ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধে সংকটের মুখে দেশের আমদানি-রপ্তানি খাত। হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় মধ্যপ্রাচ্যে সবজি রপ্তানি প্রায় বন্ধ। ইউরোপে পোশাক রপ্তানিতে খরচ বেড়েছে। অন্যান্য দেশের সঙ্গেও আমদানি-রপ্তানি বিঘ্নিত হচ্ছে। জরুরি রপ্তানিও প্রায় অচল। উড়োজাহাজে তৈরি পোশাকের রপ্তানি আদেশ প্রক্রিয়ায় স্যাম্পল আনা-নেওয়া ও ব্র্যান্ড-ক্রেতাদের সঙ্গে জরুরি কাগজপত্র গ্রহণ ও পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়েছে। জ্বালানিসংকটে কারখানা পর্যায়েও উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। ডিজেলের অভাবে লোডশেডিংয়ের সময় কারখানায় জেনারেটর চালু রাখা যাচ্ছে না। আন্তর্জাতিক শিপিং কোম্পানিগুলো পরিবহন এবং বিশ্বের বিভিন্ন বন্দরে জাহাজে থাকা মধ্যপ্রাচ্যগামী কনটেইনারের ওপর সারচার্জ আরোপ করেছে। এতে বাড়ছে আমদানি-রপ্তানি ব্যয়। এ ছাড়া হরমুজ প্রণালি ঘিরে নিরাপত্তাঝুঁকি বাড়ায় উপসাগরীয় অঞ্চলে পণ্য পরিবহনের বুকিং সাময়িকভাবে বন্ধ রেখেছে অনেক শিপিং লাইন। সব মিলিয়ের সংকট কমছে না আমদানি-রপ্তানিতে।


ব্যবসায়ীরা জানান, হরমুজ প্রণালি দিয়ে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১ কোটি ৭০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল পরিবাহিত হয়, যা বৈশ্বিক সামুদ্রিক তেল বাণিজ্যের প্রায় ২০ শতাংশ। উপসাগরীয় দেশগুলোর জ্বালানি রপ্তানি এই পথনির্ভর। এই পথ বন্ধ থাকায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম দ্রুত বাড়ছে। এই রুটে দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় কোনো বিঘ্ন দেখা দিলে বাংলাদেশের আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রমে ফ্রেইট চার্জ, বিমা প্রিমিয়াম এবং পণ্য সরবরাহের সময়সীমা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে। উৎপাদন খরচ অতিরিক্ত বেড়ে গেলে অনেক ছোট ও মাঝারি শিল্পকারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। যা কর্মসংস্থানের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। বর্তমানে ডিজেলসংকটে জেনারেটর চালাতে না পারায় গার্মেন্টস কারখানাগুলোতেও উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। পাশাপাশি অফডকগুলো থেকে বন্দরে পণ্যবোঝাই গাড়ি পাঠানোর হার কমে গেছে। ফলে লাইটারেজ জাহাজগুলোও পণ্য গন্তব্যে পৌঁছাতে পারছে না। ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) জানায়, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের মূল্য দীর্ঘ মেয়াদে উচ্চ অবস্থানে থাকলে তা বাংলাদেশের বহিঃখাতের ওপর বেশ চাপ সৃষ্টি করতে পারে। বৈশ্বিক বাজারে তেলের দাম প্রতি ব্যারেল ১০ মার্কিন ডলার বৃদ্ধি পেলে বাংলাদেশের মাসিক আমদানি ব্যয় প্রায় ৭০ থেকে ৮০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার পর্যন্ত বাড়তে পারে। ফলে বৈদেশিক মুদ্রার চাহিদা বাড়বে এবং বাণিজ্য ঘাটতি সম্প্রসারিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। এ ছাড়া জ্বালানি ব্যয় বৃদ্ধির পাশাপাশি হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে চলমান সংঘাত আন্তর্জাতিক নৌপরিবহন ব্যবস্থাতেও প্রভাব ফেলছে। ডিসিসিআই মনে করে, সংঘাতের মাত্রা আরও বৃদ্ধি পেলে আমদানি ও রপ্তানি উভয় ক্ষেত্রেই ব্যয় আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বাংলাদেশের রপ্তানিমুখী শিল্প খাত, বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাত, এই পরিস্থিতিতে উচ্চ লজিস্টিক ব্যয়, সাপ্লাই চেইন বিঘ্ন এবং সমুদ্রপথে পরিবহনে বাড়তি ঝুঁকির সম্মুখীন। বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, আমদানি-রপ্তানি তো কিছুটা বিঘ্নিত হচ্ছেই। হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ যাতায়াত বন্ধ থাকার কারণে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে পোশাক রপ্তানি পুরোপুরি বন্ধ। হরমুজ প্রণালির পরিবর্তে আটলান্টিক মহাসাগর হয়ে জাহাজ যাতায়াত করছে। এতে অতিরিক্ত ১০ দিনের মতো সময় লাগছে। তবে মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানিসংকটে এখন রপ্তানি খাতের সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে উৎপাদন চালিয়ে নেওয়া। কারণ জ্বালানির অভাবে বিদ্যুতে লোডশেডিং অনেক বেড়েছে। কোনো কোনো এলাকায় ৫ ঘণ্টার মতো লোডশেডিং থাকে। গড়ে ৩ ঘণ্টা লোডশেডিং হয় এখন। বাধ্য হয়ে জেনারেটর চালাতে হয়। জেনারেটর চলে ডিজেলে। অথচ ফিলিং স্টেশন থেকে ডিজেল পাওয়া যাচ্ছে না। এ কারণে লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী রপ্তানি আদেশের পণ্য উৎপাদন করা সম্ভব হচ্ছে না।