বাংলাদেশে আমের স্বর্গরাজ্য রাজশাহী অঞ্চল। প্রতি বছর দেশের চাহিদার বড় অংশই জোগান দেয় এ অঞ্চলের আম। এবারও আমসহ বিভিন্ন ফল রেকর্ড পরিমাণ উৎপাদন হয়েছে। তবে মৌসুমের শেষের দিকে এসে সেই প্রশান্তি রূপ নিয়েছে হতাশায়। বিপুল পরিমাণ ফল একসঙ্গে বাজারে আসায় দাম কমে গেছে। আবার নষ্টও হয়েছে। যদি এ ফলগুলো সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ করা যেত তাহলে ভোক্তা যেমন দীর্ঘ সময় ফল পেত আবার ব্যবসায়ীরা লাভবান হতেন। কৃষকদেরও দাবি, আধুনিক হিমাগার ও প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প গড়ে উঠলে তারা ন্যায্যমূল্য পাওয়ার পাশাপাশি দেশের অর্থনীতিতেও বড় অবদান রাখতে পারবেন।


রাজশাহীর বাঘা উপজেলার আমচাষি জয়নাল আবেদীন ৭ একর জমিতে আম চাষ করেছেন। মৌসুমজুড়ে আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় ফলনও হয়েছে ভালো। কিন্তু বাজারে কাক্সিক্ষত দাম না পাওয়ায় এখন লোকসানের শঙ্কায় আছেন। তিনি বলেন, ?‘আম প্রক্রিয়াজাতকরণ ব্যবস্থা থাকলে আমাদের আম নষ্ট হতো না। আমগুলো প্রক্রিয়াজাতকরণের প্রসেসিংয়ের মাধ্যমে বিভিন্ন জায়গায় পাঠানো যেত। এটা হলে দাম ভালো পাওয়া যেত।’ একই ধরনের অভিযোগ রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নওগাঁ ও নাটোর জেলার বেশির ভাগ ফল চাষির। তারা বলছেন, প্রতি বছর ফল উৎপাদন বাড়লেও সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ সুবিধার অভাবে তাদের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত হচ্ছে না।


রাজশাহী বিভাগীয় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, চলতি মৌসুমে রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নওগাঁ ও নাটোর জেলায় মোট ১ লাখ ১২ হাজার ৬৮০ হেক্টর জমিতে আমের আবাদ হয়েছে। এসব জমি থেকে ১৬ লাখ ৯২ হাজার ৬ টন আম উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এ ছাড়া চলতি মৌসুমে চার জেলায় প্রায় ৪৭টি জাতের ফল চাষ হয়েছে। কৃষি বিভাগের তথ্য বলছে, এ অঞ্চলে শুধু আম নয়; লিচু, লেবু, ড্রাগন, স্ট্রবেরিসহ উচ্চমূল্যের বিভিন্ন ফলের উৎপাদনও বাড়ছে। জেলাভিত্তিক তথ্য অনুযায়ী, রাজশাহীতে ১৯ হাজার ৬২ হেক্টর জমিতে আমের আবাদ হয়েছে, যেখানে                এরপর পৃষ্ঠা ৬ কলাম ৫ উৎপাদন হয়েছে ২ লাখ ৪৪ হাজার ৬৯১ টন। নওগাঁয় ৩০ হাজার ৩১০ হেক্টর জমিতে আবাদ করে উৎপাদন হয়েছে ৪ লাখ ২১ হাজার ৬১২ টন। নাটোরে ৫ হাজার ৬৯৩ হেক্টর জমিতে উৎপাদন হয়েছে ৭২ হাজার ৮৫৩ টন এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জে ৩৭ হাজার ৪৮৭ হেক্টর জমিতে উৎপাদন হয়েছে ৪ লাখ ৫৮ হাজার ৯১২ টন। এ চার জেলায় ১ হাজার ৭০১ হেক্টর জমিতে লিচুর আবাদ হয়েছে। সেখানে উৎপাদন হয়েছে ১৩ হাজার ১৫০ টন। ১ হাজার ৩৮০ হেক্টর জমিতে লেবু উৎপাদন হয়েছে ১৯ হাজার ২৬১ মেট্রিক টন। এর পাশাপাশি ৪৯৫ হেক্টর জমিতে ড্রাগন ফলের উৎপাদন হয়েছে ৭ হাজার ৯৩৭ টন। ১২২ হেক্টর জমিতে চাষ হয়েছে ড্রাগন ফল। উৎপাদন হয়েছে ১ হাজার ১৯৩ টন। কৃষি অর্থনীতিবিদদের মতে, বাংলাদেশে ফল উৎপাদনের পর ২০ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কৃষিপণ্য বিভিন্ন পর্যায়ে নষ্ট হয়ে যায়। এর অন্যতম কারণ পর্যাপ্ত সংরক্ষণাগার, কোল্ড চেইন ব্যবস্থাপনা এবং প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পের অভাব। বিশেষ করে দ্রুত নষ্ট হওয়া ফলের ক্ষেত্রে এই ক্ষতির পরিমাণ আরও বেশি। আম ভ্যালু চেইন প্রমোশনাল বডির কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি শফিকুল ইসলাম সানা বলেন, ‘আম ও অন্যান্য ফলগুলোর প্রক্রিয়াজাতকরণ খুব কম হয়। এটা করা গেলে অনেক ফল রপ্তানি করা যেত। প্রক্রিয়াজাতকরণ ও সংরক্ষণ ছাড়া এত ফল দীর্ঘদিন রাখা সম্ভব নয়। এ বিষয়ে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।’