২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের স্বপ্নের ফাইনালে আজ মুখোমুখি হতে চলেছে দুই মহাদেশের ফুটবল পরাশক্তি দক্ষিণ আমেরিকার আর্জেন্টিনা ও ইউরোপের স্পেন। কার ঘরে যাবে সোনার কাপ? আর্জেন্টিনা শিরোপা ধরে রাখবে নাকি ১৬ বছর পর হারানো ট্রফি ফিরে পাবে স্পেন। এর আগে ফাইনালে লাতিন আমেরিকা ও ইউরোপের ১১ বার দেখা হয়েছে। দুই মহাদেশের এবার ১২তম লড়াই। ফাইনালে দক্ষিণ আমেরিকান দেশগুলো সুস্পষ্ট ব্যবধানে এগিয়ে প্রতিপক্ষের তুলনায়। ১১ লড়াইয়ে লাতিনদের হার মাত্র তিনবার-১৯৯০, ১৯৯৮, ২০১৪ সালে। অর্থাৎ বিশ্বকাপ শুরুর দীর্ঘ ৬০ বছর পর ফাইনালে ইউরোপীয়রা প্রথম জয়ের সাক্ষাৎ পায় লাতিনদের বিপক্ষে। ১৯৯০ ও ২০১৪-এর ফাইনালের প্রতিপক্ষ ও ফল ছিল অভিন্ন। দুটি ম্যাচেই আর্জেন্টিনা ০-১ গোলে হেরেছে জার্মানির কাছে। আরেকবার অর্থাৎ ১৯৯৮ সালের ফাইনালে ফরাসিদের কাছে হার মানে সাম্বা নৃত্যের ব্রাজিল। বিশ্বকাপের প্রথম আসরেই শুধু লাতিনের দুই দেশ ফাইনালে পরস্পরের মুখোমুখি হয় এবং এখন পর্যন্ত ওই একবারই। ১৯৫০ সালে দুই লাতিন দেশ চ্যাম্পিয়ন-রানার্সআপ হলেও আসরটিতে ‘ফাইনাল’ বলে কিছু ছিল না। গ্রুপ পদ্ধতির খেলা শেষে চার সেরা দলকে নিয়ে রাউন্ড লিগ পদ্ধতিতে আবারও খেলা হয়েছিল। সূচি অনুযায়ী উরুগুয়ে ও ব্রাজিল মুখোমুখি হয় শেষ ম্যাচে। ড্র করলেই যেখানে চ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল সেখানে নিজেদের মাঠে উল্টো হেরে গিয়ে উরুগুয়ের হাতে দ্বিতীয়বার ট্রফি তুলে দেয়। এ কারণে অনেকেই ব্রাজিল ও উরুগুয়ে ১৯৫০-এর ফাইনালে মুখোমুখি হয়েছিল বলে থাকেন, কিন্তু সেটা সম্পূর্ণ ভুল। ওটা শেষ ম্যাচ ছিল ঠিকই কিন্তু বিশ্বকাপফাইনাল নয় কখনই। কাকতালীয় হচ্ছে, ১৯৩০ ও ১৯৫০ দুবারই চ্যাম্পিয়ন দলটি হচ্ছে উরুগুয়ে। ১৯৫৮ ও ১৯৭০ সালে ব্রাজিলের সুইডেন ও ইতালির বিরুদ্ধে যথাক্রমে ৫-২ ও ৪-১ গোলের জয় দুটিই লাতিনদের বেশি ব্যবধানের জয়। ইউরোপিয়ানদের কাছে দক্ষিণ আমেরিকানদের বড় হারের রেকর্ডটাও ব্রাজিলের। ১৯৯৮ সালে ০-৩ গোলে অসহায় আত্মসমর্পণ ফ্রান্সের কাছে তাদের। লাতিন-ইউরোপের দুটি ফাইনাল আবার টাইব্রেকারেও গড়িয়েছে, দুবারই লাতিনরা বিজয়ী। ১৯৯৪ আর ২০২২ সালে যথাক্রমে ইতালি আর ফ্রান্সের বিরুদ্ধে জয়ী দল দুটি ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনা। আটবার ফাইনালে উঠে বিশ্বকাপের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি ফাইনাল খেলার রেকর্ড নিজেদের করে রেখেছেন জার্মানরা। আর এবারেরটা নিয়ে সাতবার ফাইনাল খেলছে আর্জেন্টিনা। ছয়বার করে ফাইনালে উঠে এর পরের অবস্থান যৌথভাবে ব্রাজিল ও ইতালির। এবার পরস্পরের সঙ্গে ১২তম প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আর্জেন্টিনা টানা দ্বিতীয় শিরোপা জয়ের লক্ষ্যে প্রথমবারের মতো মুখোমুখি হচ্ছে স্পেনের। অন্যদিকে স্পেন ২০১০ সালের সাফল্যের সঙ্গে তাদের মুকুটে আর একটি পালক যোগ করতে চাইবে। লাতিন আমেরিকার ছন্দ ও স্কিলের সঙ্গে ইউরোপের গতি, শক্তি ও ছন্দের লড়াইয়ে অতীতের ধারাবাহিকতায় এবারও কি লাতিনদের আধিপত্য বজায় থাকবে?


সব প্রতিযোগিতা এবং আন্তর্জাতিক প্রীতি ম্যাচ মিলিয়ে স্পেন ও আর্জেন্টিনা ১৪ বার মুখোমুখি হয়েছে। মুখোমুখি লড়াইয়ের রেকর্ড সার্বিকভাবে সমান সমান। দুটি ড্রয়ের বিপরীতে দুই দলই ছয়টি করে ম্যাচ জিতেছে। মুখোমুখি রেকর্ডটির কারণেই ফাইনালের আগে কোনো সুস্পষ্ট ফেবারিটের ইঙ্গিত পাওয়া যায় না। বিশ্বকাপে একমাত্র সাক্ষাৎ হয়েছিল দুই দেশের। ১৯৬৬ সালের গ্রুপ পর্বে ওই ম্যাচে আর্জেন্টিনা জিতেছিল বিশ্বকাপ২-১ গোলে। তারপর থেকে উভয় দেশ নিয়মিতভাবে বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় একে অপরের সাক্ষাৎ পেলেও বিশ্বকাপে তাদের আর দেখা হয়নি। ফাইনাল তো দূরের কথা, এটিই হবে বিশ্বকাপের কোনো নকআউট পর্বে দুই দলের প্রথম সাক্ষাৎ। অতীত ম্যাচের ফলাফল কিংবা সাম্প্রতিক ফর্মের ওপর ফাইনাল ম্যাচের রেজাল্ট নির্ভর করবে না, বরং মাঠে যারা নিজেদের সেরাটা উজাড় করে দেবে তার ওপরই নির্ভর করবে। স্পেনের বর্তমান দলটিতে ২০১০ সালের পুরোনো সেই স্পেনের ছায়া দেখা যাচ্ছে। পজিশন, জায়গা তৈরির সৃষ্টিশীলতা আর পাসিং-এ অবাধ বৈচিত্র্য তাদের খেলায়। বল ধরে রাখে কম, দ্রুত দেওয়া-নেওয়া পরস্পরের মধ্যে অসংখ্য পাসে বিপক্ষের মার্কিং-এর দফারফা, দ্রুত জায়গা পরিবর্তন আর বলের দখল না হারানো তাদের চিরায়ত অভ্যাস। সঙ্গে প্রত্যেক ফুটবলারের অলরাউন্ড এবিলিটি। উইং ব্যাক আক্রমণে গেলে মাঝমাঠের ফুটবলার নেমে আসে সে জায়গায়। বলের দখল হারানো মাত্র আক্রমণভাগের খেলোয়াড় পরিণত হন ডিফেন্ডারে। ‘মিডফিল্ড জেনারেল’ অধিনায়ক রদ্রির নেতৃত্বে লা রোজারাদের মাঝমাঠ প্রতিপক্ষের বড় চিন্তার কারণ সন্দেহাতীতভাবে। আর স্প্যানিশদের জমাট রক্ষণভাগ নিঃসন্দেহে এ বিশ্বকাপের অন্যতম সেরা। এবারের আসরে এখন পর্যন্ত মাত্র একবারের জন্য তাদের জাল খুঁজে পেয়েছে প্রতিপক্ষরা। ২০১০ সালেও মাত্র দুটি গোল হজম করে শিরোপা জিতেছিল ‘লা রোজারা’। এক গোল খেয়ে ফাইনালে ওঠার ঘটনা মাত্র তৃতীয়বার এটা নিয়ে। কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তের কৌশল আর নিখুঁত পরিকল্পনা এবং মাঠে খেলোয়াড়দের সেটির বাস্তবায়নের কারণেই স্পেনের ফাইনালে উঠে আসা। দলীয় শক্তি বিবেচনায় প্রতিপক্ষের তুলনায় অনেকটুকুই এগিয়ে স্প্যানিশ দলটি। সর্বশক্তি দিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে বিজয়মাল্য নিজেদের গলাতেই নিতে চাইবে তারা। কিন্তু চাইলেই কি আর সব হিসাব মেলানো যায়, না মিলে? প্রতিপক্ষের নাম যখন আর্জেন্টিনা, আর যে দলে আছে লিওনেল মেসি নামক এক ফুটবল দানব তখন সব হিসাবনিকাশের ঘড়ির কাঁটা উল্টো দিকে ঘুরে যাওয়াটাই স্বাভাবিক। শুধু তার উপস্থিতিই মৃত-সঞ্জীবনী সুরা হয়ে কাজ করে তারসহ খেলোয়াড়দের শরীর-মনে। তার চেয়ে নিখুঁত আর পরিপূর্ণ কোনো ফুটবলার এ ধরায় এসেছে কি না বা আসবে কি না সন্দিহান অনেকেই। স্বকীয়তা, সৃষ্টিশীলতায় যিনি অনন্য, অসাধারণ। বার্সার আঁতুরঘর থেকে উঠে এসে পুরো বিশ্বকে ক্রমাগত সম্মোহিত করে চলেছেন মোহ জাল বিছিয়ে দেওয়া খেলার মাধ্যমে। এ বিশ্বকাপেও তিনি অপ্রতিরোধ্য, নিজ লক্ষ্য পূরণে অবিচল। তিনি স্বপ্ন দেখেন, অন্যদের নিয়ে কণ্টকাকীর্ণ পথ পাড়ি দেন সেই স্বপ্ন পূরণে। তিনি সেনাপতি, যুদ্ধের দামামায় নেতৃত্ব তাঁর হাতে। বাকি ১০ জন অটল বিশ্বাসে অকুতোভয় সৈনিকের ন্যায় নিজেদের উজাড় করে দিয়ে ফুটবলটা খেলে। পুরো দলটাই অচিন্তনীয় আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠে ওর উপস্থিতিই। সেরা খেলোয়াড়দের দ্বৈরথে ক্রিস্টিয়ানোকে পিছে ফেলেছেন বহু পূর্বেই। গত বিশ্বকাপ জয়ের মাধ্যমে পেলে আর ম্যারাডোনার কাতারে স্থান করে নিয়েছেন তিনি। এবারও যদি আর্জেন্টিনাকে শিরোপা এনে দিতে সফল হন তবে সেরা খেলোয়াড়দের তালিকায় চূড়াতেই থাকবেন তিনি, পেলে-ম্যারাডোনাকে ছাপিয়ে এককভাবেই উচ্চারিত হবে তার নামটি। বাকিরা মামুলি পার্শ্বচরিত্র হিসেবেই থেকে যাবে।


গত কয়েক বছরে মেসির অতিমানবীয় পারফরম্যান্সের কারণে আর্জেন্টিনার সফলতায় ব্রাজিল সমর্থক আমার মনের অস্তিত্বে সূক্ষ্ম একটা চিড় ধরেছে। সে চিড়ের ফাঁক গলে আর্জেন্টিনা আর মেসি অনেকটাই ঢুকে পড়ছে হৃদমাজারে। তাই তো মেসির খেলা দেখার জন্য এখনো রাত জাগি, উল্লাসে গলা ফাটাই উত্তরসূরিদের সঙ্গে।