বৈশ্বিক বিনিয়োগ কাঠামোর সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হওয়ার পথে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছে বাংলাদেশ। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার ১৪তম মন্ত্রী পর্যায়ের সম্মেলনে ‘ইনভেস্টমেন্ট ফ্যাসিলিটেশন ফর ডেভেলপমেন্ট আইএফডি) চুক্তিতে যোগ দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে ঢাকা। ক্যামেরুনের রাজধানী ইউয়ান্দিমে অনুষ্ঠিত এই সম্মেলনের তৃতীয় দিনে বাংলাদেশের এ সিদ্ধান্তের ফলে চুক্তিটির সহ-স্পন্সর দেশের সংখ্যা বেড়ে ১২৯টিতে দাঁড়িয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পদক্ষেপ দেশের বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ উন্নয়নে সহায়ক হতে পারে এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। আইএফডি একটি (দুইয়ের অধিক কিন্তু বহু পাক্ষিক) চুক্তি, যেখানে সব সদস্য নয়, বরং আগ্রহী দেশগুলো অংশগ্রহণ করে। এর লক্ষ্য হচ্ছে বিনিয়োগ প্রক্রিয়া সহজ করা, নীতিগত স্বচ্ছতা বাড়ানো এবং প্রশাসনিক জটিলতা কমানো। চুক্তিটি ‘মোস্ট-ফেভার্ড-গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপনেশন (এমএফএন)’ নীতির ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে, অর্থাৎ এর সুবিধা সব সদস্য দেশের জন্য উন্মুক্ত থাকলেও বাধ্যবাধকতা থাকবে শুধু অংশগ্রহণকারী দেশগুলোর ওপর। এর আগে গত ১৭ মার্চ সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে আইএফডি চুক্তিতে যোগদানের প্রস্তাব অনুমোদন দেওয়া হয়। বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
তবে চুক্তিটি নিয়ে বৈশ্বিক পর্যায়ে মতপার্থক্য রয়েছে। ভারত আইএফডি চুক্তিকে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার আইনি কাঠামোয় অন্তর্ভুক্ত করার বিরোধিতা করেছে। দেশটির বাণিজ্যমন্ত্রী পিউশ গোয়েল মনে করেন, এটি সংস্থার মৌলিক নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে। অন্যদিকে চীনসহ বেশ কয়েকটি দেশ চুক্তিটিকে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার কাঠামোর আওতায় আনতে জোরালো অবস্থান নিয়েছে। এর আগে তুরস্ক তাদের আপত্তি প্রত্যাহার করে এতে যোগ দেয়।
বিশ্লেষকদের মতে, এই চুক্তিতে যুক্ত হওয়ার মাধ্যমে বাংলাদেশ বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে নতুন সুযোগ পেতে পারে। বিশেষ করে এলডিসি উত্তরণ-পরবর্তী সময়ে বিনিয়োগ প্রবাহ ধরে রাখতে এটি কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। তবে একই সঙ্গে প্রশাসনিক সংস্কার, নীতিগত স্বচ্ছতা এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড মেনে চলার চাপও বাড়বে। বাংলাদেশের সাবেক বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার বাণিজ্য এক আলোচক বলেন, ‘(দুইয়ের অধিক কিন্তু বহু পাক্ষিক) চুক্তিগুলোর গুরুত্ব বাড়ছে। এ ধরনের উদ্যোগে অংশগ্রহণ বাংলাদেশের জন্য ইতিবাচক।’ তিনি আরও বলেন, ‘সুযোগের পাশাপাশি দায়বদ্ধতাও থাকবে। তাই সুবিধা কাজে লাগাতে হলে নীতিগত প্রস্তুতি জরুরি।’
বর্তমানে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার অধীনে ১৮টি (দুইয়ের অধিক কিন্তু বহু পাক্ষিক) চুক্তি রয়েছে বা আলোচনায় আছে, যার মধ্যে ১৬টি সক্রিয়। তবে আইএফডি চুক্তিকে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার পূর্ণ আইনি কাঠামোয় অন্তর্ভুক্ত করা না গেলে এর বাস্তব সুফল পেতে সময় লাগতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। সব মিলিয়ে, বৈশ্বিক বিনিয়োগ ব্যবস্থার সঙ্গে সংযুক্ত হওয়ার এই পদক্ষেপ বাংলাদেশের জন্য একটি কৌশলগত অগ্রগতি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে, যা ভবিষ্যতে অর্থনীতির গতিপথে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।