মসজিদে আকসায় রজব মাসের ২৭ তারিখ রাতে রসুল (সা.) শুয়ে আছেন। হঠাৎ দেখলেন ছাদ খুলে গেছে। দুজন ফেরেশতা এসে রসুল (সা.)কে ধরে জমজম কূপের কাছে নিয়ে এলেন। এক আধ্যাত্মিক সফরের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে হজরতের ওপেন হার্ট সার্জারি করলেন ফেরেশতা দুজন। জমজমের পানিতে কালব ধুয়েমুছে আবার আগের মতো স্থাপন করে একটি বাহন আনলেন। এ বাহনটিকে অনেকেই বোরাক নামে চিনে থাকেন। বলা হয়, এটি গাধা থেকে ছোট খচ্চর থেকে বড় কোনো প্রাণী। বোরাকে চড়ে নবীজি (সা.) বায়তুল মোকাদ্দাসে এসে সব নবীর উপস্থিতিতে দুই রাকাত নামাজ আদায় করেন। নামাজের মাধ্যমেই শুরু হয় তাঁর আধ্যাত্মিক এ সফর। কোরআনের আয়াতে এসেছে সে সফরের কথা। ‘পবিত্র সেই আল্লাহ, যিনি তাঁর আদরের বান্দাকে এক ভাবরাতে মসজিদে হারাম থেকে মসজিদে আকসা পর্যন্ত ভ্রমণ করিয়েছেন। যাতে করে তাঁর নেয়ামতরাজি ও সৃষ্টিকৌশল দেখাতে পারেন।’ (সুরা ইসরা, আয়াত ১)। মসজিদে হারাম থেকে মসজিদে আকসা পর্যন্ত ভ্রমণকে বলা হয় ইসরা। আর মসজিদে আকসা থেকে খোদার আরশ পর্যন্ত ভ্রমণকে বলা হয় মেরাজ।
মেরাজ সংঘটিত হয়েছিল নবুয়তের ১১তম বছরের ২৭ রজবে। তখন নবীজি (সা.) এর বয়স ৫১ বছর। মেরাজ হয়েছিল সশরীরে জাগ্রত অবস্থায়। এ মহিমান্বিত সফরে বিভিন্ন আসমানে বিভিন্ন নবীদের সঙ্গে দেখা হয়। প্রথম আসমানে হজরত আদম (আ.), দ্বিতীয় আসমানে হজরত ইয়াহইয়া (আ.) ও হজরত ঈসা (আ.), তৃতীয় আসমানে হজরত ইউসুফ (আ.), চতুর্থ আসমানে হজরত ইদ্রিস (আ.), পঞ্চম আসমানে হজরত হারুন (আ.), ষষ্ঠ আসমানে হজরত মুসা (আ.), সপ্তম আসমানে হজরত ইবরাহিম (আ.)-এর সঙ্গে সালাম ও কুশল বিনিময় হয়েছে। হুজুর (সা.) বায়তুল মামুর গেলেন, যেখানে প্রতিদিন ৭০ হাজার ফেরেশতা আসেন ও চলে যান; তাঁরা দ্বিতীয়বার আসার সুযোগ পান না। অতঃপর সিদরাতুল মুনতাহায় গেলেন। সেখানে চারটি নদী দেখলেন; দুটি প্রকাশ্য ও দুটি অপ্রকাশ্য। অপ্রকাশ্য দুটি নদী জান্নাতের আর প্রকাশ্য নদী দুটি হলো নীল ও ফোরাত। তারপর বায়তুল মামুরে পৌঁছালে এক পেয়ালা শরাব, এক পেয়ালা দুধ ও এক পেয়ালা মধু পেশ করা হলো। তিনি (সা.) দুধ পান করলেন আর এটা ছিল তাঁর ফিতরাতসুলভ আচরণ। (বুখারি শরিফ, হাদিস ৩৬৭৪)। রসুল (সা.) বোরাকে চড়ে ছুটে চলেছেন। এমন সময় তিনি দেখলেন, একদল নারী-পুরুষ নিজের নখ দিয়ে বুকে মুখে আঁচড় কাটছে। তাদের নখগুলো ছিল লোহার। তাই
আরেকটু এগিয়ে গিয়ে রসুল (সা.) দেখলেন, একদল মানুষ খুব কষ্ট করে নদী সাঁতরে কিনারে এসেছে। সে যখন শক্তি পাবে, ক্লান্তি কাটবে এমন খাবার চাইছে, তখন তার সামনে পাথরের টুকরো তুলে ধরা হচ্ছে। প্রচণ্ড ক্ষুধায় লোকটি পাথরই গিলে নেয়। সঙ্গে সঙ্গে তাকে আবার নদীতে ছুড়ে মারে এবং সাঁতারপর্ব শুরু হয়। লোকটির এরকম কষ্ট দেখে নবীজি (সা.) জানতে চাইলেন, এর অপরাধ কী? তখন জিবরাইল (আ.) বললেন, হুজুর! এ হলো আপনার উম্মতের মধ্যে সুদখোর-জালেম। তাই তাকে এ নির্মম শাস্তি দেওয়া হচ্ছে (তাফসিরে মারদুবিয়া)।
মেরাজের রজনিতে রসুল (সা.) আল্লাহতায়ালার দিদার লাভ করেন। আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের আলেমদের মতে, রসুল (সা.) চর্মচোখে আল্লাহকে দেখতে পেয়েছেন। হাবিব ও মাহবুবের একান্ত সাক্ষাতে ১৪টি বিষয় ঘোষণা হয়েছে। যথা ১. আল্লাহ ছাড়া কারও ইবাদত করবে না, ২. পিতা-মাতার সঙ্গে সদ্ব্যবহার করবে, ৩. নিকট স্বজনদের তাদের অধিকার দাও, ৪. মিসকিনদের ও পথসন্তানদের (তাদের অধিকার দাও), ৫. অপচয় করো না, অপচয়কারী শয়তানের ভাই, ৬. কৃপণতা করো না, ৭. সন্তানদের হত্যা করবে না, ৮. ব্যভিচারের নিকটেও যেও না, ৯. মানব হত্যা করো না, ১০. এতিমের সম্পদের কাছেও যেও না, ১১. প্রতিশ্রুতি পূর্ণ করো, ১২. মাপে পূর্ণ দাও, ১৩. অবস্থান করো না যাতে তোমার জ্ঞান নেই, ১৪. পৃথিবীতে গর্বভরে চলো না। এসবই মন্দ, তোমার রবের কাছে অপছন্দ। (সুরা ইসরা, আয়াত: ২২-৪৪)