলুর রহমানের দেওয়া বক্তব্য কেন্দ্র করে গতকাল জাতীয় সংসদ অধিবেশনে তুমুল উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। বিরোধী দলের সদস্যদের কঠোর সমালোচনা করে ফজলুর রহমান যখন বক্তব্য দিচ্ছিলেন, তখন দফায় দফায় ব্যাপক হইহট্টগোল হয়। একপর্যায়ে অধিবেশনে অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে স্পিকারকে বারবার হস্তক্ষেপ করতে হয় এবং সংসদীয় শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য তিনি কড়া হুঁশিয়ারি দেন।
গতকাল জাতীয় সংসদ অধিবেশনে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর আনীত ধন্যবাদ প্রস্তাব নিয়ে আলোচনাকালে মহান মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে চব্বিশের জুলাই অভ্যুত্থানের তুলনা করায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন ফজলুর রহমান। তিনি বিরোধীদলীয় নেতার উদ্দেশে বলেন, শহীদ পরিবারের কোনো সদস্যের জামায়াতে ইসলামী করা ডাবল অপরাধ। জবাবে বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বলেন, আমার পরিচয় নিয়ে চ্যালেঞ্জ করে উনি গুরুতর অপরাধ করেছেন। এ সময় স্পিকার সামান্য কারণে উত্তেজনা সৃষ্টি না করার আহ্বান জানান। পরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ মন্তব্য করেন, বেশি ইতিহাসচর্চা করতে গেলে ব্যত্যয় হবে। সকলকে সহনশীল হতে হবে।
অধিবেশনে বীর মুক্তিযোদ্ধা ফজলুর রহমান ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, বিরোধী দলের নেতা বলেন, উনাকে আমি অসম্মান করি না, সবসময় ‘মাননীয়’ বলে কথা বলি। কিন্তু উনার দলের লোকজন এখানে বসে আছে, তারা আমাকে ‘ফজা পাগলা’ বলে। তারা নাকি সভ্য! তারা নাকি ইসলামের অনুসারী। বিরোধীদলীয় নেতা আমার চেয়ে ১০ বছরের ছোট। আমার বয়স ৭৮ বছর।
এ পর্যায়ে স্পিকার তাকে প্রশ্ন করেন, আপনাকে কি কেউ এই ধরনের উক্তি করেছে? এরকম তো সংসদে কেউ বলেনি। জবাবে ফজলুর রহমান বলেন, করেছে। স্পিকার পুনরায় বলেন, আপনি কেন নিজের গায়ে টেনে নিচ্ছেন? ফজলুর রহমান তখন জোর দিয়ে বলেন, করেছে।
স্পিকার তাকে বক্তব্য চালিয়ে যাওয়ার অনুমতি দিলে জামায়াতে ইসলামী ও মুক্তিযুদ্ধ প্রসঙ্গে কঠোর মন্তব্য করেন ফজলুর রহমান। তিনি বলেন, আচ্ছা, বিরোধী দলের নেতা বলেছেন, উনি মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদ পরিবারের লোক। উনি জামায়াতে ইসলামী করেন। এটা ডাবল অপরাধ। মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের লোক কেউ জামায়াত করতে পারে না। শহীদ পরিবারের লোক জামায়াত করা ডাবল অপরাধ।
তার এই মন্তব্যের পরপরই সংসদে ব্যাপক হট্টগোল শুরু হয়। বিরোধী দলের হট্টগোলের প্রতিবাদ জানাতে থাকেন সরকারি দলের সদস্যরা। স্পিকার পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করেন। তখন ফজলুর রহমান আবারও বলেন, আমি আবারও বলে রাখলাম, শহীদ পরিবারের লোক তো জামায়াত করতেই পারে না। আর জামায়াত করলে ডাবল অপরাধ করতেছে। বক্তব্যের যারা প্রতিবাদ জানাচ্ছিলেন তাদের দেখিয়ে তিনি বলেন, ওই দেখেন, তারা কী ধরনের আচরণ করছে। এ সময় স্পিকার দাঁড়িয়ে যান। সংসদের হুইপরাও সদস্যদের থামানোর চেষ্টা করেন। তখন সংসদীয় রীতিনীতি স্মরণ করিয়ে দিয়ে স্পিকার বলেন, সংসদ সদস্য ফজলুর রহমান, অপেক্ষা করুন। এটি বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ। এখানে প্রত্যেকেই নির্বাচিত হয়ে এসেছেন। দয়া করে বসুন। সারা জাতি দেখছে, লাইভ টেলিকাস্ট হচ্ছে। আমি প্রতিদিনই বলি যে, ‘রুলস অব প্রসিডিউর’ বইটা একটু পড়েন। যদি এই সংসদ বিধি মোতাবেক পরিচালিত না হয়, এটি আর জাতীয় সংসদ থাকবে না। তিনি বলেন, প্রত্যেকেরই বাকস্বাধীনতা আছে। সামান্য কারণে উত্তেজনা সৃষ্টি করা ঠিক না। যদি সরকারি দলের কোনো সদস্যের বক্তব্যে আপত্তি থাকে, আপনারা পরে জবাব দেবেন। কিন্তু এই যে শিশুরাও লজ্জা পাবে এই ধরনের আচরণে।
এরপর ফজলুর রহমান আবারও বক্তব্য শুরু করে যুদ্ধাপরাধীদের শোক প্রস্তাব ও ইনডেমনিটি ইস্যুতে কথা বলেন। তিনি বলেন, ১৯৭১ সনের ১৪ ডিসেম্বরকে পালন করা হয় শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস। সেই মুনীর চৌধুরী, আবদুল আলীম চৌধুরী, শহীদুল্লাহ কায়সারসহ শত শত বুদ্ধিজীবীকে যারা হত্যা করেছিল, তাদেরকে বলা হয় আলবদর। ইতিহাসে ভুল বার্তা যাবে যদি আমরা যুদ্ধাপরাধীদের ব্যাপারে শোক প্রস্তাব নিই। তিনি আরও বলেন, পুলিশের ব্যাপারে যে ইনডেমনিটি দেওয়া হয়েছে, ৫ আগস্টের পরে যে থানা লুট হয়েছে, পুলিশ হত্যা হয়েছে, তারা তো তখন যুদ্ধ করেনি। এত অস্ত্র গেল কোথায়? ৫ আগস্টের পরে যে ঘটনাগুলো হয়েছে, সেগুলো তো কোনো আইনে ইনডেমনিটি পাওয়ার কথা না। সেটার জন্য তদন্ত হওয়া উচিত। ওই সকল ঘটনার বিচার হতে হবে।
প্রধানমন্ত্রীর প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করে সতর্কবাণী উচ্চারণ করেন ফজলুর রহমান। তিনি বলেন, সর্বশেষ কথাটি হলো, আমার মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আমি যাকে ভীষণ শ্রদ্ধা করি। দেশের ভিতরে যতই চক্রান্ত হোক, আমার নেতা সংসদ নেতা অনেক মহান কাজ করেছেন। কিন্তু সিরাজউদ্দৌলা আর মোহাম্মদী বেগ কিন্তু এক না। তারা একই মায়ের দুধ পান করলেও মোহাম্মদী বেগ কিন্তু সিরাজউদ্দৌলাকে হত্যা করেছিল।
গণ অভ্যুত্থানকে মহান মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে তুলনা করায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে ফজলুর রহমান বলেন, মুক্তিযুদ্ধ আর ৫ আগস্টের গণ অভ্যুত্থান এক নয়। হিমালয় পর্বতের সঙ্গে টিলার যেমন তুলনা হয় না, তেমনি মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে ৫ আগস্টের তুলনা করাও অন্যায়। ৫ আগস্টের যোদ্ধাদের আমি ছোট করে দেখছি না। যারা শহীদ হয়েছেন, তাদের প্রতি আমি শ্রদ্ধা নিবেদন করি। আমি নিজেও এই আন্দোলনে ছিলাম। শেখ হাসিনার পতন না হওয়া পর্যন্ত আমার যুদ্ধ চলবে বলেছিলাম। তাই বলে ৫ আগস্ট কোনো বিপ্লব নয়, এটি হলো গণ অভ্যুত্থান। সেই গণ অভ্যুত্থানকে যারা মুক্তিযুদ্ধ এবং মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে তুলনা করতে চায়, আমি বলব এটা বলাই অন্যায়। কারণ মুক্তিযুদ্ধ মহাসমুদ্রের চেয়েও গভীর। তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বাধীনতা সংগ্রাম এক দিনে হয়নি। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, মওলানা ভাসানী ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতা সংগ্রামের ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন। সেই ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়েই ১৯৭১ সনে শহীদ জিয়াউর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিলেন। যতদিন বাংলাদেশ থাকবে, এদেশের জঙ্গলে রয়েল বেঙ্গল টাইগার থাকবে, ততদিন মুক্তিযোদ্ধারা জিতবে।
ফজলুর রহমানের বক্তব্যের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বলেন, উনি মুক্তিযুদ্ধে তার অবদানের কথা বলেছেন; কিন্তু নিজের অবদান বলতে গিয়ে আরেকজনের অবদানের ওপর হাতুড়ি পেটানোর অধিকার কাউকে দেওয়া হয়নি। তিনি ব্যক্তিগতভাবে আমাকে আঘাত করেছেন। আমি বলে থাকি আমি শহীদ মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সদস্য, উনি এটাকে চ্যালেঞ্জ করেছেন। ‘উনি বলেছেন, কোনো মুক্তিযোদ্ধা কিংবা শহীদ মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের কেউ জামায়াতে ইসলামী করতে পারে না। তাহলে কি ওনাকে জিজ্ঞেস করে দল করতে হবে? এটি আমার নাগরিক অধিকার। আমি কোন দল করব, কোন আদর্শ অনুসরণ করব এর ওপর হস্তক্ষেপ করার ন্যূনতম কোনো অধিকার রাষ্ট্র কিংবা সংবিধান কাউকে দেয় নাই। আমি এটার তীব্র নিন্দা জানাই। তিনি আমার পরিচয়ের ব্যাপারে কথা বলে গুরুতর অপরাধ করেছেন।’
এরপর সংসদ সদস্য ফজলুর রহমান ফ্লোর চাইলে তাকে উদ্দেশ্য করে স্পিকার বলেন, ‘এখন আর কথা না বললেও চলে। সংসদ উত্তপ্ত হোক এটা আমরা চাই না।’ স্পিকার রুলিং দিয়ে বলেন, ফজলুর রহমান ও বিরোধী দলীয় নেতার বক্তব্যে অসংসদীয় কোনো কিছু যদি থাকে, সেটা এক্সপাঞ্জ করা হবে।
এরপর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ দাঁড়িয়ে কথা বলতে চাইলে স্পিকার জানতে চান, তিনি কোন বিষয়ের ওপর বলবেন। জবাবে তিনি বলেন, আমি কোনো উত্তেজনা সৃষ্টি করব না, সংসদের স্বার্থে। যে অ্যাটমোসফিয়ারে আমরা এখানে আলাপ আলোচনা করি, মাঝেমধ্যে সেটা কিছু উত্তেজনা সৃষ্টি হবেই, সেটা স্বাভাবিক। ফজলুর রহমান ‘ইতিহাসে সমৃদ্ধ’ প্রবীণ সংসদ সদস্য। আমরা এখন ভূগোলে আছি। আমরা বেশি ইতিহাসচর্চা করতে গেলে মাঝেমধ্যে কিছু ব্যত্যয় হবে। আমার মনে হয়, নতুন করে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের ভিত্তিতে জাতিকে আর বিভক্ত না করি। সংসদের কার্যক্রম এমনভাবে চালাতে হবে, যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এবং জুলাই যোদ্ধারা বুঝতে পারে, জাতির প্রত্যাশা পূরণের জন্য সংসদ সদস্যরা এখানে আছেন।