জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আর মাত্র ৩ দিন বাকি। ১২ ফেব্রুয়ারি এ দেশের জনগণ সিদ্ধান্ত নেবে যে তারা কাকে পাঁচ বছরের জন্য দেশ পরিচালনার দায়িত্ব দেবে। কোন দল বিজয়ী হবে তা নিয়ে আলাপ-আলোচনার কমতি নেই। সর্বত্রই চলছে ভোটের আলোচনা। জয়-পরাজয়ের হিসাবনিকাশ।


এবারের নির্বাচন অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি অনিশ্চয়তায় ভরা। এখন পর্যন্ত কেউই নিশ্চিত করে বলতে পারছে না কোন দল জিতবে ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে। এ নির্বাচনে কে জিতবে তা যেমন গুরুত্বপূর্ণ তেমনি বিরোধী দল কারা হবে সেটাও কম তাৎপর্যপূর্ণ নয়।


জনগণের আশা, এবার গণতন্ত্র তার আসল রূপে উদ্ভাসিত হবে। এ নির্বাচনের মাধ্যমে জাতীয় সংসদে একটি শক্তিশালী এবং কার্যকর বিরোধী দল পাবে বাংলাদেশ। যেন গণতন্ত্র, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা যায়। বিরোধী দল ছাড়া গণতন্ত্র হয় না। ক্ষমতাসীনরা হয় স্বেচ্ছাচারী এবং কর্তৃত্ববাদী। তারা যা ইচ্ছা করে। ফলে ভূলুণ্ঠিত হয় আইনের শাসন, মানবাধিকার ও ন্যায়বিচার। বিরোধী দল শক্তিশালী না হলে শাসকরা অবাধে দুর্নীতি করে, দেশে লুটতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়। সংবিধানে স্বীকৃত মৌলিক অধিকারগুলো হরণ করা যায় সহজেই। কণ্ঠরোধ করা যায় গণমাধ্যমের। রাষ্ট্রীয় সব প্রতিষ্ঠানকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করা যায়। প্রশাসন, পুলিশ ও সরকারের সব স্তরের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের দলীয়করণ করা হয়। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো দলীয়করণের মাধ্যমে ধ্বংস করা হয়। যার সবচেয়ে বড় উদাহরণ হলো বাংলাদেশ। গত ১৭ বছর বিরোধী দলের শূন্যতা কীভাবে একটি রাষ্ট্রে স্বৈরাচারী শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা হয় তা জনগণ প্রত্যক্ষ করেছে। কীভাবে জনগণের অধিকার কর্তৃত্ববাদী সরকার হরণ করে গণতন্ত্রকে হত্যা করা হয় তা আমরা সবাই দেখেছি। এর অন্যতম কারণ হলো, শক্তিশালী ও কার্যকর বিরোধী দলের অভাব। শাসক দল, অবাধে লুটপাট করার জন্য এবং যা খুশি তা করতেই ভোট জালিয়াতির মাধ্যমে সংসদকে বিরোধী দলশূন্য করেছিল, যেন কেউ তাদের অপকর্মের প্রতিবাদ না করে। গণতন্ত্রের অন্যতম প্রধান শর্ত হলো কার্যকর ও শক্তিশালী বিরোধী দল। একটি দেশের গণতন্ত্র তখনই বিকশিত হয় যখন সেখানে একটি কার্যকর বিরোধী দল ক্রিয়াশীল থাকে। সংসদীয় গণতন্ত্রে সরকারি দল এবং বিরোধী দল মিলিয়েই সরকার। বিরোধী দল ছাড়া সংসদ যেমন অকার্যকর ও অর্থহীন, তেমনই সরকারও স্বৈরাচারী ও কর্তৃত্ববাদী হয়ে ওঠে। বাংলাদেশে গণতন্ত্র বিকশিত না হওয়ার একটি বড় কারণ হলো ধারাবাহিকভাবে শক্তিশালী বিরোধী দলের অভাব। ১৯৯১, ’৯৬ এবং ২০০১ সালের সংসদেই শুধু সরব বিরোধী দলের উপস্থিতি ছিল। সে কারণে সংসদ ছিল অত্যন্ত শক্তিশালী ও কার্যকর। সরকারকে সবসময় সমালোচনার সম্মুখীন হতে হয়েছিল। শক্তিশালী বিরোধী দল থাকায় গণমাধ্যমও স্বাধীনভাবে মতপ্রকাশ করেছিল। এর ফলে সরকারের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বৃদ্ধি পায়। প্রতিটি ক্ষেত্রে সরকারকে সতর্ক থাকতে হয়েছে।


কিন্তু ২০০৮ সালের পর থেকে বাংলাদেশের রাজনীতি হয়ে পড়ে বিরোধী দলশূন্য। ২০০৮ সালের পরিকল্পিত নির্বাচনের মাধ্যমে গণতন্ত্র হত্যার যে নীলনকশা বাস্তবায়ন শুরু হয় তারই ধারাবাহিকতায় বিরোধী দলবিহীন, জবাবদিহিহীন, এক কর্তৃত্ববাদী শাসনব্যবস্থার পথে হাঁটতে শুরু করে বাংলাদেশ। ২০১৪ সালে বিনাভোটে জাতীয় সংসদ গঠিত হয়। সেখানে সরকার ও বিরোধী দল মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়। গৃহপালিত বিরোধী দল সরকারের বিরুদ্ধে কথা বলবে কী, সরকারের প্রশংসা করতে করতেই ক্লান্ত হয়ে পড়ে। ২০১৮ সালে রাতের ভোটের মাধ্যমে গঠিত সংসদে বিরোধী দলের অবস্থা আরও শোচনীয় হয়। বিরোধী দল না থাকায় সরকার হয়ে ওঠে চরম অসহিষ্ণু এবং অগণতান্ত্রিক। এসময় সরকার তাদের বিরুদ্ধে কোনো সমালোচনাই সহ্য করতে পারেনি। বাংলাদেশে প্রায় সব গণমাধ্যমের মালিকানাই ব্যবসায়ীদের। কাজেই সরকারের সমালোচনা বন্ধ করতে ক্ষমতাসীনরা বেসরকারি খাতের ওপরও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। এক নেতা, একদল, একমত- এরকম একটা চরম কর্তৃত্ববাদী শাসন কায়েম করা হয় দেশে। রাষ্ট্র ও সরকার একাকার হয়ে যায়। ফলে জনগণের অধিকার হরণ করা হয়। মানুষের মৌলিক অধিকারগুলো কেড়ে নেওয়া হয়। এই চরম অগণতান্ত্রিক সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন করে জনগণ। ’২৪-এর আন্দোলন তাই শুধু কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলন ছিল না, এটি ছিল জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলন। তাই, গণতান্ত্রিক দেশের নীতিনির্ধারণে সরকার মুখ্য ভূমিকা পালন করলেও বিরোধী দলের ভূমিকা কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। কোনো দেশে জনমুখী শক্তিশালী বিরোধী দল থাকলে সরকারের পক্ষে জনস্বার্থবিরোধী আইন ও নীতিমালা প্রণয়ন করা কঠিন হয়ে পড়ে। কারণ, সে ক্ষেত্রে বিরোধী দলের আন্দোলনে সরকারের জনপ্রিয়তা ক্ষুণ্ন হতে পারে ও পরবর্তী নির্বাচনে জয়ের সম্ভাবনা কমে যায়। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বিপ্লব বা গণ অভ্যুত্থানের পর শক্তিশালী ও কার্যকর বিরোধী দলের অনুপস্থিতির কারণে কর্তৃত্ববাদের পুনরুজ্জীবনের দৃষ্টান্ত রয়েছে। এ কারণেই জুলাই অভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশেও গণতান্ত্রিক রূপান্তরের জন্য শক্তিশালী জনমুখী বিরোধী দলের প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হচ্ছে। বিরোধী দল ছাড়া কিংবা দুর্বল বিরোধী দল থাকা অবস্থায় জাতীয় সরকারের মাধ্যমে দেশ পরিচালনা করলে যে দেশে আবারও একটি একচেটিয়া শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হবে না, তার কী নিশ্চয়তা? গণ অভ্যুত্থানের পরও যদি এ পরিস্থিতির উত্তরণ না হয়, তাহলে প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা কীভাবে প্রতিষ্ঠিত হবে! শুধু সাংবিধানিক সংস্কার দিয়ে স্বৈরতন্ত্রের পুনরুত্থান ঠেকানো যাবে না, সংস্কারকৃত সংবিধান মেনে চলার মতো রাজনৈতিক সংস্কৃতিও লাগবে। তাই, ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে যে দলই বিজয়ী হোক না কেন, দেশের মানুষ একটি শক্তিশালী বিরোধী দল দেখতে চায়। গণতন্ত্রের স্বার্থে, জবাবদিহির জন্য এটা অত্যন্ত জরুরি।