শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তনের দাবিতে বাংলাদেশের একটি আইনসম্মত স্বার্থ রয়েছে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। ঢাকা আনুষ্ঠানিকভাবে হাসিনার প্রত্যর্পণের অনুরোধ জানিয়েছে ভারতের কাছে। তবে দিল্লি বলছে, তাদের আইনি প্রক্রিয়া অনুযায়ী অনুরোধটি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। বিষয়টি রাজনৈতিক ও আবেগগতভাবে অত্যন্ত সংবেদনশীল। কিন্তু সরকারকে আরও একটি মৌলিক প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে। পুরো বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ককে শুধু হাসিনাকে ঘিরে জিম্মি করে রাখা উচিত? তা করা উচিত নয়।


কিন্তু পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান এবং পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবিরের সাম্প্রতিক বক্তব্য দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যকার বৃহত্তর সম্পর্কের বিষয়টি ছাড়িয়ে গুরুত্ব পেয়েছে হাসিনার প্রত্যাবর্তন।


এটি কী বিপজ্জনক কৌশলগত দূরদৃষ্টির অভাব?


পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা অবশ্যই হাসিনার প্রত্যর্পণের বিষয়টি উত্থাপন করবেন। কিন্তু এমন অনেক খাত আছে যেখানে বাংলাদেশ ও ভারতকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। শুধু মাত্র একটি বিতর্কিত রাজনৈতিক ও আইনি বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়া মূলত বহুবিধ ক্ষেত্র থেকে সেটাকে আলাদা করার ব্যর্থতাকে চিহ্নিত করে।


হাসিনা সম্পর্কে নয়াদিল্লি কী সিদ্ধান্ত নেবে, তা ঠিক না হওয়া পর্যন্ত বাণিজ্য, জ্বালানি, পানি, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, সন্ত্রাসবাদ দমন, সংযোগ এবং আঞ্চলিক বাণিজ্যকে স্থগিত রাখা যায় না। পররাষ্ট্রনীতি হলো পরস্পরবিরোধী জাতীয় স্বার্থের ব্যবস্থাপনা। অন্য সবকিছুর বিনিময়ে একটিমাত্র উদ্দেশ্য সাধনের প্রচেষ্টা নয়।


বাংলাদেশ ভূগোলের সঙ্গে আলোচনা করতে পারে না


সরকারকে প্রথম যে বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হবে তা হলো ভূগোল। কারণ, ভৌগলিকভাবে বাংলাদেশকে তিন দিক থেকে ঘিরে রেখেছে ভারত। কোনো রাজনৈতিক বাগাড়ম্বরই তা পরিবর্তন করতে পারে না। ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্পর্কও বাণিজ্য ঘাটতির চেয়ে অনেক বেশি জটিল।


২০২৪-২৫ অর্থবছরে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ১১.৩৯ বিলিয়ন ডলার। যেখানে বাংলাদেশ ৯.৬২ বিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানি এবং ১.৭৬ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে। এর ফলে সৃষ্ট ৭.৮৬ বিলিয়ন ডলারের ঘাটতি একটি যুক্তিসঙ্গত উদ্বেগের বিষয়। কিন্তু এই আমদানির মধ্যে বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য অপরিহার্য খাদ্য, শিল্প কাঁচামাল এবং অন্যান্য উপকরণ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।


বস্ত্রশিল্প বিষয়টি স্পষ্ট করে তোলে


২০২৪ সালে বাংলাদেশ প্রায় ৩ বিলিয়ন ডলার মূল্যের ১২.১৫ লক্ষ টন সুতা আমদানি করেছে। যার প্রায় ৯৫ শতাংশই এসেছে ভারত থেকে। স্থানীয় রপ্তানিকারকরা ভারতীয় সরবরাহের উপর নির্ভর করার কারণ হিসেবে কম মূল্য, বড় চালান ও কম সময়ে সরবরাহের কথা উল্লেখ করেছেন।


এটি কেবল অন্য সরবরাহকারী খোঁজার বিষয় নয়


মূল্য এবং সরবরাহের সময়সীমার দিক থেকে বিশ্বব্যাপী প্রতিযোগিতা করে টিকে আছে বাংলাদেশের পোশাক শিল্প। তুলা, সুতা বা কাপড় প্রযুক্তিগতভাবে বিকল্প হতে পারে। কিন্তু দূরবর্তী বাজার থেকে সংগ্রহের অর্থ হলো উচ্চতর পরিবহন খরচ, দীর্ঘতর সরবরাহের সময় এবং বৃহত্তর মজুদের প্রয়োজনীয়তাকে আরও বাড়িয়ে তোলা। বাংলাদেশ এই প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার জন্য ইতোমধ্যেই সংগ্রাম করছে। তাই ইচ্ছাকৃতভাবে এই খরচগুলো বাড়ানো হবে অর্থনৈতিকভাবে আত্মঘাতী।


এখানে আরেকটি জটিলতা রয়েছে। বাংলাদেশের বস্ত্রশিল্প নিজেই আমদানিকৃত সুতার চাপে রয়েছে, বিশেষ করে ভারত থেকে আসা সুতার কারণে। বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশন প্রতিযোগিতা ও গ্যাসের কম চাপ নিয়ে অভিযোগ করছে। অন্যদিকে বিজিএমইএ সতর্ক করেছে যে সুতা আমদানি সীমিত করা হলে ঘাটতি দেখা দিতে পারে, খরচ বাড়তে পারে এবং কর্মসংস্থান হুমকির মুখে পড়তে পারে।


এ কারণেই বাণিজ্য নীতিকে জাতীয়তাবাদে পর্যবসিত করা যায় না। যেখানে যৌক্তিক, সেখানে বাংলাদেশকে দেশীয় শিল্পকে সুরক্ষা দিতে হবে এবং একই সাথে তার রপ্তানি খাতের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতাও বজায় রাখতে হবে। এর জন্য প্রয়োজন তথ্য-প্রমাণ ভিত্তিক নীতি, ভারতীয় বাণিজ্যের প্রতি নির্বিচার বৈরিতা নয়।


জ্বালানি সংকট পরিস্থিতি আরও বিপজ্জনক করে তুলেছে


ভারতের প্রতি সরকারের কঠোর মনোভাবের সময়টি বিশেষভাবে দুর্ভাগ্যজনক। কারণ বাংলাদেশ ইতোমধ্যে একটি জ্বালানি সংকটের সম্মুখীন। সম্প্রতি গ্যাস ঘাটতির কারণে কিছু মিলে উৎপাদন প্রায় অর্ধেকে নেমে আসায় বস্ত্র কারখানা মালিকরা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের হস্তক্ষেপ চেয়েছেন। প্রায় ২৫ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগসহ প্রাথমিক বস্ত্র খাতটি ইতোমধ্যেই গ্যাস ঘাটতি, উচ্চ অর্থায়ন ব্যয় এবং অন্যান্য সীমাবদ্ধতার কারণে চাপের মধ্যে রয়েছে।


বাংলাদেশের শিল্প অর্থনীতির জন্য প্রয়োজন নির্ভরযোগ্য গ্যাস ও বিদ্যুৎ, সাশ্রয়ী জ্বালানি এবং একটি স্থিতিশীল পরিবেশ। নির্ভরযোগ্য জ্বালানি ছাড়া কারখানাগুলো পূর্ণ সক্ষমতায় চলতে পারে না। উৎপাদন ব্যাহত হলে রপ্তানিকারকরা বৈশ্বিক সরবরাহ সময়সূচী পূরণ করতে পারে না। যেখানে মৌলিক অবকাঠামো অনিশ্চিত, সেখানে বিনিয়োগকারীরা পুঁজি বিনিয়োগ করবে না।


বাংলাদেশ বিনিয়োগ পুনরুজ্জীবিত করতে, ব্যয় নিয়ন্ত্রণে রাখতে এবং প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা পুনরুদ্ধার করতে সংগ্রাম করছে। এমনক এক সময়ে সরকারের এমন নীতি গ্রহণ করতে পারে না যা জ্বালানি, বাণিজ্য বা শিল্প উপকরণকে আরও ব্যয়বহুল বা অনিশ্চিত করে তোলে।


বিপরীত পরিস্থিতিটি বেশ লক্ষণীয়। ভারত-বিরোধী বাগাড়ম্বর রাজনৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্যতা পাচ্ছে এমন এক সময়ে যখন জ্বালানি ও শক্তির ক্ষেত্রে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের বাস্তবসম্মত সহযোগিতা প্রয়োজন। এখানেই স্লোগানের সঙ্গে সরকারের দায়িত্বের সংঘাত ঘটে।


বিরোধী রাজনীতিবিদদের জন্য বাংলাদেশকে "ভারতকে শিক্ষা দেওয়ার" দাবি করা সহজ। কিন্তু একটি সরকারের পক্ষে একজন কারখানার মালিককে এটা বোঝানো অনেক বেশি কঠিন যে, প্রতিবেশী দেশের সাথে সম্পর্ক খারাপ হওয়ার কারণে কেন উৎপাদন খরচ বেড়েছে বা চালান বিলম্বিত হয়েছে।


জামায়াত-এনসিপি ফাঁদ


এর একটি রাজনৈতিক দিক রয়েছে যা বিএনপি সরকারকে স্পষ্টভাবে বুঝতে হবে। জামায়াতে ইসলামী এবং ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি ভারতের বিষয়ে একটি বলিষ্ঠ জাতীয়তাবাদী আখ্যানকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক অঙ্গন ক্রমশ দখল করে নিয়েছে। তাদের এই জোট বিএনপিকে অপর্যাপ্ত জাতীয়তাবাদী হিসেবে চিত্রিত করার সুযোগ করে দেয়। যখনই বিএনপি নয়াদিল্লির সাথে বাস্তবসম্মত আলোচনায় বসতে চায় তখনই তারা বিএনপির জাতীয়তাবাদী নিয়ে প্রশ্ন তোলে। এটি বিএনপির জন্য একটি ফাঁদ তৈরি করে। বিরোধীরা চরমপন্থী বাগাড়ম্বর করার সামর্থ্য রাখে। সরকার তা পারে না।


জামায়াত এবং এনসিপিকে বাংলাদেশের কারখানা চালু রাখা, গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা, বিদ্যুৎ উৎপাদন বজায় রাখা, ভারতের সাথে পানির বিষয়ে আলোচনা করা বা সীমান্ত বাণিজ্য সচল রাখার দায়িত্ব নিতে হয় না। এটি বিএনপি সরকারের দায়িত্ব। এই পার্থক্যটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।


জাতীয়তাবাদে কোনো দোষ নেই। বাংলাদেশের তার সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় স্বার্থ রক্ষার সম্পূর্ণ অধিকার আছে। কিন্তু জাতীয়তাবাদ এবং উগ্র দেশপ্রেমের মধ্যে একটি পার্থক্য রয়েছে।


জাতীয়তাবাদ প্রশ্ন করে, বাংলাদেশের জন্য কোনটি সর্বোত্তম?


উগ্র দেশপ্রেম প্রশ্ন করে, ভারতের বিরুদ্ধে কে সবচেয়ে বেশি স্লোগান করতে পারে? প্রথমটি হলো রাষ্ট্র পরিচালনা। দ্বিতীয়টি হলো নির্বাচনী নাটক।


বিপদটি হলো, বিএনপি তার উগ্র জাতীয়তাবাদী অংশের চাপে জামায়াত ও এনসিপির পছন্দের ময়দানে তাদের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা শুরু করে দিতে পারে। সেটা হবে একটি ভুল। শুধুমাত্র নরমপন্থী হওয়ার অভিযোগ এড়াতে যদি বিএনপি ভারতের প্রতি আরও বেশি সংঘাতপূর্ণ হয়ে ওঠে, তবে দলটি এমন নীতি গ্রহণ করতে পারে যা সেই অর্থনৈতিক স্বার্থেরই ক্ষতি করবে। যার জন্য শেষ পর্যন্ত বিএনপিকেই দায়ী করা হবে।


প্রতিটি অভ্যন্তরীণ সমস্যাকে ভারত-সমস্যায় পরিণত করা


উগ্র জাতীয়তাবাদী বয়ানটির আরেকটি রাজনৈতিক সুবিধা রয়েছে। এটি জটিল অভ্যন্তরীণ সমস্যাগুলোকে একটি সাধারণ পররাষ্ট্রনীতির গল্পে পরিণত করতে পারে। গ্যাসের ঘাটতি? দোষটা ভারতের। বাণিজ্যিক সমস্যা? দোষটা ভারতের। মুদ্রাস্ফীতি? ভারতীয় প্রভাবের কথা বলা হচ্ছে। হাসিনার ভারতে অব্যাহত উপস্থিতি? এটা নাকি প্রমাণ করে যে, সরকার বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় ব্যর্থ হয়েছে।


এই ধরনের বয়ান রাজনৈতিকভাবে আকর্ষণীয়, কারণ এগুলো জটিল সমস্যাকে সরল করে তোলে। কিন্তু বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সংকট এতটাই গভীর এবং কাঠামোগত যে, এর দায় শুধু একটি প্রতিবেশী দেশের ওপর চাপানো যায় না। গ্যাস সংকট বছরের পর বছর ধরে অপর্যাপ্ত বিনিয়োগ, সরবরাহ সীমাবদ্ধতা এবং জ্বালানি পরিকল্পনার দুর্বলতার প্রতিফলন। ব্যাংকিং সংকটের মূলে রয়েছে সুশাসনের ব্যর্থতা, খেলাপি ঋণ এবং নিয়ন্ত্রক দুর্বলতা। উচ্চ ব্যয়, অবকাঠামোগত প্রতিবন্ধকতা এবং উৎপাদনশীলতার সমস্যার কারণে শিল্প প্রতিযোগিতা সীমিত। মুদ্রাস্ফীতির একাধিক অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক কারণ রয়েছে। দুর্বল বিনিয়োগ আস্থা, নীতিগত অনিশ্চয়তা, অর্থায়নের সীমাবদ্ধতা এবং বৃহত্তর প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার প্রতিফলন।


ভারত এসব চাপের ওপর কিছুটা প্রভাব ফেলতে পারে, তবে সব সমস্যার দায় ভারতের ওপর চাপানো কোনোভাবেই বিশ্বাসযোগ্য ব্যাখ্যা হতে পারে না। সরকারের মূল দায়িত্ব হলো এসব সমস্যার কার্যকর সমাধান করা। জনগণের প্রতিটি হতাশা বা ক্ষোভকে যেন আবারও ভারতকেন্দ্রিক বিতর্কে রূপ দেওয়া না হয়, তা নিশ্চিত করাও সরকারের দায়িত্ব।


সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে বিএনপিই


অতিরিক্ত ভারতবিরোধী নীতি শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের তুলনায় বিএনপির জন্যই বেশি ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। দুই দেশের সম্পর্কের অবনতি হলে এর প্রভাব পড়তে পারে আমদানি ব্যয়, সরবরাহব্যবস্থা, বিনিয়োগ ও যোগাযোগের ওপর। আমদানি ব্যয় বেড়ে যাওয়া, সরবরাহব্যবস্থা ব্যাহত হওয়া, বিনিয়োগ কমে যাওয়া কিংবা যোগাযোগব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ার মতো পরিস্থিতির চূড়ান্ত চাপ গিয়ে পড়বে সাধারণ মানুষের ওপর। আর সেই চাপ শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিকভাবেও বিএনপির জন্য অস্বস্তিকর হয়ে উঠতে পারে।


কারখানাগুলোর উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যেতে পারে। রপ্তানিকারকরা আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতার সক্ষমতা হারাতে পারেন। বাড়তি দামের বোঝা বইতে হতে পারে ভোক্তাদের। কর্মসংস্থান হারানোর ঝুঁকিতে পড়তে পারেন শ্রমিকরা। আর ব্যবসায়ীরা নতুন বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসতে পারেন।


এমন পরিস্থিতিতে ভোটাররা সরকার শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে যথেষ্ট কঠোর অবস্থান নিয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলবেন না। বরং তাদের প্রশ্ন হবে, কেন তাদের অর্থনৈতিক অবস্থার কেন উন্নতি হচ্ছে না।


বিএনপি আর বিরোধী দলের মতো রাজনীতি করে দেশ পরিচালনা করতে পারবে না। এখন দলটিকে ১৭ কোটিরও বেশি মানুষের একটি দেশ পরিচালনার দায়িত্ব নিতে হবে-যেখানে তাকে সামলাতে হবে নানা ধরনের অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তাজনিত চাপ। একটি সরকারের দায়িত্ব সব জাতীয়তাবাদী বিতর্কে জয়ী হওয়া নয়; বরং বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ সুরক্ষিত রাখাই তার মূল দায়িত্ব।


খলিলুর ও কবিরকে কৌশলগত ভারসাম্য ফিরিয়ে আনতে হবে


পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের বিশেষভাবে সতর্ক থাকা উচিত, যাতে শেখ হাসিনা ইস্যুটি বাংলাদেশ-ভারত দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের একমাত্র নির্ধারক হয়ে না ওঠে। বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের বিভিন্ন ‘অস্বস্তির’ বিষয় সমাধানের প্রয়োজনীয়তার কথা খলিলুর রহমান নিজেও বলেছেন। এতে বোঝা যায়, দুই দেশের সম্পর্কের জটিলতা যে শুধু একটি ইস্যুকে ঘিরে নয়, বরং এর সঙ্গে আরও বিস্তৃত কিছু বিষয় জড়িত-তা তিনি উপলব্ধি করেন। সেখান থেকেই সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি নতুন ও ভারসাম্যপূর্ণ সূচনা হতে পারে।


ঢাকার উচিত শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের দাবি অব্যাহত রাখা এবং এ বিষয়ে নিজেদের আইনি ও কূটনৈতিক অবস্থান দৃঢ়ভাবে তুলে ধরা। একই সঙ্গে বৃহত্তর দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের স্বাভাবিক কার্যক্রমও সচল রাখতে হবে।


শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ দাবি করার পাশাপাশি বাণিজ্য নিয়ে আলোচনা করা, তার বিচারের দাবি জানিয়ে জ্বালানি সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা করা কিংবা সীমান্তে ঘটে যাওয়া ঘটনায় আপত্তি জানিয়ে একই সঙ্গে বৈধ আন্তঃসীমান্ত বাণিজ্য সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়ার মধ্যে কোনো বিরোধ নেই। বরং জাতীয় স্বার্থেই এসব ক্ষেত্রে একই সঙ্গে দৃঢ়তা ও বাস্তববাদী কূটনীতির সমন্বয় প্রয়োজন। কূটনীতির কাজই হলো এ ধরনের পরস্পরবিরোধী স্বার্থ ও বাস্তবতার মধ্যে ভারসাম্য রেখে এগিয়ে যাওয়া।


একই দায়িত্ব হুমায়ুন কবিরের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। একজন উপদেষ্টার দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও জনমতের গতিপ্রকৃতি সম্পর্কে সম্যক ধারণা থাকা জরুরি। তবে তার আরও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হলো, সরকারের বিভিন্ন নীতিগত সিদ্ধান্তের সম্ভাব্য প্রভাব ও পরিণতি সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রীকে যথাযথ পরামর্শ দেওয়া।


মূল প্রশ্ন হওয়া উচিত, কোনো নির্দিষ্ট ভারতনীতি আজ কতটা জনপ্রিয়-তা নয়। বরং প্রশ্ন হলো, সেই নীতি পাঁচ বা দশ বছর পর বাংলাদেশকে আরও শক্তিশালী অবস্থানে নিয়ে যাবে কি না।


যদি সংঘাতের কারণে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যায়, যোগাযোগব্যবস্থা বাধাগ্রস্ত হয়, নিরাপত্তা সহযোগিতা দুর্বল হয়ে পড়ে, পানি নিয়ে আলোচনা আরও জটিল হয়ে ওঠে এবং বাংলাদেশের কূটনৈতিক পরিসর সংকুচিত হয়, তাহলে এসব ক্ষতির বিনিময়ে সরকার কী কৌশলগত সুবিধা অর্জন করতে চায়, তার সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা থাকা প্রয়োজন। এখন পর্যন্ত সেই কৌশলগত অবস্থানের পক্ষে যথেষ্ট বিশ্বাসযোগ্য যুক্তি তুলে ধরা সম্ভব হয়নি।


হাসিনার জন্য পানি আটকে থাকতে পারে না 


বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ৫৪টি আন্তঃসীমান্ত নদী রয়েছে। এসব নদীর পানি বণ্টন ও ব্যবস্থাপনার জন্য ধারাবাহিক আলোচনা, কারিগরি সহযোগিতা এবং রাজনৈতিক যোগাযোগ প্রয়োজন। বিষয়গুলো সরাসরি কৃষি, মানুষের জীবিকা ও পরিবেশের ওপর প্রভাব ফেলে। তাই গঙ্গা পানি চুক্তির নবায়নকে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত করে রাখা কোনোভাবেই যুক্তিসংগত নয়।


সীমান্ত ব্যবস্থাপনা ও সন্ত্রাসবাদ দমনের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। ঢাকা ও নয়াদিল্লির মধ্যে রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকলেও পাচার, চোরাচালান, জঙ্গি নেটওয়ার্কসহ বিভিন্ন আন্তঃসীমান্ত হুমকি মোকাবিলায় দুই দেশেরই অভিন্ন স্বার্থ রয়েছে।


রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টির কৌশল হিসেবে এসব সহযোগিতার পথ সংকুচিত করা হলে, শেষ পর্যন্ত তার মূল্য দিতে হবে উভয় দেশকেই। রাজনৈতিক সুবিধা আদায়ের জন্য এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ সহযোগিতার ক্ষেত্রকে দুর্বল করা কোনোভাবেই লাভজনক সমঝোতা হতে পারে না।


বাংলাদেশের প্রয়োজন বহুমুখীকরণ, সংঘাত নয়


কোনো একক বাণিজ্যিক অংশীদারের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা কমিয়ে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ককে আরও বহুমুখী করার যথেষ্ট যৌক্তিকতা রয়েছে। এটাই হওয়া উচিত দেশের দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য।


চীন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ, উপসাগরীয় দেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন বাজারের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরও বিস্তৃত করতে হবে। একই সঙ্গে কাঁচামালের বিকল্প উৎস নিশ্চিত করা, দেশীয় উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো এবং বন্দর ও লজিস্টিক অবকাঠামোর উন্নয়নেও জোর দিতে হবে। তবে বাণিজ্যিক সম্পর্কের বহুমুখীকরণ মানে কোনো একটি অংশীদারের জায়গায় আরেকটিকে বসানো নয়।


চীন, জাপান কিংবা তুরস্কের সঙ্গে যত ঘনিষ্ঠ সম্পর্কই গড়ে উঠুক না কেন, ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের ভৌগোলিক বাস্তবতা বদলানোর সুযোগ নেই।


বাংলাদেশ যদি নিজেকে আঞ্চলিক বাণিজ্য, লজিস্টিক ও যোগাযোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত করতে চায়, তাহলে ভারতের সঙ্গে কার্যকর ও স্থিতিশীল সম্পর্ক বজায় রাখা অপরিহার্য। কারণ নেপাল, ভুটান এবং ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে বাংলাদেশের স্থল যোগাযোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ভারতের ভূখণ্ডের ওপর নির্ভরশীল।


তাই বাংলাদেশের লক্ষ্য হওয়া উচিত কৌশলগতভাবে সম্পর্ক ও বাণিজ্যকে বহুমুখী করা, তবে কোনো দেশের সঙ্গে অপ্রয়োজনীয় বিরোধে না জড়ানো।


‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ মানে ‘হাসিনা ফার্স্ট’ নয়


বিএনপির ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতির এখনই বাস্তব পরীক্ষা হওয়া দরকার। ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ মানে হলো দেশের শিল্প ও কারখানার প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা ধরে রাখা, পর্যাপ্ত জ্বালানি নিশ্চিত করা, সীমান্তের নিরাপত্তা বজায় রাখা, পানি নিয়ে কার্যকর আলোচনা চালিয়ে যাওয়া, আঞ্চলিক যোগাযোগব্যবস্থা সম্প্রসারণ করা এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর বাজারে বাংলাদেশের প্রবেশাধিকার বাড়ানো। 


বাংলাদেশের স্বার্থ যেখানে প্রয়োজন, সেখানে ভারতের সঙ্গে দৃঢ় অবস্থান নেওয়াও এর অংশ। একই সঙ্গে ভারত, চীন, জাপান, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপসহ অন্যান্য অংশীদারের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ ও শক্তিশালী সম্পর্ক বজায় রাখাও জরুরি। হ্যাঁ, এর অর্থ শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের দাবিও অব্যাহত রাখা। তবে ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতির অর্থ কোনোভাবেই ‘হাসিনা ফার্স্ট’ হতে পারে না। সাবেক প্রধানমন্ত্রীর মামলা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এটিকে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির মূল ভিত্তি বানানো কোনোভাবেই সমীচীন হবে না। বিএনপির উচিত জামায়াত ও এনসিপির সঙ্গে ভারতবিরোধী বক্তব্যের প্রতিযোগিতায় না জড়ানো। ‘যথেষ্ট জাতীয়তাবাদী নয়’-এমন অভিযোগের আশঙ্কায় দলের ভারতনীতি নির্ধারিত হওয়াও উচিত নয়। একটি সরকারের জন্য বাস্তববাদী হওয়ার সাহস থাকা জরুরি। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরকার ইতোমধ্যে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক এগিয়ে নিতে একটি ‘অনুকূল পরিবেশ’ তৈরির প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছে। এই বাস্তববাদী অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করা উচিত, দুর্বল নয়।


এগিয়ে যাওয়ার অর্থ শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের দাবি থেকে সরে আসা নয়। বরং এই ইস্যুটিকে অন্যান্য দ্বিপক্ষীয় বিষয় থেকে আলাদা রেখে বাংলাদেশের বৃহত্তর স্বার্থে সম্পর্কের অন্য ক্ষেত্রগুলোও এগিয়ে নেওয়া। শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের দাবি দৃঢ়ভাবে চালিয়ে যেতে হবে। একই সঙ্গে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থও সমান গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে।


বাণিজ্য সচল রাখতে হবে। সরবরাহব্যবস্থা সুরক্ষিত রাখতে হবে। জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। পানি নিয়ে আলোচনা চালিয়ে যেতে হবে। সীমান্ত ব্যবস্থাপনা ও সন্ত্রাসবাদ দমনে সহযোগিতা বজায় রাখতে হবে। আঞ্চলিক যোগাযোগব্যবস্থা আরও সম্প্রসারণ করতে হবে। নয়াদিল্লির সঙ্গে সর্বোচ্চ রাজনৈতিক পর্যায়ে যোগাযোগও অব্যাহত রাখতে হবে।


সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার কারণে যেন বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের প্রতিটি ইস্যু দেশপ্রেমের পরীক্ষায় পরিণত না হয়। জামায়াত ও এনসিপি চাইলে অতিরিক্ত জাতীয়তাবাদী অবস্থান নিতে পারে, কারণ সরকারের নীতির ভালো-মন্দের পরিণতি তাদের সরাসরি বহন করতে হয় না। বিএনপির ক্ষেত্রে বিষয়টি ভিন্ন। সরকার পরিচালনার দায়িত্ব এখন তাদের। তাই আবেগ নয়, বাস্তবতা ও জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতেই তাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে। বিরোধী দল চাইলে কঠোর বক্তব্য দিতে পারে। কিন্তু সেই বক্তব্যের মূল্য শেষ পর্যন্ত দিতে হয় সরকারকেই।


তাই বাংলাদেশের এমন একটি ভারতনীতি প্রয়োজন, যা একদিকে যেমন নতজানু হবে না, অন্যদিকে অযথা সংঘাতেও জড়াবে না। নীতিটি হতে হবে বাস্তববাদী, দৃঢ় এবং সর্বোপরি জাতীয় স্বার্থকেন্দ্রিক।


বাংলাদেশের অর্থনীতি, নিরাপত্তা ও কৌশলগত ভবিষ্যৎকে ঝুঁকিতে না ফেলেই শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের দাবি জোরালোভাবে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষরা ভিন্ন কোনো পথে প্রভাবিত করার আগেই বিএনপির বিষয়টি উপলব্ধি করা উচিত।