মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেলের বাজারে চলছে চরম অস্থিরতা। এর প্রভাবে দেশের জ্বালানি তেলের বাজারে তৈরি হয়েছে ‘কৃত্রিম সংকট’। সরকার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রেশনিং পদ্ধতিতে তেল সরবরাহ শুরু করলেও অনেক ক্রেতাই প্রয়োজনের বেশি পরিমাণ তেল কিনে মজুত করে রাখছেন বলে পেট্রোল পাম্পের মালিকরা অভিযোগ করছেন। তাঁরা বলছেন, ডিপো থেকে তেল কম দেওয়ায় তাঁরা যাত্রীদের তেল দিতে পারছেন না। আবার গ্যাসসংকটের কারণে দেশে উৎপাদিত পেট্রোল ও অকটেনও কম পাওয়া যাচ্ছে। এ অবস্থায় তেলের কৃত্রিম সংকট রোধে সারা দেশে মোবাইল কোর্ট পরিচালনার নির্দেশ দিয়েছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। একই সঙ্গে তেলের সরবরাহ নিরবচ্ছিন্ন রাখতে কেন্দ্রীয় ও আঞ্চলিক মনিটরিং এবং কন্ট্রোল সেল গঠন করেছে সরকার।


রাজধানীর পাম্প স্টেশনগুলোতে গতকালও তেল কিনতে মানুষের দীর্ঘ সারি দেখা যায়। শুক্র-শনিবার সরকারি ছুটির কারণে ডিপো থেকে তেলবাহী গাড়ি চলাচল বন্ধ ছিল। এরপর রবিবার থেকে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে আসার কথা কিন্তু গতকালও ঢাকার অনেক পাম্পে তেল সরবরাহ স্বাভাবিক হয়নি। অনেক পাম্পে তেলও পাওয়া যায়নি। বিশেষ করে অকটেন বিক্রি বন্ধ ছিল অনেক জায়গায়। পাম্প কর্তৃপক্ষ বলছেন, চাহিদার তুলনায় পাম্পে যে তেল আসছে তা পরিমাণে অল্প। এ তেল দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে। মিরপুর সুমাত্রা ফিলিং স্টেশনের লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা পাঠাও মোটরসাইকেল চালক আবু রায়হান বলেন, ‘মাত্র ২ লিটার তেল নেওয়ার জন্য ঘণ্টার ওপর লাইনে দাঁড়িয়ে আছি। আর তেলের পরিমাণ এত কম যে বেশি যাত্রী বহন করতে পারব না। আয় কমে যাওয়ায় সংসার কীভাবে চালাব তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছি।’


সংকটের কারণ : বাংলাদেশ পেট্রোল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের যুগ্ম আহ্বায়ক মিজানুর রহমান রতন বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘ডিপো থেকে আমাদের মোট চাহিদার ৫০ শতাংশ তেল কম দেওয়া হচ্ছে। এ ছাড়া সরকারের তরফে যানবাহনে তেল নেওয়ার মাত্রা নির্দিষ্ট করে দেওয়ায় ক্রেতাদের মধ্যেও আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। এতে মানুষ প্রয়োজনের চেয়েও বেশি পরিমাণে তেল সংগ্রহ করতে চাচ্ছে। আবার পেট্রোল ও অকটেন দেশেই উৎপাদিত হয়। তার পরও এগুলোতে সংকট দেখতে পাচ্ছি। এটি তো হওয়ার কথা না।’ পাম্প মালিকরা বাংলাদেশ প্রতিদিনকে জানান, দেশে তেলবাহী জাহাজ প্রবেশ করলেও তা কাস্টমস ও ডিসচার্জ পেরিয়ে পাম্প পর্যন্ত পৌঁছাতে ৭ থেকে ১০ দিন লেগে যায়। সাধারণ মানুষ এটি বুঝতে পারছেন না। তারা ভীত হয়ে পড়ছেন। পেট্রোল ও অকটেন সংকটের কারণ হচ্ছে দেশে গ্যাসের উৎপাদন কম।


কৃত্রিম সংকট রোধে মোবাইল কোর্ট পরিচালনার নির্দেশ : জ্বালানি তেলের সরবরাহ নিশ্চিত করতে এবং বাজারে কৃত্রিম সংকট প্রতিরোধে সারা দেশে ভ্রাম্যমাণ আদালত (মোবাইল কোর্ট) পরিচালনার নির্দেশ দিয়েছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। গতকাল মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের জেলা ম্যাজিস্ট্রেট পরিবীক্ষণ শাখা থেকে দেশের সব জেলা প্রশাসককে (ডিসি) এ নির্দেশনা পাঠানো হয়েছে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সিনিয়র সহকারী সচিব নাহিদা আক্তার তানিয়ার সই করা পত্রে জানানো হয়, জ্বালানি তেলের বাজারে শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং কোনো ধরনের কৃত্রিম সংকট যেন তৈরি না হয়, তা নিশ্চিত করতেই এ বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। চিঠিতে মূলত তেলের অবৈধ মজুত গড়ে তোলা বন্ধ করা, নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে অতিরিক্ত দামে তেল বিক্রি প্রতিহত করা এবং খোলা বাজারে তেল বিক্রি ও পাচার রোধে কড়া নজরদারির মাধ্যমে নিয়মিত মোবাইল কোর্ট বা ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিতে বলা হয়েছে।


কেন্দ্রীয় ও আঞ্চলিক মনিটরিং এবং কন্ট্রোল সেল গঠন : জ্বালানি তেলের সরবরাহ নিরবচ্ছিন্ন রাখতে কেন্দ্রীয় ও আঞ্চলিক মনিটরিং এবং কন্ট্রোল সেল গঠন করেছে জ্বালানি বিভাগ, বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) ও কোম্পানিসমূহ। গতকাল বিপিসির পাঠানো বিজ্ঞপ্তিতে এমনটি জানানো হয়। এতে বলা হয়, আঞ্চলিক কন্ট্রোল সেলগুলো প্রতিদিন নিয়মিতভাবে সেই এলাকার ডিপোসমূহের তেলের মজুত, বিক্রি ও ডিজেলের খুচরা মূল্য পরিস্থিতি কেন্দ্রীয় কন্ট্রোল সেলে পাঠাবে। কেন্দ্রীয় কন্ট্রোল সেলের সমন্বিত মজুত প্রতিবেদন নিয়মিতভাবে জ্বালানি বিভাগসহ সংশ্লিষ্ট সব মন্ত্রণালয় ও বিভাগে পাঠানো হবে। চলমান পরিস্থিতিতে কৃষি সেচ চলা অবস্থায় ডিলার ও এজেন্টের কাছে ডিপো থেকে সরবরাহ করা তেলের পরিমাণ ও বিক্রির তথ্য আঞ্চলিক কন্ট্রোল সেল থেকে নিয়মিতভাবে সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসককে মেল বা ফ্যাক্সে পাঠানো হবে।


তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মজুত দিয়ে চলবে ১০ এপ্রিল পর্যন্ত : দেশে তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর মজুত জ্বালানি দিয়ে সর্বোচ্চ আগামী ১০ এপ্রিল পর্যন্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব বলে জানিয়েছে বেসরকারি বিদ্যুৎ কেন্দ্র মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ ইনডিপেনডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসারস অ্যাসোসিয়েশন (বিআইপিপিএ)। সংগঠনটি বলেছে, বর্তমানে বিদ্যুৎ উৎপাদনে তেলভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর বড় ভূমিকা রয়েছে। এসব কেন্দ্র বন্ধ হয়ে গেলে বিদ্যুৎ সরবরাহ পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়বে। গতকাল রাজধানীর একটি হোটেলে সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য তুলে ধরেন সংগঠনটির সভাপতি ডেভিড হাসনাত ও সাবেক সভাপতি ইমরান করিম। সংবাদ সম্মেলনে বিদ্যুৎ খাতের বর্তমান পরিস্থিতি, জ্বালানি সরবরাহ এবং বিদ্যুৎ কেন্দ্র পরিচালনাসংক্রান্ত বিভিন্ন তথ্য ও পরিসংখ্যানও তুলে ধরা হয়। সংবাদ সম্মেলনে ইমরান করিম বলেন, ‘প্রায় সাত দিন আগে পর্যন্ত বেসরকারি খাতের বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোতে ১ লাখ ৩০ হাজার টন জ্বালানি তেল মজুত ছিল। এর মধ্যে দুই থেকে তিনটি প্রতিষ্ঠানের কাছেই প্রায় ৫৫ হাজার টন তেল রয়েছে। বাকি তেল বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছে ছড়িয়ে রয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘দেশে তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে থাকায় জ্বালানি মজুতও সমানভাবে বিতরণ নেই। ফলে কোথাও হয়তো এপ্রিলের মাঝামাঝি পর্যন্ত তেল থাকবে, আবার কোথাও এপ্রিলের শুরুতেই বিদ্যুৎ উৎপাদনে সমস্যা দেখা দিতে পারে।’ ইমরান করিম জানান, গড়ে হিসাব করলে বর্তমানে যে পরিমাণ তেল মজুত রয়েছে, তা দিয়ে তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো ৭ থেকে ১০ এপ্রিল পর্যন্ত উৎপাদন চালাতে পারবে। তবে মজুতের অসম বণ্টনের কারণে কিছু এলাকায় এর আগেই সংকট দেখা দেওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তিনি বলেন, বর্তমানে দেশে মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রায় ৪৫ থেকে ৪৯ শতাংশই বেসরকারি খাতের কেন্দ্র থেকে আসে। এসব কেন্দ্র চালু রাখতে নিয়মিত জ্বালানি সরবরাহ ও সময়মতো বিল পরিশোধ নিশ্চিত করা জরুরি। বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর বিল পরিশোধে বিলম্বের বিষয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি।


প্রধান ডিপোগুলোতে সেনা মোতায়েনের নির্দেশ : জ্বালানি তেল সরবরাহ ঘিরে তৈরি হওয়া পরিস্থিতিতে দেশের প্রধান তেল ডিপোগুলোতে সেনাবাহিনী মোতায়েনের নির্দেশ দিয়েছে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়। মূলত নিরাপত্তা জোরদার করতে সেনাবাহিনী মোতায়েনের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে মন্ত্রণালয়টি। গতকাল বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের এক বার্তায় এ তথ্য জানানো হয়। বার্তায় বলা হয়, সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে দেশের বিভিন্ন ডিপো থেকে ডিলারদের হঠাৎ চাহিদা বেড়ে গেছে। সে অনুযায়ী জ্বালানি তেল সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না। এতে জ্বালানি তেল বিপণন কোম্পানিগুলোর কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ডিপোতে অনাকাক্সিক্ষত পরিস্থিতি সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এসব জ্বালানি ডিপো কেপিআইভুক্ত গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা হওয়ায় জরুরি ভিত্তিতে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এ কারণে স্থাপনাগুলোর সার্বিক নিরাপত্তা জোরদার করতে সেনাবাহিনী মোতায়েনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।