প্রতি শীত মৌসুমে পিঁয়াজের উদ্বৃত্ত উৎপাদন হয়। এতে সরবরাহ বেড়ে দাম হঠাৎ করে প্রতি কেজি ৬০ টাকার নিচে নেমে আসে। উৎপাদন খরচ না উঠলেও কৃষক বাধ্য হন লোকসানে বিক্রি করতে। আবার সংরক্ষণ সুবিধার অভাবেও বিপুল পরিমাণ পিঁয়াজ নষ্ট হয়। কয়েক মাস পরই আবার পরিস্থিতি উল্টো হয়ে ঘাটতি দেখা দেয়। তখন সক্রিয় হয় মধ্যস্বত্বভোগীরা, সরকার আমদানির অনুমতি দেয় এবং দাম দ্রুত বেড়ে যায়। এই দামের চাপে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন নিম্ন আয়ের ভোক্তারা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বারবার আসা এই সংকটের মূল কারণ একটি গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর অনুপস্থিতি বা বাণিজ্যিক পর্যায়ের খাদ্য বিকিরণ ব্যবস্থা। কৃষি মন্ত্রণালয়ের দীর্ঘদিনের পরিকল্পনা থাকলেও এখনো দেশে পিঁয়াজ ও মসলাজাতীয় পণ্যের মতো দ্রুত নষ্ট হওয়া ফসল সংরক্ষণের জন্য কোনো পূর্ণাঙ্গ বিকিরণ কেন্দ্র চালু হয়নি। ফলে কৃষক, কৃষিপ্রক্রিয়াজাত শিল্প এবং রপ্তানিকারকরা যেমন ক্ষতির মুখে পড়ছেন, তেমনি দেশ হারাচ্ছে মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রা।

BP 101এ বিষয়ে প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের বিপণন পরিচালক কামরুজ্জামান কামাল বলেন, এটি ফসল কাটার পরবর্তী ক্ষতি এবং খাদ্য নিরাপত্তার একটি বড় দুর্বলতাকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরে। একটি বিকিরণ কেন্দ্র একাই সব সমস্যার সমাধান করবে না, তবে এটি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অনুপস্থিতি।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, পর্যাপ্ত সংরক্ষণ সুবিধা না থাকায় প্রতি বছর দেশে উৎপাদিত পিঁয়াজের প্রায় ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ নষ্ট হয়ে যায়। বিকিরণ সুবিধা না থাকায় কৃষকদের ফসল তোলার পরপরই বাজারে পিঁয়াজ ছাড়তে হয়, এতে বাজারে অতিরিক্ত সরবরাহ তৈরি হয় এবং দামে ধস নামে। খাদ্য বিকিরণ প্রযুক্তিতে নিয়ন্ত্রিত গামা রশ্মি ব্যবহার করে পিঁয়াজের অঙ্কুরোদগম রোধ করা হয় এবং জীবাণুর মাত্রা কমানো হয়। ফলে পণ্যের সংরক্ষণকাল কয়েক মাস পর্যন্ত বাড়ানো সম্ভব হয়। উন্নত দেশগুলোতে এবং প্রতিবেশী ভারতেও এ প্রযুক্তি নিয়মিতভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক ড. সারিফুল হক ভূঁইয়া বলেন, খাদ্য বিকিরণের মাধ্যমে কয়েক মাস পর্যন্ত সংরক্ষণকাল বাড়ানো যায়। ময়মনসিংহে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে অবস্থিত কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট একটি দীর্ঘদিনের পরিকল্পিত বিকিরণ কেন্দ্র বাস্তবায়ন করছে, যা কৃষি খাত এবং সংশ্লিষ্ট প্রশিক্ষণ কার্যক্রমে ব্যবহৃত হবে।

প্রাথমিকভাবে প্রকল্পটি পিঁয়াজ উৎপাদনের প্রধান অঞ্চল ফরিদপুরে স্থাপনের পরিকল্পনা থাকলেও পরে স্থান পরিবর্তন করে গাজীপুরে নেওয়া হয়েছে। এতে আন্তর্জাতিক অংশীদার, বিশেষ করে ইন্টারন্যাশনাল ফান্ড ফর এগ্রিকালচারাল ডেভেলপমেন্ট (ইফাদ) সহায়তা দিচ্ছে। কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের প্রধান জানান, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কঠোর নিরাপত্তা, নিয়ন্ত্রক অনুমোদন এবং মানসম্মত প্রক্রিয়া অনুসরণের কারণে প্রকল্পটি বিলম্বিত হয়েছে। খাদ্য বিকিরণ একটি সংবেদনশীল ও পরমাণু-সম্পর্কিত অবকাঠামো। তাই প্রচলিত কৃষি প্রকল্পের তুলনায় এখানে অনেক বেশি অনুমোদন ও সুরক্ষা মান মেনে চলতে হয়, বলেন তিনি।

বর্তমানে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের আওতায় খাদ্য ও বিকিরণ জীববিজ্ঞান ইনস্টিটিউটে সীমিত আকারে বিকিরণ সুবিধা রয়েছে, যা মূলত ওষুধ শিল্পের জন্য ব্যবহৃত হয়। পিঁয়াজ বা মসলাজাতীয় পণ্য প্রক্রিয়াজাত করার সক্ষমতা সেখানে নেই, ফলে দেশীয় বাজার ও রপ্তানি দুটিই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। হলুদ, পিঁয়াজ ও মরিচসহ মসলা রপ্তানিকারকরা আন্তর্জাতিক খাদ্য নিরাপত্তা ও উদ্ভিদ স্বাস্থ্য মান পূরণে চরম ভোগান্তিতে পড়ছেন। অনেক ক্ষেত্রেই পরীক্ষার নমুনা পাঠাতে হচ্ছে সিঙ্গাপুর বা ভারতে, যার ফলে খরচ ও সময় বেড়ে যাচ্ছে। এ কারণে ভিয়েতনাম, ভারত ও পাকিস্তানের মতো প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশ পিছিয়ে পড়ছে

১৯৯৭ সাল থেকে বাধ্যতামূলক বিকিরণ পরীক্ষার বিধান থাকলেও খাদ্য বিকিরণের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গড়ে ওঠেনিযদিও বাপশকের দাবি, বিদ্যমান পরীক্ষাগারগুলো কম খরচে বিকিরণসংক্রান্ত ছাড়পত্র দিতে সক্ষমতবে শিল্পকৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু পরীক্ষা যথেষ্ট নয়সংরক্ষণসংরক্ষণকাল বাড়ানোই মূল চাবিকাঠি, বিশেষ করে পিঁয়াজের মতো রাজনৈতিকসামাজিকভাবে সংবেদনশীল পণ্যের ক্ষেত্রেবাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম বলেন, বিকিরণ অবকাঠামোর অভাব কৃষকদের আয়ে সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। পিঁয়াজ, আলু ও বাঁধাকপি চাষিরা ভালো ফলন পেলেও সংরক্ষণ না থাকায় লোকসানের চক্রে আটকে পড়ছেন, বলেন তিনি। তাঁর মতে, সংরক্ষণ না থাকলে উদ্বৃত্ত উৎপাদন আশীর্বাদ নয়, অভিশাপে পরিণত হয়। কৃষকরা সঙ্গে সঙ্গে বিক্রি করতে বাধ্য হন, আর কয়েক মাস পর ঘাটতির সময় ভোক্তাদেরই বেশি দাম দিতে হয়