রাজধানীবাসীর পাতালরেলের দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটাতে বড় উদ্যোগ নিয়েছে বর্তমান সরকার। অতিমূল্যায়িত প্রকল্প ব্যয় কমিয়ে আনার অংশ হিসেবে বহুল আলোচিত ‘এমআরটি লাইন-৫’ প্রকল্পের প্রাক্কলিত ব্যয় থেকে অন্তত ৬ হাজার কোটি টাকা কমানো হয়েছে। ব্যয়-সাশ্রয়ী সংশোধিত এ উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) এখন অনুমোদনের জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত। এরই মধ্যে এ লাইনের রুটের অ্যালাইনমেন্ট ও সামগ্রিক নকশার চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছে। ২০ কিলোমিটার দীর্ঘ এ মেট্রোরেল প্রকল্পের প্রায় তিন-চতুর্থাংশই নির্মিত হবে মাটির নিচে। মাটির ওপরিভাগ থেকে প্রায় ৫৬ ফুট থেকে ১৫৩ ফুট গভীরতা দিয়ে এ পাতাল রেলের রুট তৈরি হবে। মোট রুটের ১৩.৫০ কিলোমিটার অংশ থাকবে মাটির নিচে (পাতাল) এবং বাকি ৬.৫০ কিলোমিটার অংশ থাকবে মাটির ওপরে (উড়াল)।
ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড (ডিএমটিসিএল) ও পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা গেছে, বিগত সরকারের প্রাক্কলন করা উচ্চ ব্যয় কাটছাঁট করে সংশোধিত ডিপিপি চূড়ান্ত করা হয়েছে। নতুন প্রস্তাবনায় প্রকল্পটির ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে ৪৮ হাজার কোটি টাকা। প্রকল্প পরিচালক বি জে (অব) আবদুল ওহাব বলেন, ‘শতভাগ স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির সঙ্গে প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য সব ধরনের তদারকি বাড়ানো হয়েছে। এর ফলে প্রাক্কলিত মূল্যও কমে এসেছে। আমরা জবাবদিহিমূলক সরকারি কাঠামো গড়ে তুলতে চাই।’ চূড়ান্ত ডিপিপি অনুযায়ী, ৪৮ হাজার কোটি টাকার এ মেগা প্রকল্পে সরকারি তহবিল থেকে জোগান দেওয়া হবে ১৫ হাজার কোটি টাকার কিছু বেশি। অবশিষ্ট প্রায় ৩২ হাজার কোটি টাকা আসবে বৈদেশিক ঋণ বা উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা থেকে। শুরুতে কেবল এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) এ প্রকল্পে অর্থায়নের কথা থাকলেও পরবর্তীতে কো-ফাইন্যান্সার হিসেবে দক্ষিণ কোরিয়া যুক্ত হয়েছে। চুক্তি অনুযায়ী, মূল উন্নয়ন সহযোগী এডিবি কনসালট্যান্সি ও সিভিল প্যাকেজগুলোতে এবং কোরিয়ান এক্সিম ব্যাংক সিস্টেম প্যাকেজগুলোতে অর্থায়ন করবে। এ প্রকল্পের জন্য চলতি অর্থবছরের (২০২৬-২৭) বাজেটে ৩ হাজার ৯১০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। জাতীয় অর্থনৈতিক কাউন্সিলের নির্বাহী কমিটির (একনেক) পরবর্তী সভায় প্রস্তাবটি অনুমোদনের জন্য উত্থাপন করা হবে।
বৈদেশিক অর্থায়ন জটিলতায় এমআরটি লাইন-৫ (সাউদার্ন রুট) প্রকল্পের অনুমোদন পিছিয়ে যাওয়ার যে শঙ্কা তৈরি হয়েছিল, তা কেটে গেছে। অনুমোদন পিছিয়ে গেলেও নির্মাণ কাজে যাতে এর প্রভাব না পড়ে, সেজন্য অগ্রিম ক্রয় কার্যক্রম শুরু করেছে ডিএমটিসিএল। ইতোমধ্যে মেট্রোরেলের এ লাইন নির্মাণে অগ্রিম ক্রয় প্রক্রিয়ায় অনুমোদন দিয়েছে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ এবং এডিবি। এমআরটি-৫ প্রকল্পে এ অগ্রিম ক্রয় প্রক্রিয়ার কারণে প্রকল্প অনুমোদনের পর অন্তত এক বছর সময় বাঁচবে।
২০২৮ সালের মধ্যে প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে ঢাকা মহানগরীর প্রথম পূর্ব-পশ্চিম করিডরে প্রতিদিন প্রায় ১২ লাখ ৩০ হাজার যাত্রী যাতায়াত করতে পারবেন। প্রতিটি একমুখী বিদ্যুৎচালিত মেট্রো ট্রেন ১৪টি স্টেশনে থেমে মাত্র ৩২ মিনিটে হেমায়েতপুর থেকে ভাটারা পর্যন্ত পথ পাড়ি দেবে। উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহারের কারণে এ লাইনে শব্দ ও কম্পন দূষণের মাত্রা আন্তর্জাতিক মানদণ্ড সীমার চেয়ে অনেক নিচে থাকবে। উড়াল পথের ভায়াডাক্টের উভয় পাশে আধুনিক শব্দ প্রতিবন্ধক দেয়াল (সাউন্ড ব্যারিয়ার) থাকবে এবং পাতাল অংশের টানেল সংলগ্ন মাটি প্রাকৃতিকভাবেই শব্দ ও কম্পন প্রতিরোধক হিসেবে কাজ করবে। ফলে এটি পরিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে না; বরং কার্বন নির্গমন কমিয়ে পরিবেশ উন্নয়নে ভূমিকা রাখবে। শুরুতে ৮টি কোচবিশিষ্ট ১৮ সেট মেট্রো ট্রেন দিয়ে এ লাইনে যাতায়াত শুরু হবে। ভবিষ্যতে ট্রেনের সংখ্যা বাড়িয়ে ৪২ সেটে উন্নীত করার সুযোগ রাখা হয়েছে। ট্রেনের মাঝের ৬টি কোচের প্রতিটিতে সর্বোচ্চ ৩৯০ জন এবং দুই প্রান্তের ট্রেইলার কোচের প্রতিটিতে সর্বোচ্চ ৩৭৪ জন যাত্রী চড়তে পারবেন। প্রতিটি মেট্রো ট্রেন একবারে সর্বোচ্চ ৩ হাজার ৮৮ জন যাত্রী পরিবহন করতে পারবে। এ লাইনে প্রতি ঘণ্টায় উভয় দিকে ৫৩ হাজার ২০০ যাত্রী যাতায়াত করতে পারবেন। ব্যস্ত সময়ে প্রতি ৩ মিনিট ৩০ সেকেন্ড পরপর একটি করে ট্রেন স্টেশন ছেড়ে যাবে। অত্যাধুনিক এ ট্রেনগুলো উড়ালপথে ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ১০০ কিলোমিটার এবং মাটির নিচের পাতালপথে ঘণ্টায় ৯০ কিলোমিটার গতিতে ছুটবে। ডিএমটিসিএল সূত্রে জানা গেছে, প্রকল্পের কারিগরি সহায়তার আওতায় প্রথম পর্যায়ের সমীক্ষা এবং দ্বিতীয় পর্যায়ের প্রকৌশলগত নকশা তৈরির কাজ ইতোমধ্যেই শেষ হয়েছে। নির্মাণ কাজের দরপত্র সংক্রান্ত নথির (বিডিং ডকুমেন্ট) প্রায় ৯০ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হয়েছে। হেমায়েতপুর ডিপোর ভূমি অধিগ্রহণের কাজ শতভাগ শেষ হয়েছে এবং মোট ১০টি প্যাকেজের মধ্যে প্যাকেজ-০১ এর আওতায় ডিপোর ভূমি উন্নয়নের কাজ দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলছে। ২০২৬ সালের মার্চ মাস পর্যন্ত এর বাস্তব অগ্রগতি ৭৭.৫৬ শতাংশ। এ ছাড়া ১৪টি স্টেশন এবং পাতাল অংশের দুই প্রান্তের ট্রানজিশন সেকশন নির্মাণের জন্য প্রয়োজনীয় ভূমি অধিগ্রহণের কাজ বর্তমানে বিভিন্ন পর্যায়ে চলমান রয়েছে।
রুট : হেমায়েতপুর, বলিয়ারপুর, বিলামালিয়া, আমিন বাজার, গাবতলী, দারুস সালাম, মিরপুর-১, মিরপুর-১০, মিরপুর-১৪, কচুক্ষেত, বনানী, গুলশান-২, নতুনবাজার, ভাটারা, দাশেরকান্দি।
পাতাল স্টেশনসমূহ (৯টি) : গাবতলী, দারুস সালাম, মিরপুর-১, মিরপুর-১০, মিরপুর-১৪, কচুক্ষেত, বনানী, গুলশান-২ এবং নতুনবাজার।
উড়াল স্টেশনসমূহ (৫টি) : হেমায়েতপুর, বলিয়ারপুর, বিলামালিয়া, আমিনবাজার এবং ভাটারা/দাশেরকান্দি।