শতকরা ২০ ভাগ জ্বালানি খরচ করে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যাবে-এমন প্রযুক্তি নিয়ে পরীক্ষামূলক সাফল্যের দাবি করেছে বগুড়ার পল্লী উন্নয়ন একাডেমি (আরডিএ)। প্রযুক্তিটি বাণিজ্যিক পর্যায়ে নেওয়া সম্ভব হলে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ নেমে আসতে পারে প্রায় ১ টাকা ৫০ পয়সায়। এই সাফল্যের পর বগুড়ায় প্রায় ২৫ কোটি টাকা ব্যয়ে ১ মেগাওয়াট ক্ষমতার একটি পূর্ণাঙ্গ বিদ্যুৎ প্ল্যান্ট স্থাপনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে স্থানীয় পর্যায়ে কম খরচে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পাশাপাশি দেশীয় মেশিনারি ও প্রকৌশল খাতেও নতুন সম্ভাবনা তৈরি হবে। বগুড়ার আরডিএ কর্তৃপক্ষ বলছে, জ্বালানি ছাড়া বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব নয়। তবে ২০ ভাগ জ্বালানি (তেল) খরচ করে শতভাগ বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যাবে কি না বিষয়টি নিয়ে গবেষণা করা হচ্ছে। গত ১৬ আগস্ট বগুড়ার এরুলিয়া এলাকার বানদীঘিতে পরীক্ষামূলক বিদ্যুৎ উৎপাদনের কার্যক্রম প্রদর্শন করা হয়। এ সময় উৎপাদিত বিদ্যুৎ দিয়ে দুটি পাম্প ও একটি ওয়েল্ডিং মেশিন চালিয়ে প্রযুক্তিটির কার্যকারিতা দেখানো হয়। পরীক্ষামূলক কার্যক্রম পরিদর্শন করেন বগুড়া-৬ (সদর) আসনের সংসদ সদস্য রেজাউল করিম বাদশা এবং পল্লী উন্নয়ন একাডেমির ভারপ্রাপ্ত মহাপরিচালক ড. মো. আব্দুল মজিদ প্রামাণিকসহ সংশ্লিষ্টরা। জানা যায়, ফ্লাইহুইলকে সহজভাবে বলা যায় এক ধরনের যান্ত্রিক শক্তি সঞ্চয় ব্যবস্থা। একটি ভারী চাকাকে উচ্চগতিতে ঘোরানোর মাধ্যমে তাতে গতিশক্তি সঞ্চিত হয়। পরে প্রয়োজন অনুযায়ী সেই ঘূর্ণনশক্তি জেনারেটরের মাধ্যমে বিদ্যুতে রূপান্তর করা যায়। আন্তর্জাতিকভাবেও ফ্লাইহুইল প্রযুক্তি বিদ্যুৎ-গ্রিডের স্থিতিশীলতা ও শক্তি সঞ্চয়ের কাজে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। ফ্লাইহুইল ও লো-আরপিএম জেনারেটর সমন্বয় করে বিদ্যুৎ উৎপাদনের একটি দেশীয় মডেল তৈরি করা হয়েছে। গবেষণায় যুক্ত আরডিএর উপপরিচালক কৃষিবিদ প্রকৌশলী ড. মনিরুল ইসলাম জানান, এ প্রযুক্তি নিয়ে কাজ শুরু হয় ২০০৪ সালে। পরবর্তীতে গবেষণা ও প্রযুক্তিগত উন্নয়নের মাধ্যমে এর কার্যকারিতা বাড়ানোর চেষ্টা করা হয়। ২০১৪ সাল থেকে গবেষণার কাজ আরও বিস্তৃত পরিসরে পরিচালিত হচ্ছে। ২০২৫ সাল থেকে পরীক্ষামূলক কার্যক্রমও বড় পরিসরে নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, ‘প্রয়োজনীয় অর্থায়ন এবং কিছু আনুষঙ্গিক যন্ত্রপাতি পাওয়া গেলে পরীক্ষামূলক পর্যায় থেকে প্রযুক্তিটিকে আরও বড় পরিসরে নেওয়া সম্ভব হবে।’ আরডিএর ভারপ্রাপ্ত মহাপরিচালক ড. মো. আব্দুল মজিদ প্রামাণিক জানান, প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী ফ্লাইহুইল প্রযুক্তিতে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় প্রায় ১ টাকা ৫০ পয়সা হতে পারে। একই সঙ্গে ১ মেগাওয়াট ক্ষমতার একটি পূর্ণাঙ্গ প্ল্যান্ট স্থাপনে প্রায় ২৫ কোটি টাকা প্রয়োজন হতে পারে। তিনি বলেন, ‘একই পরিমাণ বিদ্যুৎ সার্বক্ষণিকভাবে সৌরবিদ্যুৎ দিয়ে উৎপাদনের ক্ষেত্রে স্থাপনা ও প্রয়োজনীয় অবকাঠামোতে তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি বিনিয়োগ প্রয়োজন হতে পারে। তবে সৌরবিদ্যুৎ ও ফ্লাইহুইল একই ধরনের প্রযুক্তি নয়। সৌরবিদ্যুৎ মূল শক্তির উৎস হিসেবে সূর্যালোক ব্যবহার করে। আর ফ্লাইহুইল মূলত শক্তি সঞ্চয় ও বিদ্যুৎ রূপান্তরের ব্যবস্থা। তিনি আরও বলেন, ‘১ মেগাওয়াট ক্ষমতার প্রকল্পটি স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয় এবং জলবায়ু ট্রাস্টে জমা দেওয়া হয়েছে। প্রয়োজনীয় অর্থায়ন পাওয়া গেলে পরীক্ষামূলক পর্যায়ের পর পূর্ণাঙ্গ প্ল্যান্ট স্থাপনের কাজ এগিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। পরীক্ষামূলক সাফল্য পূর্ণাঙ্গ বাণিজ্যিক উৎপাদনে রূপ নিতে পারলে এর প্রভাব শুধু বিদ্যুৎ খাতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। স্থানীয়ভাবে ফ্লাইহুইল, শ্যাফট, বিয়ারিং, জেনারেটর, কন্ট্রোল সিস্টেমসহ বিভিন্ন যন্ত্রাংশ তৈরির সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে।’ বগুড়া-৬ আসনের সংসদ সদস্য রেজাউল করিম বাদশা বলেন, ‘কম খরচে বিদ্যুৎ উৎপাদনের এই উদ্যোগ অত্যন্ত সম্ভাবনাময়। প্রযুক্তিটিকে বড় পরিসরে নিয়ে যেতে সরকারের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করার আশ্বাসও দেন তিনি।’