স্কুল ভবনের সামনে ভারি সুন্দর একখানা মাঠ। দুই দিকে দুটি কাঠের গোলপোস্ট দাঁড়িয়ে আছে।


দুপুর হয়ে আসা রোদে মাঠের ঘাস থেকে ঠিকরে উঠছে সবুজ রং। কী অপূর্ব দৃশ্য! গাড়ির জানালা দিয়ে মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে আছি সেই মাঠের দিকে। এ রকম দুই-তিনটি স্কুল ও একটি কলেজের মনোরম মাঠ চোখে পড়ল কয়েক কিলোমিটারের মধ্যে। রাজেন্দ্রপুরের বনের মাঝখান দিয়ে পথ চলে গেছে বহুদূর।


বনের ধারে মানুষের ঘরবাড়ি। রাস্তার ধারে স্কুল কলেজ দোকানপাট। আমার চোখ জুড়িয়ে গেল মাঠগুলো দেখে। এই পথে মনোহরদী যাব।


গন্তব্যের কথা মনেই রইল না। মন চলে গেল দূর শৈশব আর ফেলে আসা ছেলেবেলায়। বিক্রমপুরের মেদিনীমণ্ডল গ্রাম আর পুরান ঢাকার দিনগুলোতে। জিন্দাবাহার থার্ড লেনে দুই-তিন বছরের ছেলেবেলা। তারপর গেণ্ডারিয়ার দুরন্ত কৈশোরকাল। সেই সব দিনের কথা ভেবে এখনো কত রোমাঞ্চ ছড়িয়ে যায় শরীরে।


কত মাঠ ছিল মেদিনীমণ্ডলে। খানবাড়ির মাঠ, পুরানবাড়ির মাঠ, তালুকদারবাড়ির মাঠ। একটু দূরে কালীরখিলের মাঠ। কী বিশাল সেই মাঠ! ষাটের দশকের গোড়ার দিককার কথা। দুপুর শেষ হয়ে পারেনি, আমরা ছুটে গেছি মাঠে। কত রকমের খেলা মাঠে। বড়রা ফুটবল খেলছে। শিশু-কিশোররা খেলছে গোল্লাছুট বা দাঁড়িয়াবান্ধা। কানামাছি খেলছে কেউ কেউ। এসব খেলতে খেলতে সন্ধ্যা হয়ে যায়, বাড়ি ফিরতে ইচ্ছা করত না।


মেদিনীমণ্ডলের পাশেই কাজিরপাগলা গ্রাম। বাজারের সঙ্গে আমাদের স্কুল। কাজিরপাগলা এ টি ইনস্টিটিউশন। বিশাল একখানা মাঠ স্কুলের সঙ্গে। টিফিনের সময় আমরা হৈহৈ করে ছুটে গেছি মাঠে। ছুটির পর বড় ক্লাসের ছেলেরা ফুটবল খেলত। শীতকালে খেলত ক্রিকেট। আমরা ছোটরা সুযোগ পেলেই সেই মাঠে গিয়ে কারণে-অকারণে ছোটাছুটি করি। ঘেমে নেয়ে ক্লান্ত হই।


জিন্দাবাহারের জীবনে পাঁচ-ছয় হবে আমার বয়স। পাশেই আরমানিটোলা। বিকেল হলেই চলে গেছি আরমানিটোলার মাঠে। কী বিশাল মাঠ! কত রকমের খেলা সেই মাঠে। আমিও সমবয়সীদের সঙ্গে ছোটাছুটি করে বিকেলগুলো শেষ করে ফেলতাম। বাড়ি ফিরতে সন্ধ্যা হলে পাড়ার অগ্রজরাও শাসনের সুরে বলতেন, ‘সন্ধ্যা হয়ে গেছে, বাড়ি গিয়ে পড়তে বসো।’ এই কালে কে কার দিকে তাকায়? এক ফ্ল্যাট বাড়িতে থেকেও পাশের ফ্ল্যাটের বাসিন্দাদের খবর নেওয়া হয় না। পাড়ার মানুষদের কে কার খবর রাখে, কে কাকে চেনে!


মেদিনীমণ্ডলের জীবন ফেলে গেণ্ডারিয়ায় চলে এসেছিলাম। গেণ্ডারিয়া হাই স্কুলে ভর্তি হয়েছি। স্কুলটির নিজস্ব কোনো মাঠ নেই। নিজস্ব মাঠের আসলে কোনো দরকারই ছিল না। স্কুলের পুব পাশে ফায়ার সার্ভিসের মাঠ। সেই মাঠ আমাদের জন্য অবারিত। পশ্চিম-দক্ষিণে মিলব্যারাকের মাঠ। সেই মাঠও অবারিত। আর উত্তরে ধূপখোলা মাঠ। ষাটের দশকে, সত্তরের দশকেরও অনেকগুলো বছর পর্যন্ত মাঠটি এতই বড় ছিল যে দশ-বারোটি ফুটবল টিম আলাদা আলাদা ভাগ হয়ে খেলতে পারত।


ছেলেবেলায় আমাদের খেলার মাঠের অভাব ছিল না। যেদিকে যেতাম সেদিকেই মাঠ। সেই সব মাঠ নিঃশব্দে উধাও হয়ে গেল। ঢাকা শহরের ছোট ছোট মাঠগুলো তো হারিয়ে গেছেই, গ্রামের অনেক মাঠও নেই। মেদিনীমণ্ডলের খানবাড়ির মাঠটি নেই। পুরানবাড়ির মাঠও উধাও। কালীরখিলের মাঠ চারদিক দিয়ে অনেকখানি সংকুচিত হয়েছে। পুরান ঢাকার আরমানিটোলার মাঠটিও আগের অবস্থায় নেই। ধূপখোলা মাঠের চারদিকেই দোকান।


মাঠ নেই, এমন স্কুলের কথা কি বাংলাদেশের মানুষ কখনো ভাবতে পেরেছে? শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মাঠ থাকবে না এ কথা কেউ কখনো কল্পনাই করেনি। অথচ এখন বাংলাদেশের ১৫ হাজারেরও বেশি স্কুলে খেলার মাঠ নেই। অর্ধেকের বেশি বিশ্ববিদ্যালয়ে মাঠ নেই। ৭২ ভাগেরও বেশি ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের শিক্ষার্থীরা খেলার মাঠ থেকে বঞ্চিত। ঢাকা শহরের বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ৯৮ ভাগেরই নিজস্ব মাঠ নেই। বিভাগীয় শহরগুলোর বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ৪০ ভাগের মাঠ নেই। দেশে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ১১৬টি। এই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অর্ধেকেরও বেশির নিজস্ব খেলার মাঠ নেই। ঢাকার ৩৪২টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ২৫২টিরই খেলার মাঠ নেই।


মাঠ না থাকার ফলে আমাদের শিশুরা যে কী ভয়ংকর ক্ষতির মুখে পড়েছে, ভাবলে গা শিউরে ওঠে। খেলার প্রতি আকর্ষণ মানুষের জন্মগত। মাঠ কাছে পেলে খেলতে যাওয়ার কথা কোনো শিশুকেই বলে দিতে হবে না। মাঠটিই তাকে টেনে নেবে নিজের কাছে। সে খেলবে, পাড়ার অন্য শিশুদের সঙ্গে পরিচিত হবে, তার শারীরিক ও মানসিক বিকাশ ঘটবে। মাঠ হচ্ছে প্রকৃতির উন্মুক্ত বুক। সেই বুক শিশুটিকে আগলে রেখে বড় করে তুলবে। তাকে স্বাস্থ্যবান, শক্তিশালী ও মেধাবী করে তুলবে। আমাদের শিশুরা মাঠ পাচ্ছে না বলে ডিজিটাল ডিভাইসে আসক্ত হচ্ছে। স্কুলে মাঠ নেই, পাড়ায় মাঠ নেই। সে বন্দি হয়ে থাকছে ঘরে। তার তো কিছু করার নেই! পড়ার ফাঁকে ফাঁকে বাকি সময়টা সে কী করে কাটাবে? বাধ্য হয়ে মোবাইল কম্পিউটার টেলিভিশন—এসবে ঝুঁকে গেছে। ফলে তার শারীরিক বিকাশ বিঘ্নিত হচ্ছে, প্রকৃত মানসিক বিকাশ ঘটছে না।


এই অবস্থা থেকে শিশু, কিশোর ও তরুণ প্রজন্মকে উদ্ধার করতেই হবে। এই চিন্তা থেকে অসাধারণ এক উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। দেশের প্রতিটি ইউনিয়নে কমপক্ষে আট বিঘা জমি বরাদ্দ করে খেলার মাঠ সংস্কার, উন্নয়ন বা প্রতিষ্ঠা করা হবে। এই কাজটি যদি যথাযথভাবে সম্পন্ন করা যায়, তাহলে পরবর্তী প্রজন্মের জন্য এ হবে এক অবিস্মরণীয় কাজ। শিশু-কিশোরদের শারীরিক-মানসিক বিকাশ ঘটবে ব্যাপকভাবে। মাদকের প্রতি আসক্তি, অপরাধপ্রবণতা ও সামাজিক অবক্ষয়ের বুঁকি কমে যাবে অনেকখানি। আমরা কিশোর গ্যাংয়ের উৎপাত দেখছি। অল্পবয়সী ছেলে মাদকের টাকা না পেয়ে মা-বাবাকে খুন করছে। কোনো কোনো মা-বাবা বাধ্য হয়ে ছেলেকে তুলে দিচ্ছেন পুলিশের হাতে। দেশের সর্বত্রই পরিবারগুলোর ভেতরে বড় হয়ে ওঠা সন্তানটিকে নিয়ে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। পরিবারের একটি ছেলে বা মেয়ে মাদকে আসক্ত হলে সেই পরিবার ধ্বংস। এই অবক্ষয় আসলে আমরাই তৈরি করে দিয়েছি। আমরা আমাদের সন্তানদের কাছ থেকে মাঠগুলো কেড়ে নিয়েছি। তাদের জন্য উন্মুক্ত জায়গা রাখিনি। ক্ষুদ্র স্বার্থে সর্বনাশের দোরগোড়ায় নিয়ে গেছি পরবর্তী প্রজন্মকে। এই অবস্থা থেকে মুক্তি দেওয়ার জন্য সরকারি উদ্যোগটির তুলনা হয় না। নিশ্চয় এই পরিকল্পনার মধ্য দিয়ে আমরা আমাদের সন্তানদের শারীরিক-মানসিক বিকাশের মধ্য দিয়ে আলোকিত মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে পারব।


এ দেশে যা একবার হাতছাড়া হয়ে যায়, তা ফিরে পাওয়ার ইতিহাস নেই। আমাদের যে মাঠগুলো মানুষের পেটে হজম হয়ে গেছে, তা উদ্ধার করা কঠিন কাজ। সরকারের সদিচ্ছা থাকলে সেই চেষ্টা নিশ্চয় তারা করবে। আর তা যদি না-ও হয়, প্রতি ইউনিয়নে আট বিঘা জমি বরাদ্দ করে নতুন পরিকল্পনাটি বাস্তবায়ন করতে পারলেও আমরা হারিয়ে যাওয়া মাঠগুলোর দুঃখ ভুলতে পারব। ভবিষ্যতে একটি স্বাস্থ্যবান সুশৃঙ্খল ও উৎপাদনশীল জাতি গঠনে এই প্রকল্প যুগান্তকারী অবদান রাখবে।


মনোহরদী যাওয়ার পথে যে স্কুল আর কলেজের মাঠগুলো দেখে মুগ্ধ হয়েছিলাম, দেশের প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ও রকম মাঠ তৈরি হবে, এই আমার স্বপ্ন। আমাদের শিশু-কিশোররা খোলা মাঠে পর্যাপ্ত আলো হাওয়ায় শরীর মন উন্মুক্ত করে, সুস্বাস্থ্য আর সুচিন্তায় বড় হয়ে উঠুক, তাদের আলোয় আলোকিত হোক বাংলাদেশ, এই তো চাই। সরকার ও দেশের জনগণ চাইলে সবই সম্ভব।