বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের সাম্প্রতিক টানাপোড়েন উভয় সরকারের জন্যই উদ্বেগের কারণ হওয়ার সংগত কিছু ব্যাখ্যা আছে। তবে এটি যেন নিজেদের বানানো কোনো সংকট হয়ে না ওঠে, মাখায় রাখতে হবে সেটিকেও। ভৌগোলিক অবস্থান, ইতিহাস, বাণিজ্য, যৌথ নদী, নিরাপত্তা এবং দুই দেশের মানুষের মধ্যকার গভীর সম্পর্ক-এই দুই প্রতিবেশীকে এমনভাবে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রেখেছে যে কোনো পক্ষই একে অস্বীকার করতে পারবে না। রাজনৈতিক দ্বিমত থাকবেই, তবে সেই দ্বিমত সামগ্রিক সম্পর্কের ওপর চেপে বসতে দেওয়াটা সম্পূর্ণ নিজস্ব পছন্দ। একটি কঠিন মুহূর্তের বিচক্ষণ প্রতিক্রিয়া কখনোই আত্মসমর্পণ বা সংঘাত নয়; এর একমাত্র উপায় হলো সংলাপ। আশার কথা হলো, ঢাকা ও দিল্লি উভয় পক্ষই বর্তমান সংকট উত্তরণের প্রয়োজনীয়তা অনুধাবন করতে পারছে, তার লক্ষণ এখন স্পষ্ট। কূটনৈতিক টানাপোড়েনের পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে ভারতের হাইকমিশনার দিনেশ ত্রিবেদীর মধ্যকার বৈঠকটি একটি আশাব্যঞ্জক ঘটনা। বৈঠকের ইতিবাচক সুর ইঙ্গিত করে যে উভয় পক্ষই সাম্প্রতিক তিক্ততা ভুলে বৃহত্তর সম্পর্কের দিকে মনোনিবেশ করতে প্রস্তুত। এই সুযোগটি সতর্কতার সঙ্গে কাজে লাগাতে হবে।
৫ আগস্ট নয়াদিল্লিতে সাংবাদিকদের উদ্দেশে শেখ হাসিনার বক্তব্য ঢাকায় স্বাভাবিকভাবেই তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে। বাংলাদেশের আদালতে দণ্ডিত একজন ব্যক্তিকে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ দেওয়াটা বাংলাদেশ ভালোভাবে নেয়নি। বাংলাদেশ সরকার একে দেশের সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় মর্যাদার ওপর আঘাত হিসেবেই বিবেচনা করছে। তবে বাংলাদেশের উদ্বেগ আমলে নিয়ে নয়াদিল্লিও এ ব্যাপারে তাদের ব্যাখ্যা দিয়েছে। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, একটি বেসরকারি সংবাদমাধ্যমের আয়োজিত ওই অনুষ্ঠানে ভারত সরকারের কোনো ভূমিকা ছিল না এবং সেখানে দেওয়া কোনো বক্তব্যকে, বিশেষ করে বাংলাদেশের নির্বাচিত সরকার নিয়ে করা মন্তব্যগুলোকে তারা সমর্থন করে না।
এই ব্যাখ্যা হয়তো ঢাকার উদ্বেগকে পুরোপুরি প্রশমিত করবে না। তবে কূটনীতির নিয়মই হলো যখনই কোনো ইতিবাচক বা গঠনমূলক সংকেত আসে, সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোকে তা অনুধাবন করে পদক্ষেপ নিতে হয়, সামনে এগিয়ে যাওয়ার পথ খুঁজতে হয়। দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই ত্রিবেদীও বরাবরই সৌহার্দ্যপূর্ণ সুর বজায় রেখেছেন। তিনি জোর দিয়ে বলেছেন, দুই দেশের মধ্যকার সমস্যাগুলো পারস্পরিক বোঝাপড়ার মাধ্যমে সমাধান করা সম্ভব এবং দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে তিনি আশাবাদী। এখন মূল চ্যালেঞ্জ হলো এই কূটনৈতিক আশাবাদকে একটি টেকসই ও ধারাবাহিক সম্পর্কে বদলে দেওয়া।
বাংলাদেশ ও ভারত আগেও এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছে। তাদের ইতিহাসে যেমন জটিল বিবাদের নজির রয়েছে, তেমনি সফল কূটনীতিরও বহু উদাহরণ রয়েছে। কঠিন সমস্যাগুলোকে দীর্ঘকাল ধরে জিইয়ে রেখে বা অবহেলা করে সাধারণত কোনো সমাধান পাওয়া যায় না। তাই এই মুহূর্তের প্রধান অগ্রাধিকার হওয়া উচিত দ্বিপক্ষীয় যোগাযোগ ও সম্পৃক্ততাকে আরও নিয়মিত করে তোলা। সম্পর্ক যখন কোনো চাপের মুখে পড়বে কেবল তখনই নয়, বরং পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের নিয়মিত বৈঠকে বসা উচিত। রাজনৈতিক ও আইনি বিষয়, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, বাণিজ্য, যোগাযোগব্যবস্থা, নিরাপত্তা, জ্বালানি এবং পানিসম্পদের মতো বিষয়গুলো মোকাবিলার জন্য বিদ্যমান দ্বিপক্ষীয় কাঠামোকে আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন। এই ধরনের নিয়মিত সম্পৃক্ততা হয়তো সব মতবিরোধ পুরোপুরি দূর করবে না, তবে তা মতপার্থক্যগুলো কমিয়ে আনা, নিয়ন্ত্রণ ও ব্যবস্থাপনা করা অনেক সহজ করে তুলবে।
এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কারণ বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক কোনো নির্দিষ্ট সরকার বা ব্যক্তির রাজনীতির চেয়ে অনেক বড় এবং বিস্তৃত। সীমান্ত এলাকার মানুষের স্থিতিশীলতা প্রয়োজন। ব্যবসায়ীদের প্রয়োজন একটি নির্ভরযোগ্য পরিবেশ। শিক্ষার্থী, সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে অসুস্থ মানুষের অবাধ যাতায়াত প্রয়োজন। বাংলাদেশের স্বার্থ রয়েছে আরও বড় বাণিজ্য, যোগাযোগ এবং জ্বালানি খাতের সহযোগিতায়। অন্যদিকে ভারতের স্পষ্ট স্বার্থ রয়েছে একটি স্থিতিশীল ও সমৃদ্ধ প্রতিবেশী দেশ এবং একটি শান্তিপূর্ণ উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলো নিশ্চিত করার মধ্যে।
বৃহত্তর দ্বিপক্ষীয় এজেন্ডাটি অত্যন্ত ব্যাপক ও গুরুত্বপূর্ণ। রাজনৈতিক মতপার্থক্য যা-ই থাকুক না কেন, পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা, জলবায়ু পরিবর্তন, খাদ্যনিরাপত্তা, জ্বালানি এবং সামুদ্রিক সহযোগিতা বরাবরের মতোই গুরুত্বপূর্ণ থাকবে। গঙ্গার পানিবণ্টন ইস্যুটি গুরুত্বসহকারে এবং দীর্ঘমেয়াদি আলোচনার প্রয়োজনীয়তাকে স্পষ্টভাবে ফুটিয়ে তোলে। ১৯৯৬ সালের গঙ্গা পানিবণ্টন চুক্তির মেয়াদ প্রায় শেষের দিকে, অন্যদিকে তিস্তা চুক্তি এখনো অমীমাংসিত রয়ে গেছে। এগুলো জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে জড়িত অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয় এবং পানির ক্ষেত্রে এটি কোটি কোটি মানুষের জীবিকার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। কেবল প্রকাশ্য বিবৃতির মাধ্যমে এসব সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন কারিগরি আলোচনা, রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং উভয় পক্ষের উদ্বেগের প্রতি পারস্পরিক বোঝাপড়া। একই নীতি এই সামগ্রিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।
সার্বভৌমত্ব, ভারতের ভূখণ্ড থেকে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা এবং বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে যেকোনো ধরনের হস্তক্ষেপের ইঙ্গিতের ব্যাপারে ঢাকার সংবেদনশীল হওয়ার যৌক্তিক কারণ রয়েছে। অন্যদিকে নয়াদিল্লিরও বোঝা উচিত যে এই বিষয়গুলোতে বাংলাদেশের সাধারণ জনগণের অনুভূতির গভীরতা কতটা তীব্র। এই সংবেদনশীলতাগুলোকে অপর পক্ষের উদ্দেশ্য সম্পর্কে একটি স্থায়ী বা চূড়ান্ত ধারণা হিসেবে ধরে নিলে কোনো পক্ষেরই কোনো লাভ নেই।
ঠিক এই কারণেই তারেক রহমান এবং দিনেশ ত্রিবেদীর মধ্যকার সোমবারের বৈঠকটি বিশেষ মনোযোগের দাবি রাখে। এটিকে কেবল একটি কূটনৈতিক সৌজন্যতা হিসেবে বিবেচনা করা ঠিক হবে না। এটি ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের ক্ষেত্রে আরও একটি গঠনমূলক ও ইতিবাচক ধারা প্রতিষ্ঠার সুযোগ তৈরি করে দেয়। আগামী সেপ্টেম্বরে নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠেয় ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনে যোগদানের আমন্ত্রণসহ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ভারত সফরের যে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে, তা উচ্চপর্যায়ের দ্বিপক্ষীয় যোগাযোগের আরেকটি সম্ভাব্য পথ উন্মোচন করেছে। এই সফরটি আদৌ হবে কি না, বা কবে হবে, সেই সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণ ঢাকার। তবে মূল নীতিটি মনে রাখা জরুরি; জাতীয় স্বার্থ এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ থাকলে সরাসরি রাজনৈতিক যোগাযোগের এই সুযোগগুলো অবশ্যই কাজে লাগানো উচিত। দুই দেশের শীর্ষনেতাদের মধ্যকার একটি বৈঠক জটিল দ্বিপক্ষীয় বিষয়গুলো নিয়ে আরও খোলামেলা ও গঠনমূলক আলোচনার জন্য একটি রাজনৈতিক পরিবেশ তৈরি করতে সাহায্য করতে পারে।
ভারতের পক্ষ থেকে এটি নিশ্চিত করা উচিত যেন বাংলাদেশের উদ্বেগগুলোকে যথাযথ গুরুত্বের সঙ্গে শোনা হয়। কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা একক কোনো ঘটনাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা রাজনীতির দ্বারা এই সম্পর্কটি সংজ্ঞায়িত হওয়া উচিত নয়। অন্যদিকে ঢাকারও এটি বোঝা প্রয়োজন যে ভারতের সঙ্গে গঠনমূলক সম্পর্ক বজায় রাখার অর্থ এই নয় যে বাংলাদেশকে তার স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি বিসর্জন দিতে হবে। বাংলাদেশ তার নিজস্ব জাতীয় স্বার্থ অনুযায়ী ভারত ও চীন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, ইউরোপসহ অন্যান্য অংশীদারদের সঙ্গে একযোগে শক্তিশালী সম্পর্ক বজায় রাখতে পারে। একটি আত্মবিশ্বাসী পররাষ্ট্রনীতির জন্য অন্য কোনো দেশের ক্ষতি করে কেবল একজন অংশীদারকে বেছে নেওয়ার প্রয়োজন পড়ে না। একইভাবে গঠনমূলক যোগাযোগের অর্থ এই নয় যে বাংলাদেশ তার স্বার্থ ক্ষুণ্ন হচ্ছে এমন বিষয়গুলোতে নীরব থাকবে। দৃঢ়তা এবং বন্ধুত্ব; এই দুটি বিষয় একে অপরের পরিপন্থি নয়। একটি দেশ তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশীর সঙ্গে স্থিতিশীল সম্পর্ক বজায় রেখেও নিজের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করতে পারে। প্রকৃতপক্ষে এই ভারসাম্য বজায় রাখতে পারাটাই হলো কূটনৈতিক বিচক্ষণতা ও আত্মবিশ্বাসের পরিচয়।
সাময়িক কোনো রাজনৈতিক বিতর্কের জেরে এই দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে ঝুঁকিতে ফেলার চড়া মূল্য উভয় দেশকেই দিতে হতে পারে। কারণ দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা বাড়লে বাণিজ্যপথ, সরবরাহশৃঙ্খল, পরিবহন যোগাযোগ, সীমান্ত এলাকার মানুষের জীবিকা এবং পারিবারিক বন্ধন; সবকিছুই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাই বর্তমান পরিস্থিতি যেমন একদিকে সংযম বজায় রাখার দাবি রাখে, ঠিক তেমনি একটি সুদূরপ্রসারী লক্ষ্যেরও তাগিদ দেয়।
সাম্প্রতিক বৈঠকের মাধ্যমে যে ইতিবাচক পরিবেশ তৈরি হয়েছে, ঢাকার উচিত তাকে কাজে লাগিয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়া। দিল্লিরও উচিত এর ইতিবাচক সাড়া দেওয়া। প্রতিটি মতবিরোধ যেন জনসমক্ষে প্রকাশ্য সংঘাতে রূপ না নেয়, সেজন্য উভয় সরকারেরই উচিত তাদের কূটনীতিক ও কর্মকর্তাদের জটিল সমস্যাগুলো সমাধানের জন্য প্রয়োজনীয় সুযোগ ও পরিবেশ তৈরি করে দেওয়া। উভয় দেশের মধ্যে মতপার্থক্য থাকাটা অনিবার্য। মূল লক্ষ্য এই মতপার্থক্যগুলো পুরোপুরি মুছে ফেলা উচিত নয়, বরং এটি নিশ্চিত করা উচিত যেন এগুলো সামগ্রিক সম্পর্ককে নিয়ন্ত্রণ করতে না পারে।
বাংলাদেশ ও ভারতের সামনে বেছে নেওয়ার মতো পথটি কেবল বন্ধুত্ব অথবা দৃঢ়তার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। একই সঙ্গে উভয়ই বজায় রাখা সম্ভব। একইভাবে জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করা এবং গঠনমূলক সম্পর্ক বজায় রাখার মধ্যেও কোনো সংঘাত নেই। একটি পরিপক্ব রাষ্ট্রের পক্ষে একই সঙ্গে দুটি বিষয়ই সফলভাবে করা সম্ভব। সাম্প্রতিক রাজনৈতিক যোগাযোগের মাধ্যমে যে সুযোগ তৈরি হয়েছে, তা কোনোভাবেই হাতছাড়া করা উচিত নয়। বাংলাদেশ ও ভারতের এখন আরও বেশি আলোচনা করা প্রয়োজন। সাময়িক বিতর্কগুলোর ঊর্ধ্বে উঠে তাদের ভাবা উচিত এবং যে বৃহত্তর স্বার্থগুলো দুই দেশকে একত্রে বেঁধে রেখেছে, সে অনুযায়ী পদক্ষেপ নেওয়া উচিত। আর এটি করার সঠিক সময় এখনই।