আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে গুমের বিচারের পথ প্রশস্ত করতে ‘ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইমস ট্রাইব্যুনালস (অ্যামেন্ডমেন্ট) বিল ২০২৬’ জাতীয় সংসদে পাস হয়েছে। এ সংশোধনীর মাধ্যমে গুমকে ‘মানবতাবিরোধী অপরাধ’ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। এ বিলসহ গতকাল জাতীয় সংসদে ১৪টি বিল পাস হয়েছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জারি করা অধ্যাদেশগুলোকে আইনে রূপ দিতে এসব বিল পাস করা হয়। বিলগুলোতে দফাওয়ারি কোনো সংশোধনী প্রস্তাব ছিল না। তাই বিলের ওপর সংসদে কোনো আলোচনা হয়নি। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীরা উত্থাপনের পর বিলগুলো সরাসরি কণ্ঠভোটে পাস করা হয়। বিল পাসের সময় আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান ও বিরোধীদলীয় নেতার মধ্যে বিতর্ক হয়।
অন্যদিকে, মেডিকেল কলেজের নাম পরিবর্তন-সংক্রান্ত বিল তুলতে গিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের কথায় কিছুটা হাস্যরস সৃষ্টি হয় সংসদে। তিনি বলেন, ‘খুব দুঃখের ব্যাপার এতক্ষণ তো যা বললাম, এখন আবার শেখ হাসিনা বলতে হচ্ছে।’ গতকাল পাস হওয়া অন্য বিলগুলো হলো ‘হাওড় ও জলাভূমি সংরক্ষণ বিল’, কোড অব ক্রিমিনাল প্রসিডিউর (অ্যামেন্ডমেন্ট) বিল, ‘সিভিল কোর্টস (অ্যামেন্ডমেন্ট) বিল, ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইমস (ট্রাইব্যুনালস) (অ্যামেন্ডমেন্ট) বিল ও রেজিস্ট্রেশন (অ্যামেন্ডমেন্ট) বিল, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (সংশোধন) বিল ও শেখ হাসিনা মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (সংশোধন) বিল সংসদে পাসের প্রস্তাব করেন আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান। পৃথকভাবে বিলগুলো কণ্ঠভোটে পাস হয়। ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) (সংশোধন) বিল উত্থাপন হলেও তা পাস হয়নি।
বিকালে সম্পূরক কার্যসূচিতে আরও সাতটি বিল উত্থাপন করা হয়। এর মধ্যে ছয়টি বিল পাস হয়। বিলগুলো হলো বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ বিধান) (রহিতকরণ) বিল-২০২৬, নির্দিষ্টকরণ (সম্পূরক) (২০২৪-২৫ অর্থ বছর) বিল-২০২৫, নির্দিষ্টকরণ (২০২৫-২০২৬ অর্থ বছর) বিল-২০২৬, বঙ্গবন্ধু দারিদ্র্য বিমোচন ও পল্লী উন্নয়ন একাডেমি (সংশোধন) বিল-২০২৬, শেখ রাসেল পল্লী উন্নয়ন একাডেমি, রংপুর (সংশোধন) বিল-২০২৬ ও বাণিজ্যিক আদালত বিল-২০২৬। এ ছাড়া জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল (সংশোধন) (রহিতকরণ) বিল-২০২৬ সংসদে উত্থাপিত হলেও তা পাস হয়নি। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে ৯৮টি হুবহু এবং ১৫টি সংশোধিত আকারে সংসদে অনুমোদনের সুপারিশ করেছিল জাতীয় সংসদের বিশেষ কমিটি। বাকি ২০টির মধ্যে চারটি রহিত করা এবং ১৬টি পরবর্তী সময়ে আরও শক্তিশালী করে নতুন বিল আনার সুপারিশ করা হয়।
আইনমন্ত্রী, বিরোধীদলীয় নেতার বিতর্ক : ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইম ট্রাইব্যুনাল-সংক্রান্ত বিলটি পাসের প্রস্তাব করতে গিয়ে আইনমন্ত্রী বলেন, এটি এমন একটি বিল, যার মধ্যে মানবতাবিরোধী অপরাধের সংজ্ঞায় গুমকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। যারা বলছেন, সরকার গুম প্রতিরোধের আইন করতে চাইছে না, তাদের তিনি এ আইন ভালো করে দেখার পরামর্শ দেন। তিনি বলেন, বর্তমান সরকার গুমের বিচারে বদ্ধপরিকর, সেটার বহিঃপ্রকাশ এ আইনে এসেছে।
বিলটি পাস হওয়ার পর পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়ান বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, আইনমন্ত্রী বিল পাসের প্রস্তাব করতে গিয়ে যা বলেছেন, তা অনাহূত। এটা না বললেই ভালো হতো। নির্দিষ্ট সময় যখন আসবে, তখন এ বিষয়ে তারা কথা বলবেন। জবাবে আইনমন্ত্রী বলেন, সংসদের বাইরে অনেকে গুমের বিচার করার ক্ষেত্রে সরকারের সদিচ্ছা নিয়ে প্রশ্ন তোলার চেষ্টা করেছেন। সে কারণে এ বিল উপস্থাপনের আগে তিনি পরিষ্কার করেছেন যে, গুমের বিচারে সরকার কতটা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। পরে আইনমন্ত্রীর উদ্দেশে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, বাইরে কতজন কত কথা বলে! আপনি সংসদের আলোচনার মধ্যে, সংসদ সদস্যদের মধ্যে বক্তব্য সীমাবদ্ধ রাখেন। স্পিকার বলেন, আইনবিধি অনুযায়ী যেটা গৃহীত হবে, সেটা নিয়ে কার্যক্রম গ্রহণ করা হবে। এর আগে ১৯৭৩ সালের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল অ্যাক্ট-এর অধিকতর সংশোধনের জন্য এ বিলটি সংসদে উত্থাপন করা হয়। বিলটি পাসের মধ্য দিয়ে গুমের শিকার ব্যক্তিদের ন্যায়বিচার পাওয়ার আইনি ভিত্তি আরও শক্তিশালী হলো বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এদিকে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর অনুপস্থিতিতে তাঁর তিনটি বিল সংসদে তোলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। সেগুলো হলো ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) (সংশোধন) বিল, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (সংশোধন) বিল ও শেখ হাসিনা মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (সংশোধন)। এর মধ্যে শেষের দুটি বিল পাস হয়। দ্বিতীয় বিলটি উত্থাপনের সময় সালাহউদ্দিন কিছুটা হেসে বলেন, ‘খুব দুঃখের ব্যাপার! এতক্ষণ তো যা বললাম, এখন আবার শেখ হাসিনা বলতে হচ্ছে।’ এ সময় সংসদ সদস্যদের অনেককে হাসতেও দেখা যায়।