চাঁদা দাবির ফোন আতঙ্কের জনপদে পরিণত হয়েছে চট্টগ্রাম। ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে সাধারণ জনগণ কেউ রক্ষা পাচ্ছেন না সেই ‘আতঙ্কের ফোন’ থেকে। দেশে কিংবা বিদেশের বাড়িতে বসে সন্ত্রাসীরা দিয়ে যাচ্ছেন চাঁদা দাবির ফোন। প্রত্যাশিত চাঁদা না পেলে বাসাবাড়িকে লক্ষ্য করে চলে মুহুর্মুহু গুলি। ব্যবসা ও সাধারণ লোকজন বাড়িতে লক্ষ্য করে একের পর এক গুলি বর্ষণের ঘটনা ঘটলেও বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকছে চাঁদাবাজরা।


সিএমপি দক্ষিণ জোনের উপকমিশনার হোসেন মোহাম্মদ কবির ভুইয়া বলেন, ‘ব্যবসায়ীর বাড়িকে লক্ষ্য করে গুলির ঘটনায় কয়েকজনকে চিহ্নিত করা হয়েছে। তাদের গ্রেপ্তারের জন্য অভিযান শুরু করেছে পুলিশ।’


চট্টগ্রামের শীর্ষ ব্যবসায়ী স্মার্ট গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মুজিবুর রহমান বলেন- ‘বেশ কিছুদিন ধরে বিদেশ থেকে ফোন করে ১০ কোটি টাকা চাঁদা দাবি করছে একটি সন্ত্রাসী গ্রুপ। তাদের কথা মতো চাঁদা না দেওয়ায় আমাদের বাড়িকে লক্ষ্য করে দুই দফা গুলি করেছে সন্ত্রাসীরা। যার মধ্যে সর্বশেষ পুলিশ পাহারার মধ্যেই গুলি বর্ষণের ঘটনা ঘটে। এখন আমরা চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভোগছি।’ জানা যায়, চাঁদার দাবিতে একের পর এক ফোন পাচ্ছেন চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে সাধারণ লোকজন। বাদ যাচ্ছেন না প্রবাসীরাও। প্রত্যাশিত চাঁদা না পেলেই সন্ত্রাসীদের অনুসারীরা টার্গেটের বাসাবাড়িকে লক্ষ্য করে বর্ষণ করে মুহুর্মুহু গুলি। এতে করে আতঙ্কিত ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে সাধারণ লোকজন। চট্টগ্রাম নগরী এবং জেলায় চাঁদার দাবিতে ফোনে হুমকি, বাড়িকে লক্ষ্য করে গুলি বর্ষণ এবং মারধরের ঘটনায় ঘুরে ফিরে উঠে আসছে কয়েকটি নাম। তাদের মধ্যে আলোচিত বিদেশে পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী খান ওরফে শিবির সাজ্জাদ ওরফে বড় সাজ্জাদ। ২০০৪ সাল থেকে বিদেশে পালিয়ে থাকলেও চট্টগ্রামের আন্ডারওয়ার্ল্ড নিয়ন্ত্রণ করছে ইন্টারপোলের রেড নোটিসধারী এ সন্ত্রাসী। অভিযোগ রয়েছে বিদেশের মাটিতে বসেই ফোন দিয়ে চাঁদা দাবি করেন বড় সাজ্জাদ। চাঁদা দিতে কেউ অস্বীকার করলে গুলি করে কিংবা কারখানা জ্বালিয়ে দেয় দেশে থাকা তার সহযোগীরা। চাঁদাবাজিতে বারবার উঠে আসছে তার অনুসারী কারাবন্দি সাজ্জাদ হোসেন ওরফে ছোট সাজ্জাদ বাহিনীর নামও। ২০২৪ সালের আগস্টের পর থেকেই নগরীর চান্দগাঁও, বায়েজিদ বোস্তামী ও পাঁচলাইশ এবং জেলার হাটহাজারী, রাউজানসহ পাঁচ থানায় চাঁদাবাজির একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তারের অভিযোগ রয়েছে ছোট সাজ্জাদ বাহিনীর বিরুদ্ধে। গত এক বছরে নগরীর পাঁচলাইশ, চান্দগাঁও এবং তার আশপাশ এলাকায় ২৫টি স্থানে চাঁদার দাবিতে প্রকাশ্যে গুলি ছোড়ে বুইস্যা বাহিনী ও তার বাহিনীর সদস্যরা। বুইস্যা র‌্যাবের হাতে গ্রেপ্তার হলেও ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়েছে বুইস্যা বাহিনীর ৩০ অস্ত্রধারী। চট্টগ্রামের অন্ধকার জগতে ভয়ংকর রূপে আবির্ভাব হয়েছেন রাউজান উপজেলার রায়হান আলম। অভিযোগ রয়েছে চাঁদা দাবি কিংবা প্রতিপক্ষকে ধরাশায়ী করতে কথায় কথায় গুলি ছোড়েন দুর্ধর্ষ এ সন্ত্রাসী। বাকলিয়ার ডাবল মার্ডার, সরোয়ার বাবলাসহ ৯টি হত্যাকাণ্ড মিলে ১৫টির অধিক মামলা রয়েছে মোবারক হোসেন ইমনের বিরুদ্ধে। নগরীর চকবাজার, বাকলিয়া, চান্দগাঁওসহ বিভিন্ন এলাকায় অপরাধ আখড়ার নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ রয়েছে ইসমাইল হোসেন টেম্পুর বিরুদ্ধে।


১০ কোটি টাকা চাঁদার দাবিতে গত শনিবার সকালে পুলিশ পাহারার মধ্যেই সাবেক এমপি ও চট্টগ্রামের শীর্ষ ব্যবসায়ী মুজিবুর রহমানের নগরীর বাড়িকে লক্ষ্য করে গুলি চালিয়েছে সন্ত্রাসীরা। এর আগে গত ২ জানুয়ারি মুজিবের বাড়িকে লক্ষ্য করে গুলি করে সন্ত্রাসীরা। ১১ ফেব্রুয়ারি রাউজান উপজেলার কদলপুরে চাঁদার দাবিতে এক প্রবাসীর বাসাকে লক্ষ্য করে গুলি করেছে সন্ত্রাসীরা। ১৬ ডিসেম্বর বায়েজিদ থানা এলাকায় চাঁদাবাজির প্রতিবাদ করায় ছাত্রদল নেতা আহমেদ রেজার বাড়িকে লক্ষ্য করে গুলি করে সন্ত্রাসীরা। ২০ আগস্ট চট্টগ্রামের হাটহাজারী উপজেলায় চাঁদা না পেয়ে জাহাঙ্গীর আলম নামে এক আবাসন ব্যবসায়ীর বাড়িকে লক্ষ্য করে গুলি চালিয়েছে সন্ত্রাসীরা।