রসুলুল্লাহ (সা.) রমজান উপলক্ষে একটি ঐতিহাসিক খুতবা প্রদান করেছিলেন, তা মূলত পবিত্র রমজান মাসের পরিচয়, দর্শন ও উদ্দেশ্যের এক অনুপম দলিল। এই হাদিসে রমজানকে কেবল উপবাসের মাস হিসেবে নয়; বরং আত্মশুদ্ধি, সামাজিক দায়বদ্ধতা, মানবিক সহমর্মিতা ও আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের পূর্ণাঙ্গ প্রশিক্ষণকাল হিসেবে তিনি তুলে ধরেছেন। (বায়হাকি শুয়াবুল ইমান, ইমাম নববী ও ইমাম সুয়ূতি এই হাদিসটিকে গ্রহণযোগ্য বলে উল্লেখ করেছেন)
রসুলুল্লাহ (সা.) তাঁর খুতবার শুরুতেই মানবজাতিকে সম্বোধন করে ঘোষণা করেন, এক মহান ও বরকতময় মাস তোমাদের ওপর ছায়া বিস্তার করতে যাচ্ছে। এই মাসের বিশেষত্ব হলো, এতে এমন এক রজনি রয়েছে যা হাজার মাসের চেয়েও উত্তম, লাইলাতুল কদর। এর মাধ্যমে বোঝানো হয়েছে, রমজান সময়ের সাধারণ হিসাবকে অতিক্রম করে অনন্ত সওয়াবের দ্বার উন্মুক্ত করে দেয়। অল্প সময়ে অধিক অর্জনের এমন সুবর্ণ সুযোগ আল্লাহতায়ালা মুহাম্মদ (সা.)-এর উম্মতকে বিশেষ অনুগ্রহ হিসেবে দান করেছেন। এই মাসে আল্লাহতায়ালা দিনের বেলা রোজাকে ফরজ করেছেন এবং রাতের ইবাদত নফল করেছেন। আশ্চর্যের বিষয় হলো, রমজানে নফল ইবাদতও অন্য সময়ের ফরজ ইবাদতের সমান মর্যাদা লাভ করে। আর এ মাসে একটি ফরজ আদায় করলে তার সওয়াব হয় অন্য সময়ের সত্তরটি ফরজের সমান। এর মাধ্যমে স্পষ্ট হয়, রমজান হলো আমলের গুণগত মান বাড়ানোর মাস, যেখানে নিয়ত ও চেষ্টা বহুগুণে ফলপ্রসূ হয়।
রসুলুল্লাহ (সা.) রমজানকে ‘শাহরুস সবর’ ধৈর্যের মাস আখ্যা দিয়েছেন। রোজা মানুষকে ক্ষুধা, তৃষ্ণা ও প্রবৃত্তির লাগাম টেনে ধরতে শেখায়। ধৈর্যের এই প্রশিক্ষণের প্রতিদান সম্পর্কে রসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ধৈর্যের পুরস্কার জান্নাত। অর্থাৎ রমজান আমাদের চরিত্রকে এমনভাবে গড়ে তোলে, যা জান্নাতের উপযোগী মানুষ তৈরি করে।
এ মাসকে তিনি ‘শাহরুল মুওয়াসাত’ সহমর্মিতার মাস হিসেবেও অভিহিত করেছেন। রোজা মানুষকে অভাবী ও ক্ষুধার্ত লোকদের কষ্ট অনুভব করতে শেখায়। ফলে সমাজে দয়া, দান ও সহযোগিতার চর্চা বৃদ্ধি পায়। বিশেষভাবে রোজাদারকে ইফতার করানোর ব্যাপারে তিনি যে উৎসাহ দিয়েছেন, তা ইসলামের সামাজিক সৌন্দর্যের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। একজন রোজাদারকে খেজুর, এক ঢোক পানি বা সামান্য দুধ দিয়েও ইফতার করালে আল্লাহতায়ালা রোজাদারের সমপরিমাণ সওয়াব দান করেন। এবং তা রোজাদারের সওয়াব কমানো ছাড়াই। এটি প্রমাণ করে, ইসলামে নিয়ত ও আন্তরিকতার মূল্য বস্তুগত পরিমাণের চেয়ে অনেক বেশি।
হাদিসের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, রমজানের তিনটি দশকের ব্যাখ্যা। এ মাসের প্রথম দশক রহমত, মধ্য দশক মাগফিরাত এবং শেষ দশক জাহান্নাম থেকে মুক্তির সময়। এর মাধ্যমে রমজানের অগ্রযাত্রাকে ধাপে ধাপে আত্মিক উন্নয়নের পথে পরিচালিত করা হয়েছে। প্রথমে আল্লাহর দয়া লাভ, এরপর গুনাহ মাফ এবং সর্বশেষে চূড়ান্ত মুক্তি।
রসুলুল্লাহ (সা.) আরও বলেন, যে ব্যক্তি এ মাসে তার অধীনস্থদের কাজ সহজ করে দেয়, আল্লাহতায়ালা তাকে ক্ষমা করেন এবং জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেন। এটি ইসলামের শ্রমনীতি ও মানবিক ব্যবস্থার এক গভীর নির্দেশনা, যেখানে ক্ষমতা ও দায়িত্বের সঙ্গে দয়া ও সহানুভূতির সমন্বয় ঘটানো হয়েছে। সবশেষে নবীজি (সা.) চারটি আমলের কথা উল্লেখ করেছেন, যা রমজানে বিশেষভাবে বেশি করার নির্দেশ দিয়েছেন। এর মধ্যে দুটি হলো, আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার জন্য, কালিমা শাহাদাত ও বেশি বেশি ইস্তিগফার। আর দুটি এমন, যা ছাড়া মানুষের মুক্তি অসম্ভব, জান্নাত প্রার্থনা করা এবং জাহান্নাম থেকে আশ্রয় চাওয়া। এ চারটি আমল মূলত ঈমান, তাওবা, আশা ও ভয়ের ভারসাম্যপূর্ণ সমন্বয়।
এই হাদিসের সারকথা হলো, রমজান কেবল উপবাসের মাস নয়; এটি আত্মসংযম, ইবাদত, সামাজিক দায়িত্ব, মানবিকতা ও আল্লাহমুখী জীবনের এক পূর্ণাঙ্গ পাঠশালা। যে ব্যক্তি এ মাসকে যথাযথভাবে কাজে লাগাতে পারে, তার জন্য রমজান হয়ে ওঠে গুনাহমুক্ত জীবন ও চিরস্থায়ী সফলতার সোপান। এই হাদিস রোজার প্রকৃত তাৎপর্য ও আত্মিক দর্শনকে অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় তুলে ধরেছে। আজকের সমাজে রোজাকে অনেকেই একটি আনুষ্ঠানিক ইবাদত হিসেবে সীমাবদ্ধ করে ফেলছেন। দিনের বেলায় খাবার ও পানীয় বর্জন করা হচ্ছে, অথচ মুখে মিথ্যা, জিহ্বায় কটু বাক্য, চোখে অন্যায় দৃষ্টি, হাতে দুর্নীতি এবং আচরণে জুলুম-সবই বহাল থাকছে। এই দ্বৈত আচরণ থেকেই জন্ম নিচ্ছে আত্মপ্রবঞ্চনা। হাদিসটি আমাদের সেই ভ্রান্ত ধারণা থেকে বের করে এনে জানিয়ে দেয়, নৈতিকতা ও সত্যবাদিতা ছাড়া রোজা অর্থহীন। রোজা হোক আত্মশুদ্ধির এক বিপ্লব। মিথ্যা ও অন্যায় বর্জনের দৃঢ় অঙ্গীকার হোক এর প্রথম শর্ত। তাহলেই রোজা আমাদের সত্যিকারার্থে আল্লাহভীরু, নৈতিক ও মানবিক মানুষে পরিণত করবে।