নারী কেলেঙ্কারির ঘটনা প্রকাশ্যে আসার পর বেরিয়ে আসছে জামায়াতের বহিষ্কৃত এমপির চাঞ্চল্যকর নানা তথ্য। গত ২২ জুলাই নৈতিক স্খলনের অভিযোগে জামায়াত থেকে বহিষ্কৃত হন কেন্দ্রীয় জামাতের মজলিসে শুরা এ সদস্য। সাতক্ষীরা-৪ আসনের এমপি গাজী নজরুল ইসলামের (৭৫) বিরুদ্ধে মুখ খুলেছেন ওই এমপির ব্যক্তিগত গাড়িচালক ও ভুক্তভোগী তরুণীর মামা ওবায়দুর রহমান। তার বয়ান অনুযায়ী, মেয়েকে জাতীয় সংসদ ভবনে চাকরি, বাবা মাসুম বিল্লাহকে ঠিকাদারি লাইসেন্স পাইয়ে দিয়ে কোটিপতি বানানোর লোভ দেখিয়ে ওই তরুণীর সঙ্গে অনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তোলেন এমপি। এ বিষয়ে বাংলাদেশ প্রতিদিনের সঙ্গে কথা বলেছেন, এমপির ড্রাইভার ওবায়দুর রহমান। এদিকে নারী কেলেঙ্কারির দায়ে জামায়াত থেকে বহিষ্কৃত এমপিকে সংসদ থেকে পদত্যাগের দাবিতে উত্তাল হয়ে উঠেছে তার নির্বাচনি এলাকা সাতক্ষীরার শ্যামনগর। পাঁচ দিন ধরে চলছে প্রতিবাদ সমাবেশ, বিক্ষোভ মিছিল ও কুশপুত্তলিকা দাহের ঘটনা।
ভাগনিকে নিয়ে এমপির অবৈধ কারবার ও প্রলোভন : বাংলাদেশ প্রতিদিনের এ প্রতিবেদকের সঙ্গে মুঠোফোনে আলাপকালে ওবায়দুর রহমান জানান, সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল সম্পর্কের সূত্রে তরুণী মরিয়মের বাবার খালু (দাদার ভায়রা)। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে থেকেই রাজধানীর পল্লবীতে ওই তরুণীর ভাড়া বাড়িতে এমপির নিয়মিত যাতায়াত ছিল। এমপি হোস্টেলে ফ্ল্যাট বরাদ্দ পাওয়ার পরও তিনি ঢাকায় এলে সেখানেই থাকতেন। তিনি আরও বলেন, রাত ৩টার দিকে মোবাইলে কথোপকথনের সূত্র ধরে এমপি ও ভাগনির এ অনৈতিক সম্পর্কের কথা ধরে ফেলেন ওবায়দুল্লাহ। খোঁজ নিতে গিয়ে দেখেন এমপি গোপনে কথা বলার জন্য ভাগনি মরিয়মকে একটি গোপন মোবাইল কিনে দেওয়া হয়, যার সিমটি শ্যামনগরের প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক দেলোয়ারের নামে নিবন্ধিত ছিল। সিমটি এমপি নিজেই ওই দেলোয়ারের মাধ্যমে নিয়েছিলেন। প্রতিবাদ করলে বিষয়টি ধামাচাপা দিতে প্রথমে টাকার বিনিময়ে ভাগনি মরিয়মকে মুতআ বিয়ে (কন্ট্রাক্ট ম্যারেজ) কথা বলেছিল। এবং তাকে এক্স-নোহা গাড়ি কিনে দেওয়ার লোভ দেখান এমপি গাজী নজরুল। এ ছাড়া তাকে ‘এপিএস-২’ হিসেবেও পরিচয় দেওয়া হতো।
নিঃস্ব পরিবার থেকে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মালিক : অনুসন্ধানে জানা গেছে, শ্যামনগর উপজেলার গাবুরা ইউনিয়নের চৌদ্দরশি গ্রামের বাসিন্দা মাসুম বিল্লাহর একসময় ‘নুন আনতে পান্তা ফুরাতো’। নদীতে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করতেন তিনি। ২০২১ সালের দিকে শ্যামনগরের ইসমাইলপুরে গিয়ে ইলেকট্রনিকসের ব্যবসা শুরু করেন। পরবর্তীতে খুলনায় ইট ভাঙার কাজও করেছেন। একপর্যায়ে তিনি ঢাকায় গিয়ে মিরপুর ১২ নম্বর ডি-ব্লকে ২৯ নম্বর লাইনে ভ্যানে করে শাকসবজি বিক্রি করতেন। পরবর্তীতে সবজির ব্যবসা ছেড়ে দিয়ে এমপি নজরুলের সহায়তায় লাখ লাখ টাকা নিয়ে সেখানেই একটি মুদির দোকান দেন ওই তরুণীর বাবা মাসুম বিল্লাহ। যার নাম ছিল মাসুম জেনারেল স্টোর। ?এমপি হওয়ার পর গাজী নজরুলের সহায়তায় একটি ঠিকাদারি লাইসেন্সও করিয়ে নেন তিনি। লাইসেন্সের নামকরণ করা হয় মাসুম এন্টারপ্রাইজ। এরপর মুদি দোকান মাসুম জেনারেল স্টোরের নাম পরিবর্তন করে নতুন নাম দেন ‘মাসুম এন্টারপ্রাইজ’। এরপর তরুণীর পরিবারকে আলিনগর রোজ গার্ডেনের দোতলায় দুই কক্ষের ফ্ল্যাট ভাড়া করে দেওয়া হয়, যেখানে এমপির অবাধ যাতায়াত ছিল।
গাজী নজরুলের বিষয়ে সংসদের চিঠি পায়নি ইসি : নিজস্ব প্রতিবেদক জানান, ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে জামায়াতের দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে সাতক্ষীরা-৪ (শ্যামনগর) আসন থেকে নির্বাচিত হন নজরুল ইসলাম।
এর মধ্যে গত ২০ জুলাই রাতে এক নারীর সঙ্গে তার অন্তরঙ্গ মুহূর্তের ভিডিও ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ২২ জুলাই তাকে বহিষ্কার করে জামায়াত। পরদিন দলটি নিজেদের সিদ্ধান্তের কথা জানিয়ে স্পিকার ও নির্বাচন কমিশনকে চিঠি দেয়।