নতুন বছর শুধু ক্যালেন্ডারের একটি সংখ্যা পরিবর্তনের নাম নয়, এটি মুমিনের জীবনে আত্মসমালোচনা, আত্মশুদ্ধি ও নবসংকল্প গ্রহণের এক গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ। সময় আল্লাহ তাআলার এক মহান নিয়ামত। প্রতিটি নতুন দিন, নতুন মাসনতুন বছর আমাদের সামনে হাজির করে আত্মজিজ্ঞাসার প্রশ্নআমি কি আমার সময়কে আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে ব্যয় করছি? নাকি গাফিলতি ও উদাসীনতায় জীবনকে ক্ষয় করছি?

আত্মসমালোচনা ও তাওবার নবায়ন

নতুন বছরে মুমিনের প্রথম করণীয় হলো আত্মসমালোচনা। গত বছরে আমি কী অর্জন করেছি? আমার সালাত, সিয়াম, জাকাত, আখলাকসবকিছু কি আল্লাহর সন্তুষ্টি অনুযায়ী হয়েছে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজে বের করাই আত্মসমালোচনার মূল উদ্দেশ্য

যদি কোনো গাফিলতি, পাপ বা অবহেলা চোখে পড়ে, তবে দেরি না করে খাঁটি তাওবার মাধ্যমে আল্লাহর দরবারে ফিরে আসাই মুমিনের কর্তব্য।

ঈমানের দৃঢ়তা বৃদ্ধি

নতুন বছরে মুমিনের অন্যতম লক্ষ্য হওয়া উচিত ঈমানকে আরো মজবুত করা। ঈমান কোনো স্থির বস্তু নয়, এটি বাড়ে ও কমে। আল্লাহর স্মরণ, কোরআন তিলাওয়াত, রাসুলের জীবনচর্চা এবং নেক আমলের মাধ্যমে ঈমানকে সতেজ রাখতে হয়, বিশেষ করে কোরআনের সঙ্গে গভীর সম্পর্ক গড়ে তোলানিয়মিত তিলাওয়াত, অর্থ অনুধাবন ও আমলে পরিণত করা, মুমিনের জীবনে এক নতুন আলোর দিশা এনে দেয়। কোরআন শুধু পাঠের গ্রন্থ নয়, এটি জীবন পরিচালনার পূর্ণাঙ্গ সংবিধান।

সালাত ও ইবাদতে যত্নবান হওয়া

সালাত হলো মুমিনের জীবনের কেন্দ্রবিন্দু। নতুন বছরে মুমিনের করণীয় হলোসালাতকে আরো সুন্দর ও খুশুখুজুর সঙ্গে আদায় করা। ফরজ সালাতের পাশাপাশি সুন্নত ও নফল ইবাদতে যত্নবান হওয়া আত্মিক উন্নতির জন্য অপরিহার্য।

ফজরের সালাত জামাতে আদায় করা, তাহাজ্জুদের অভ্যাস গড়ে তোলা এবং নিয়মিত দোয়া ও জিকিরে অভ্যস্ত হওয়াএসব নতুন বছরের গুরুত্বপূর্ণ আমল হতে পারে।

চরিত্র ও আখলাকের উন্নয়ন

ইসলাম শুধু ইবাদতের নাম নয়, এটি উত্তম চরিত্রের শিক্ষা। রাসুলুল্লাহ (সা.) উত্তম চরিত্রকে ঈমানের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। নতুন বছরে মুমিনের উচিত নিজের আখলাক পর্যালোচনা করাআমি কি সত্যবাদী? আমি কি ধৈর্যশীল? আমি কি অন্যের অধিকার যথাযথভাবে আদায় করি? পরিবার, প্রতিবেশী, সহকর্মীসবার সঙ্গে উত্তম আচরণ করা মুমিনের পরিচয়।

সময়ের সঠিক ব্যবহার

নতুন বছরে সময় ব্যবস্থাপনা মুমিনের জন্য এক বড় চ্যালেঞ্জ। অপ্রয়োজনীয় কাজে সময় নষ্ট করা, সোশ্যাল মিডিয়া বা অহেতুক ব্যস্ততায় ডুবে থাকাএসব থেকে নিজেকে সংযত করা জরুরি। প্রতিদিনের একটি নির্দিষ্ট সময় ইলম অর্জন এবং আত্মশুদ্ধি ও পরিবারকে দেওয়ার পরিকল্পনা করা সময়ের বরকত বাড়ায়। মুমিন জানেযে সময় চলে গেছে, তা আর ফিরে আসবে না।

ইলম অর্জনে মনোযোগ

ইলম অর্জন করা নারী-পুরুষ প্রত্যেক মুমিনের জন্য ফরজনতুন বছরে মুমিনের করণীয় হলোনিজের দ্বিনি জ্ঞান বাড়ানোর জন্য নিয়মিত অধ্যয়ন করাকোরআন-হাদিসের মৌলিক শিক্ষা, আকিদা, ফিকহসিরাত অধ্যয়ন একজন মুমিনকে সঠিক পথে দৃঢ় রাখে

সামাজিক দায়বদ্ধতা ও দাওয়াত

মুমিন শুধু নিজের নাজাত নিয়েই ব্যস্ত থাকে না, সে সমাজের কল্যাণের কথাও ভাবে। নতুন বছরে গরিব-দুঃখীর পাশে দাঁড়ানো, অসহায়ের সাহায্য করা, ন্যায় ও ইনসাফের পক্ষে অবস্থান নেওয়াএসব সামাজিক দায়িত্ব পালনে সচেষ্ট হওয়া দরকার। দাওয়াতের কাজ, অর্থাৎ সুন্দর ভাষা ও আচরণের মাধ্যমে মানুষকে আল্লাহর পথে আহবান করা মুমিনের এক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।

নতুন বছরের জন্য নেক সংকল্প

নতুন বছর শুরুতেই কিছু বাস্তবসম্মত নেক সংকল্প গ্রহণ করা যেতে পারেপ্রতিদিন নির্দিষ্ট পরিমাণ কোরআন তিলাওয়াত, পাঁচ ওয়াক্ত সালাত জামাতে আদায়, মাসে অন্তত একটি নফল রোজা, নিয়মিত সদকা প্রদান এবং খারাপ অভ্যাস পরিত্যাগ। সংকল্পগুলো যেন বাস্তবসম্মত ও ধারাবাহিক হয়, সেদিকে লক্ষ রাখা জরুরি।

সাফল্যের সোপান

নতুন বছর মুমিনের জন্য কোনো উদাসীন আনন্দের উপলক্ষ নয়, বরং এটি আত্মশুদ্ধি, ঈমানি জাগরণ ও আল্লাহর দিকে ফিরে আসার এক মহামূল্যবান সুযোগ। যে মুমিন নতুন বছরকে আত্মসমালোচনা, তাওবা, ইবাদত ও উত্তম চরিত্র গঠনের মাধ্যমে শুরু করে, তার জন্য এই বছর হতে পারে আখিরাতের সাফল্যের সোপান। আল্লাহ তাআলা যেন আমাদের সবাইকে নতুন বছরে তাঁর সন্তুষ্টির পথে দৃঢ়ভাবে চলার তাওফিক দান করেন। আমিন।