ইয়েমেনের হুতিদের সঙ্গে সংঘাতের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের একটি গোপন গোয়েন্দা মূল্যায়নে সৌদি আরবের পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সম্ভাবনার উড়িয়ে দেয়নি। এই তথ্য রিয়াদের সঙ্গে ট্রাম্পের বেসামরিক পারমাণবিক সহযোগিতা চুক্তি নিয়ে মার্কিন কংগ্রেসে উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে।


‘দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট’-এর প্রতিবেদন জানিয়েছে, গত মাসে কংগ্রেসের কাছে পাঠানো গোপন নথিপত্রে এই মূল্যায়নের বিষয়টি উল্লেখ ছিল। গোয়েন্দা তথ্যের এই ফলাফল জনসমক্ষে প্রকাশ করা হয়নি এবং সিআইএ এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।


কংগ্রেস এমন একটি চুক্তি পর্যালোচনা করছে, যাতে মার্কিন কোম্পানিগুলো সৌদি আরবে কয়েক হাজার কোটি ডলার মূল্যের পারমাণবিক শক্তি প্রকল্প শুরু করতে পারবে। এমন সময়ে এই নথিপত্রগুলো উপস্থাপন করা হলো। ট্রাম্প প্রশাসনের দাবি, এই অংশীদারিত্ব রিয়াদের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারের পাশািপাশি মার্কিন কোম্পানিগুলোর জন্য সুযোগ সৃষ্টি করবে এবং পারমাণবিক প্রযুক্তির জন্য সৌদি আরবকে রাশিয়া বা চীনের দ্বারস্থ হওয়া থেকে বিরত রাখা সম্ভব হবে।


যদিও পররাষ্ট্র দপ্তর এই চুক্তির পক্ষে অবস্থান নিয়ে বলেছে, ওয়াশিংটন সৌদি আরবের কোনো পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচিকে সমর্থন করে না এবং ভবিষ্যতেও করবে না। দপ্তরটি আরও জানায়, এই চুক্তিতে পারমাণবিক শক্তি বিষয়ক সহযোগিতার সম্প্রসারণের পাশাপাশি পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধের ক্ষেত্রে কূটনৈতিকভাবে অর্জনযোগ্য সর্বোচ্চ মানদণ্ডগুলো অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।


গোয়েন্দা মূল্যায়ন সংক্রান্ত ‘দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট’-এর প্রশ্নের কোনো জবাব দেয়নি সৌদি সরকার। তারা পত্রিকাটিকে জ্বালানিমন্ত্রী আবদুল আজিজ বিন সালমানের আগের একটি বিবৃতির দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করতে বলে। ওই বিবৃতিতে তিনি বলেছিলেন, দেশটির পারমাণবিক কর্মসূচি হবে ‘শান্তিপূর্ণ’ এবং তা ‘সর্বোচ্চ দায়িত্বশীলতা ও স্বচ্ছতার’ সঙ্গে বাস্তবায়ন করা হবে।


চুক্তি অনুযায়ী প্রাথমিকভাবে সৌদি আরবের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের মাত্রা ৫ শতাংশের নিচে সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছে। তবে ‘দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট’ ও ‘দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, পরবর্তী কোনো সমীক্ষা ও আলাদা লিখিত চুক্তির মাধ্যমে ভবিষ্যতে এই সমৃদ্ধকরণের মাত্রা ২০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর অনুমতি দেওয়া হতে পারে। ২০ শতাংশ পর্যন্ত সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির মানের (ওয়েপনস গ্রেড) চেয়ে অনেক কম।


তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, সমৃদ্ধকরণের মাত্রা এই পর্যায়ে পৌঁছালে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির উপযোগী উপাদান উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় সময় ও কারিগরি কাজের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। আইনপ্রণেতারা পরিদর্শন বা তদারকি ব্যবস্থা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। এই চুক্তির আওতায় সৌদি আরবের জন্য ‘ইন্টারন্যাশনাল অ্যাটমিক এনার্জি এজেন্সি’ (আইএইএ)-র ‘অ্যাডিশনাল প্রোটোকল’ বা অতিরিক্ত প্রোটোকল মেনে চলা বাধ্যতামূলক করা হয়নি। অথচ এই প্রোটোকলটি কার্যকর থাকলে পরিদর্শকরা পারমাণবিক জ্বালানি চক্রের স্থাপনা, গবেষণা কেন্দ্র এবং সন্দেহভাজন অঘোষিত স্থানগুলোতে আরও অবাধে প্রবেশের সুযোগ পেতেন।


এডওয়ার্ড মার্কি ও জেফ মার্কলির নেতৃত্বে একদল ডেমোক্র্যাট সিনেটর শুক্রবার পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওকে চিঠি লিখে এই চুক্তি থেকে সরে আসার জন্য প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। সিনেটররা বলেছেন, এই চুক্তির মাধ্যমে ট্রাম্প প্রশাসন প্রচলিত রীতিনীতি থেকে সরে আসছে, শিথিল বিধিনিষেধ গ্রহণ করছে এবং সৌদি আরবের দাবির কাছে নতি স্বীকার করছে।


তাদের যুক্তি হলো, আইনপ্রণেতাদের ভাষায় পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধের ‘গোল্ড স্ট্যান্ডার্ড’ বা সর্বোচ্চ মানদণ্ড রয়েছে, রিয়াদের তা মেনে নেওয়া উচিত। এই মানদণ্ড অনুযায়ী দেশের অভ্যন্তরে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ ও প্লুটোনিয়াম পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ নিষিদ্ধ থাকবে। একইসাথে আইএইএ-র ‘অ্যাডিশনাল প্রোটোকল’ বাস্তবায়ন করা বাধ্যতামূলক হবে। চিঠিতে সিনেটর টিম কেইন, ক্রিস ভ্যান হোলেন, পিটার ওয়েলচ এবং রন ওয়াইডেনও স্বাক্ষর করেছেন।


বর্তমানে কংগ্রেস ৯০ দিনের একটি পর্যালোচনা প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। আইনপ্রণেতারা চুক্তিটি বাতিলের লক্ষ্যে কোনো আইন বা প্রস্তাব উত্থাপন করতে পারেন। তবে প্রেসিডেন্টের ভেটো (নিষেধাজ্ঞা) অগ্রাহ্য করে চুক্তিটি কার্যকর হওয়া আটকাতে হলে এর সমর্থকদের দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার প্রয়োজন হবে।


চুক্তির সমর্থকরা বলছেন, রাশিয়ার বা চীনের কোম্পানিকে দিয়ে সৌদি আরবের পারমাণবিক কর্মসূচি গড়ে তোলার সুযোগ দেওয়ার চেয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অংশগ্রহণ থাকলে ওয়াশিংটন দেশটির পারমাণবিক কার্যক্রমের ওপর অধিকতর প্রভাব বিস্তার করতে পারবে।


‘দ্য পোস্ট’-এর তথ্যমতে, ট্রাম্প এই পারমাণবিক চুক্তির শর্ত হিসেবে ইসরায়েলের সঙ্গে সৌদি আরবের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার বিষয়টিও জুড়ে দিয়েছেন। অন্যদিকে রিয়াদ জানিয়েছে, ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের পথে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি ছাড়া তারা ইসরায়েলের সঙ্গে কোনো কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করবে না। সৌদি আরব ‘পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তি’ (এনপিটি)-র অন্তর্ভুক্ত একটি পক্ষ এবং তারা আইএইএ-র নিরাপত্তা তদারকি ব্যবস্থার আওতাভুক্ত।


যুক্তরাষ্ট্রের ‘পারমাণবিক শক্তি আইন’-এর ১২৩ নম্বর ধারার অধীনে সম্পাদিত বেসামরিক পারমাণবিক সহযোগিতা চুক্তিগুলোর মাধ্যমেই নির্ধারিত হয়। কোন শর্তসাপেক্ষে যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক প্রযুক্তি ও উপকরণ অন্য কোনো দেশে হস্তান্তর করা যাবে।