রাজধানীর পূর্বাচল ৩০০ ফিট সড়কে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা আধুনিকায়নে দুুটি স্পটে স্পিড ক্যামেরা ও পাঁচটিতে ট্রাফিক সিগন্যাল বসানো হয়েছে। এরপর ট্রাফিক-ব্যবস্থায় কিছুটা শৃঙ্খলা দেখা দিয়েছে। কিন্তু সড়কটিতে বেপরোয়া ব্যাটারিচালিত রিকশা, অটোরিকশা ও মোটরসাইকেলের কারণে ট্রাফিক-ব্যবস্থায় কোনো পরিবর্তন আসেনি। স্পিড ক্যামেরা ও ট্রাফিক সিগন্যালকে বৃদ্ধাঙ্গুল দেখিয়ে নিয়মিত আইন ভঙ্গ করে ছুটছে এসব যানবাহন। বিশেষজ্ঞদের মতে পুরোপুরি প্রযুক্তিনির্ভর না হয়ে গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে ট্রাফিক পুলিশের সক্রিয় উপস্থিতি প্রয়োজন। জানা যায়, সড়কটিতে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা আধুনিকায়ন ও শৃঙ্খলা ফেরাতে গুরুত্বপূর্ণ স্পট পুলিশ অফিসার্স হাউজিং সোসাইটি, স্বদেশ, মস্তুল চেকপোস্ট, নীলা মার্কেট, মাজার রোড এবং জলসিড়ি গোলচত্বরে ট্রাফিক সিগন্যাল ও স্পিড ক্যামেরা বসানো হয়েছে। আরও কয়েকটি জায়গায় ভিডিও ক্যামেরা বসানো হবে। এরপর এআই ক্যামেরাও বসানোর পরিকল্পনা আছে।
সরেজমিন মঙ্গলবার সন্ধ্যায় ৩০০ ফিট সড়ক ঘুরে জানা যায়, ভিডিও ক্যামেরা ও ট্রাফিক সিগন্যাল বসানোর পর সড়কটিতে শৃঙ্খলা ফিরতে শুরু করেছে। জরিমানার ভয়ে নিয়ম মেনে সিগন্যালে দাঁড়িয়ে থাকে প্রাইভেট কার, বাস, ট্রাক, পিকআপ ও অন্যান্য যানবাহন। তবে অল্প কিছু মোটরসাইকেলচালক ট্রাফিক সিগন্যাল মানলেও সিংহভাগই অমান্য করে সড়কে দাবিয়ে বেড়াচ্ছেন; যা দেখে আরও অনেকে নিয়ম ভাঙতে উৎসাহিত হচ্ছেন।
এসব নিয়ম ভঙ্গকারী চালকদের কী ধরনের শাস্তির আওতায় আনা হয় জানতে ট্রাফিক পুলিশ বক্সের দিকে গেলে সেখানে কারও দেখা মেলেনি। কয়েকজন অস্থায়ী হকারের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ৩০০ ফিট সড়কে সব সময় ট্রাফিক পুলিশ থাকেন না। আশপাশের দোকানে বসে থাকেন। অথবা কোনো চেকপোস্টে বসে সময় পার করেন। বড় কোনো দুর্ঘটনা না হলে পুলিশ দেখা যায় না।
এ বিষয়ে ঢাকা মহানগর পুলিশের গুলশান ট্রাফিক বিভাগের এডিসি মো. জিয়াউর রহমান বলেন, ‘৩০০ ফিট সড়কে যানবাহনের শৃঙ্খলা রক্ষায় রাজউকের মাধ্যমে দুটি স্পিড ক্যামেরা বসানো হয়েছে। আরেকটি বসানোর কার্যক্রম প্রায় শেষের দিকে। এটি অনেকটা এআই ক্যামেরার মতো কাজ করে। এর মাধ্যমে নিয়ম ভঙ্গকারী যানবাহনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যাবে। এ ছাড়া ৩০০ ফিট সড়কে যানবাহনের গতি কমাতে এবং শৃঙ্খলা ফেরাতে এআই ক্যামেরা বসানোর প্রক্রিয়া চলছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘৩০০ ফিট সড়কের বিভিন্ন স্পটে ট্রাফিক পুলিশ নিয়মিত দায়িত্ব পালন করছে। যেসব গাড়ি আইন ভঙ্গ করছে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। নিয়মিতই মামলা দায়ের ও রেকারে পাঠানো হচ্ছে। এর পরও যারা আইন মানতে চান না তাদের স্পিড ক্যামেরা এবং এআই ক্যামেরার মাধ্যমে আইনের আওতায় আনা হবে।’ কয়েকজন অটোরিকশাচালকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ক্যামেরা লাগানো হলেও শাস্তির ব্যবস্থা না থাকায় তেমন কেউই ট্রাফিক সিগন্যাল মানতে চায় না। সব সময় ট্রাফিক পুলিশ না থাকায় অটোরিকশা ও মোটরসাইকেলচালকরা ট্রাফিক সিগন্যাল কিংবা ক্যামেরাকে তেমন গুরুত্ব দেন না।
এদিকে ৩০০ ফিট সড়কে স্পিড ক্যামেরা বসানো ও ট্রাফিক সিগন্যাল ব্যবস্থাপনাকে ইতিবাচকভাবে দেখছেন অনেক যানবাহন চালক। ১৫ বছর একটি কোম্পানির প্রাইভেট কার চালান আবেদ আলী। কোম্পানির কাজে প্রতিদিনই ৩০০ ফিট সড়ক ব্যবহার করতে হয় তাঁকে। আবেদ আলী বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘ট্রাফিক সিগন্যাল আর ক্যামেরা লাগানোর পর চালকদের মাঝে অনেকটাই পরিবর্তন এসেছে। এর আগে এমন চিত্র ভাবাও যেত না। এ ছাড়া সিগন্যাল মানার মাধ্যমে চালকদের মাঝেও শৃঙ্খলা আসতে শুরু করেছে। তবে এ সড়কে পুরোপুরি শৃঙ্খলা ফিরতে আরও কিছুটা সময় লাগবে।’
সিএনজি অটোচালক মো. রহমত মিয়া বলেন, ‘আগে এ সড়কে এ রকম ব্যবস্থা ছিল না। এখন এ ক্যামেরা আর সিগন্যাল বসানোয় ভালোই হয়েছে। সড়কে ঝামেলা অনেকটাই কমে গেছে। গভীর রাতে তেমন গাড়ি না থাকলেও সিগন্যালে দাঁড়িয়ে থাকি জরিমানার ভয়ে। রাস্তায় নিয়ম মানা গাড়ির চালক ও যাত্রী উভয়ের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ। অনেক সময় এ সিগন্যালের জন্য বড় দুর্ঘটনা এড়ানো যায়।’ এ বিষয়ে ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইপিডি) নির্বাহী পরিচালক, নগর পরিকল্পনাবিদ ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, ‘ঢাকার ৩০০ ফিট সড়কে প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থার পাশাপাশি কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক ও তদারকিজনিত ঘাটতি এখনো স্পষ্ট।’ তিনি বলেন, ‘রেজিস্ট্রেশন না থাকা অটোরিকশা বা নিয়ম অমান্যকারী মোটরসাইকেলগুলো নজরদারির বাইরে থেকে যাওয়ার সুযোগ নেয়। তাই শুধু ক্যামেরার ওপর নির্ভর না করে গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে ট্রাফিক পুলিশের সক্রিয় উপস্থিতি ও ম্যানুয়াল পরিদর্শন প্রয়োজন। প্রযুক্তি এবং মাঠপর্যায়ের তদারকির সমন্বয় ঘটাতে পারলে শহরের সামগ্রিক “লেভেল অব সার্ভিস” উন্নত হবে। পাশাপাশি ঢাকা শহরের যানজট ও দুর্ঘটনা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাবে।’