তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকারের মেয়াদ ছয় মাস পূর্ণ হতে চলেছে। এই স্বল্প সময়ের মধ্যে প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশ নিয়ে তাঁর সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার চিত্র পরিষ্কার করেছেন। দীর্ঘ ১৭ বছর পর মাতৃভূমিতে প্রত্যাবর্তন করে জনগণের উদ্দেশ্যে প্রথম ভাষণে তারেক রহমান বলেছিলেন, ‘আই হ্যাভ এ ড্রিম’। জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে সরকার গঠনের পর প্রধানমন্ত্রী তাঁর স্বপ্নের বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে কাজ শুরু করেছেন। প্রধানমন্ত্রীর প্রধান লক্ষ্য হলো বাংলাদেশকে অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ এবং স্বাবলম্বী করা। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভিশন অত্যন্ত স্পষ্ট। তিনি ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশের ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির দেশ গড়তে চান। তিনি জানেন অর্থনীতিই হলো একটি রাষ্ট্রের লাইফ লাইন। আমরা যদি অর্থনৈতিকভাবে এগিয়ে যেতে পারি তাহলে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান, দারিদ্র্যবিমোচন, খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব। তাই দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম দিন থেকেই প্রধানমন্ত্রীর বাংলাদেশ পুনর্গঠনের কেন্দ্রে রয়েছে অর্থনৈতিক উন্নয়ন।
বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হলো বেসরকারি খাত। বেসরকারি খাত যত শক্তিশালী হবে ততই দেশের অর্থনীতি এগিয়ে যাবে। মোট জিডিপি ও প্রবৃদ্ধির প্রায় ৮৬ শতাংশ আসে বেসরকারি খাত থেকে। দেশের বিশাল জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থানের নব্বই শতাংশের বেশি আসে বেসরকারি খাত থেকে। বেকারত্ব হ্রাস এবং গ্রামীণ ও শহর অঞ্চলের মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে সবচেয়ে বেশি অবদান রাখছে বেসরকারি খাত। তাই বাংলাদেশ যদি ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতির দেশ হতে চায় তাহলে অবশ্যই বেসরকারি খাতকে বিকশিত করতে হবে। বেসরকারি খাতের বিকাশের সহায়ক পরিবেশ তৈরি করতে হবে। দেশের বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তা এবং বিনিয়োগকারীরা যদি নির্বিঘ্নে, নিরাপদে এবং সহায়ক পরিবেশে ব্যবসা করতে পারেন তাহলেই বিদেশি বিনিয়োগকারীরা আকৃষ্ট হবেন। তাঁরাও তখন বাংলাদেশে বড় বিনিয়োগে আগ্রহী হবেন। কিন্তু দেশের উদ্যোক্তা, ব্যবসায়ী এবং শিল্পপতিরা যদি বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ না পান তাহলে বিদেশি বিনিয়োগ কোনো দিনই আসবে না। আধুনিক গণতন্ত্রে রাজনীতি এবং অর্থনীতি একসঙ্গে চলে। একটি আরেকটির ওপর নির্ভরশীল। গণতন্ত্র ছাড়া যেমন অর্থনীতি বিকশিত হয় না, ঠিক অর্থনীতি ঠিকঠাক মতো না চললে গণতন্ত্র মুখথুবডে পড়ে। আর বর্তমানে মুক্তবাজার অর্থনীতির বিশ্বে বেসরকারি খাত ছাড়া অর্থনৈতিক বিকাশ অলীক কল্পনা। বিশ্ব অর্থনীতি আজ দাঁড়িয়ে আছে বেসরকারি খাতের ওপর।
কিন্তু বাংলাদেশের বেসরকারি খাত এখন গভীর সংকটে। দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা এবং দলীয়করণের ফলে এমনিতেই বেসরকারি খাত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ২০২৪ সালের আগস্টে ড. ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় আসার পর শুরু হয় বেসরকারি খাত ধ্বংসের সর্বাত্মক তৎপরতা। ব?ব্যবসায়ী, শিল্পোদ্যোক্তাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা ভিত্তিহীন মামলা, বিভিন্ন কলকারখানায় অগ্নিসংযোগ, তথাকথিত অর্থ পাচারের অভিযোগ এনে কোনোরকম তদন্ত ছাড়াই বৃহৎ উদ্যোক্তাদের বিরুদ্ধে আক্রোশমূলক ব্যবস্থা বেসরকারি খাতকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যায়। হাজার হাজার কলকারখানা বন্ধ হয়ে যায়। বেকার হয়ে যান লাখো কর্মী। বেসরকারি খাতে সৃষ্টি হয় আতঙ্ক আর উদ্বেগ। এরকম একটি নাজুক পরিস্থিতিতে দেশ পরিচালনার দায়িত্ব নিয়ে তারেক রহমান বেসরকারি খাত বাঁচাতে গ্রহণ করেছেন নানা ধরনের উদ্যোগ। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর এসব উদ্যোগ এবং পরিকল্পনা বাস্তবায়নে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে সরকারের ভিতরে থাকা নানা শক্তি। প্রধানমন্ত্রীর উদ্যোগ ভেস্তে দেওয়াই যেন সরকারের ভিতরে ঘাপটি মেরে থাকা কিছু গুপ্তের প্রধান কাজ। গত ছয় মাসে প্রধানমন্ত্রী বেসরকারি খাতকে টেনে তোলার জন্য কমপক্ষে ১০টি নির্দেশনা দিয়েছেন। কিন্তু এসবের একটাও বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্টদের আগ্রহ এবং আন্তরিকতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে না।
১) দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই প্রধানমন্ত্রী বন্ধ কলকারখানাগুলো দ্রুত চালু করার নির্দেশনা দেন। কিন্তু আমলাতান্ত্রিক লালফিতার দৌরাত্ম্যে এই উদ্যোগ বাস্তবায়নে তেমন অগ্রগতি নেই। এ নিয়ে চলছে শুধু ঘোষণা আর আলোচনা।
২) বেসরকারি খাতে উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা কাটাতে প্রধানমন্ত্রী আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতির কথা বলছেন বারবার। শিল্পকারখানায় নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রধানমন্ত্রী একাধিকবার নির্দেশনা দিয়েছেন। কিন্তু তার পরও চাঁদাবাজি, মব সন্ত্রাসের কবল থেকে মুক্তি পায়নি ব্যবসায়ীরা।
৩) সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে এখনো বেসরকারি খাতের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চলছে। চলছে চরিত্র হননের নোংরা খেলা। বিদেশে বসে অনেকে ব্যবসায়ী, শিল্প উদ্যোক্তাদের বিরুদ্ধে অবিরাম মিথ্যাচার করছে। মোটা অঙ্কের চাঁদা দাবি করা হচ্ছে। চাঁদা না দিলে শুরু হচ্ছে কুৎসিত আক্রমণ আর চরিত্রহননের মিথ্যাচার। প্রধানমন্ত্রী নিজে সোশ্যাল মিডিয়ার অপব্যবহার বন্ধ করতে নতুন আইন প্রণয়নের নির্দেশনা দিয়েছেন কিন্তু সেই আইন এখনো আলোর মুখ দেখেনি। তথ্য সন্ত্রাসের কাছে অসহায় ব্যবসায়ীরা এখন আতঙ্কিত। এই পরিস্থিতিতে তারা নতুন বিনিয়োগ করার উৎসাহ হারিয়ে ফেলেছেন।
৪) দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই প্রধানমন্ত্রী ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে ভিত্তিহীন হত্যা মামলা এবং অন্যান্য মামলা পুনর্মূল্যায়নের নির্দেশ দিয়েছেন। কিন্তু এখন পর্যন্ত এসব মামলা প্রত্যাহারে কার্যকর পদক্ষেপ দৃশ্যমান নয়।
৫) প্রধানমন্ত্রী একাধিকবার বলেছেন, ব্যবসায়ীদের দলীয় বিবেচনায় বিচার করা হবে না। অর্থনীতিতে তাদের অবদানই হবে প্রধান বিবেচ্য। কিন্তু এখনো সরকারের ভিতরে থাকা গুপ্তরা ব্যবসায়ীদের সঙ্গে দ্বিমুখী আচরণ করছে। আমার লোক, তোমার লোক বিবেচনায় অনেক ভালো উদ্যোক্তার সঙ্গে বিমাতাসুলভ আচরণ করা হচ্ছে আগের মতো। মনে রাখতে হবে, বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তারা কেউ দলীয় লোক নয়, তারা দেশের স্বার্থে কাজ করেন। কিন্তু সরকারের ভিতরে কেউ কেউ এখনো বিভক্তির দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে কাজ করছেন।
৬) প্রধানমন্ত্রী দ্রুত দেশে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি করার নির্দেশনা দিয়েছেন। কিন্তু এখনো বহু বেসরকারি উদ্যোক্তার বিরুদ্ধে ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা জারি করে রাখা হয়েছে। এই বিশ্বায়নের যুগে একজন ব্যবসায়ীকে বিদেশে যেতে বাধা দেওয়া মানে অর্থনীতির চাকা বন্ধ করে দেওয়ার শামিল। কিন্তু সরকারের ভিতরে একটি মহল পরিকল্পিতভাবে এই কাজটিই করছে। বহু ব্যবসায়ীর ব্যাংক অ্যাকাউন্ট জব্দ করে রাখা হয়েছে। এ যেন হাত পা বেঁধে কাউকে সাঁতার কাটতে বাধ্য করার মতো ঘটনা।
৭) দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম দিন থেকেই প্রধানমন্ত্রী কলকারখানায় নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহের ওপর জোর দিয়েছেন। বেসরকারি উদ্যোক্তাদের সঙ্গে একাধিক বৈঠকেও তিনি সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে এ বিষয়ে নির্দেশনা দিয়েছেন। কিন্তু গ্যাসের অভাবে বহু কারখানা এখন বন্ধ। বিদ্যুৎ সংকট সৃষ্টি করেছে নতুন অনিশ্চয়তা। বিশেষ ব্যবস্থায় উৎপাদন অব্যাহত রাখতে এই নির্দেশনা বাস্তবায়ন জরুরি।
৮) বেসরকারি খাতের বিকাশে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দূর করতে সরকারের একাধিক নির্দেশনা রয়েছে। কিন্তু এসব নির্দেশনা বাস্তবায়নে মাঠপর্যায়ে কিছু কর্মকর্তা গড়িমসি করছে। ব্যবসা সহজীকরণের লক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রীর অভিপ্রায় অনুযায়ী কাজ হচ্ছে না।
৯) ইউনূস সরকারের বেসরকারি খাতবিরোধী তৎপরতা, জ্বালানি সংকটের কারণে বহু প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তারা ঋণ খেলাপি হয়ে গেছে। এসব প্রতিষ্ঠানকে সহায়তা প্রদানে সরকারের নির্দেশনা রয়েছে। বহু বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের পাশে দাঁড়ানোর সরকারের অভিপ্রায় বাস্তবায়নে চরম অসহযোগিতা করছে সরকারের ভিতরে একটি মহল।
১০) প্রধানমন্ত্রী কর, ভ্যাট সহজীকরণের জন্য সুস্পষ্ট অনুশাসন দিয়েছেন। কিন্তু এখন বিভিন্নভাবে হয়রানি করা হচ্ছে ব্যবসায়ীদের।
দেশ এখন এক কঠিন অর্থনৈতিক সংকটে। এই অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন সরকার এবং বেসরকারি খাতের সম্মিলিত প্রচেষ্টা। সরকার বেসরকারি খাতের জন্য যত সহায়ক পরিবেশ তৈরি করবে তত অর্থনীতি সচল হবে। এটাই অর্থনীতির সহজ ও একমাত্র সূত্র। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের সব মুক্তবাজার অর্থনীতিতে বিশ্বাসী রাষ্ট্র এভাবেই অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলা করে। সরকারের কাজ হলো বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা। মনে রাখতে হবে, দেশীয় শিল্প ও বাণিজ্য সুস্থ না থাকলে বিদেশিরা কোনো দিনই বিনিয়োগের ঝুঁকি নেবেন না। প্রধানমন্ত্রী এই বাস্তবতা অনুধাবন করে প্রথম দিন থেকেই দেশে বিনিয়োগের পরিবেশ সৃষ্টির লক্ষ্যে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিচ্ছেন। কিন্তু মাঠে এখনো রয়েছে গুপ্ত এবং উন্নয়নবিরোধী শক্তি। তারা প্রধানমন্ত্রীর চমৎকার উদ্যোগগুলো বাস্তবায়নে বাধা সৃষ্টি করছে। এদের সরিয়ে প্রধানমন্ত্রীর চিন্তা বাস্তবায়নে যারা আন্তরিক, তাদের হাতে দায়িত্ব দিতে হবে। তা না হলে বেসরকারি খাত ঘুরে দাঁড়াতে পারবে না। আর বেসরকারি খাত যদি বিকশিত না হয়, তাহলে চলমান অর্থনৈতিক সংকট থেকে মুক্তি পাবে না বাংলাদেশ।