দেশের পণ্য রপ্তানি এপ্রিল মাসে জোরালোভাবে ঘুরে দাঁড়িয়েছে, টানা আট মাসের খরা কাটিয়ে উঠেছে। কারণ যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যসহ প্রধান বাজারগুলোতে চাহিদা পুনরুদ্ধার হয়েছে।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো গত রবিবার প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, এপ্রিল মাসে রপ্তানি আয় বছরের ভিত্তিতে প্রায় ৩৩ শতাংশ বেড়ে ৪ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। তবে মাসভিত্তিক এই শক্তিশালী প্রবৃদ্ধি সত্ত্বেও ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে মোট রপ্তানি আয় এখনো গত বছরের তুলনায় কিছুটা পিছিয়ে রয়েছে। চলতি অর্থবছরের জুলাই-এপ্রিল সময়ে রপ্তানি আয় দাঁড়িয়েছে ৩৯৩৯ কোটি ডলার, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ২ শতাংশ কম। যদিও রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো বলছে, রপ্তানি গন্তব্যগুলোতে ইতিবাচক লক্ষণ দেখা যাচ্ছে, রপ্তানিকারকরা সতর্ক সুরে জানিয়েছেন, এপ্রিলের আয়ের বড় অংশই মূলত জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে পাঠানো চালানের অর্থপ্রাপ্তি।
তাদের মতে, ওই সময়ে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরু হয়নি এবং দেশের ভিতরে জ্বালানি সংকটও উৎপাদনে বড় প্রভাব ফেলেনি।
জাতীয় রপ্তানির ৮০ শতাংশেরও বেশি অবদান রাখা তৈরি পোশাক খাত এপ্রিলের এই ঘুরে দাঁড়ানোর প্রধান চালিকাশক্তি। এ খাতে রপ্তানি ৩১ দশমিক ২১ শতাংশ বেড়ে ৩১৪ কোটি ডলারে দাঁড়িয়েছে। এর মধ্যে নিট পোশাক থেকে এসেছে ১৭০ কোটি ডলার, যা ৩০ দশমিক ০২ শতাংশ বেশি। আর ওভেন পোশাক রপ্তানি হয়েছে ১৪৩ কোটি ডলার, যা ৩২ দশমিক ৬৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি।
তবে জুলাই-এপ্রিল সময়ে পোশাক খাতের মোট রপ্তানি ২.৮২ শতাংশ কমে ৩১৭১ কোটি ডলারে নেমেছে। নিটওয়্যার রপ্তানি ৩.৬৮ শতাংশ কমে ১৬৮১ কোটি ডলার এবং ওভেন পোশাক ১ দশমিক ৮৩ শতাংশ কমে ১৪৯০ কোটি ডলারে দাঁড়িয়েছে।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো জানিয়েছে, এপ্রিল মাসে প্রধান বাজারগুলোতে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি ৪৩ দশমিক ০১ শতাংশ এবং যুক্তরাজ্যে ২৩ দশমিক ৪৬ শতাংশ বেড়েছে। এ ছাড়া বাংলাদেশের শীর্ষ ২০টি রপ্তানি গন্তব্যেই ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি লক্ষ্য করা গেছে।
বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতির পরিচালক ফয়সাল সামাদ বলেন, ইরান যুদ্ধ অপ্রত্যাশিত ছিল এবং জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারির চালানগুলো মূলত গত বছরের সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড ও খুচরা বিক্রেতারা অর্ডার দিয়েছিল।
তিনি বলেন, ‘ওই কাজের অর্থ এপ্রিল মাসে এসেছে। তবে এখন ক্রেতাদের সামগ্রিক সাড়া ইতিবাচক, কারণ ফেব্রুয়ারিতে সাধারণ নির্বাচন শেষ হয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে পারস্পরিক শুল্কও ১০ শতাংশে নামানো হয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, টানা আট মাস পতনের পর এপ্রিলের প্রবৃদ্ধি ইতিবাচক হলেও জুন-জুলাই মাসে পরিস্থিতি কী হয় তা পর্যবেক্ষণ করতে হবে। বিজিএমইএর সিনিয়র সহ-সভাপতি ইনামুল হক খান বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী আমদানি বাড়ছিল, তাই রপ্তানি বাড়ার বিষয়টি প্রত্যাশিত ছিল। তিনি বলেন, ‘আমদানি বাড়লে সাধারণত রপ্তানিও বাড়ে। সামগ্রিকভাবে কাজের অর্ডারের অবস্থা খারাপ ছিল না, তবে ক্রেতারা সতর্ক ছিল।’
বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, এপ্রিলের রপ্তানি পরিসংখ্যান বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে কিছুটা ভিন্ন হতে পারে, কারণ অনেক রপ্তানিকারক বলছেন, ইরান যুদ্ধ ও বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলের অস্থিরতার কারণে বর্তমানে রপ্তানি পরিস্থিতি ভালো নয়।
পোশাক খাত ছাড়াও জুলাই-এপ্রিল সময়ে কয়েকটি খাতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে।
চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রপ্তানি ৫.৯৫ শতাংশ বেড়ে ৯৮ কোটি ৮০ লাখ ডলার, পাট ও পাটজাত পণ্য ২.৫২ শতাংশ বেড়ে ৭০ কোটি ২৭ লাখ ডলার এবং প্রকৌশল পণ্য ২০.১৪ শতাংশ বেড়ে ৫৩ কোটি ৭৫০ লাখ ডলারে দাঁড়িয়েছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে হোম টেক্সটাইল রপ্তানি ৩.৪৬ শতাংশ বেড়ে ৭৬ কোটি ৬০ লাখ ডলার হয়েছে। এ ছাড়া হিমায়িত ও জীবিত মাছ, রাসায়নিক পণ্য, প্লাস্টিক সামগ্রী, কার্পেট এবং ওষুধ খাতেও ভালো প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে।
অন্যদিকে তুলা ও তুলাজাত পণ্য রপ্তানি ১২.৭৬ শতাংশ কমে ৪২ কোটি ৭৮ লাখ ডলারে নেমেছে। চামড়াবিহীন জুতা রপ্তানি ১.৯৮ শতাংশ কমে ৪৩ কোটি ৭৩ লাখ ডলার এবং কৃষিপণ্য রপ্তানি ৪.৬৯ শতাংশ কমে ৮১৮.৬৬ মিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে বলে রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো তথ্য জানিয়েছে।