রাষ্ট্র সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতার কেন্দ্রে আসা নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূসের প্রায় দেড় বছরের শাসনামলে পর্দার আড়ালে থাকা ‘ভিন্ন চিত্রগুলো’ সামনে আসতে শুরু করেছে। ওই সময়ে তাঁর নিজের প্রতিষ্ঠিত ও গ্রামীণ-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য এসেছে একের পর এক গুরুত্বপূর্ণ সরকারি সিদ্ধান্ত। কর অব্যাহতি পুনর্বহাল, গ্রামীণ ব্যাংকে সরকারের মালিকানা কমানো, নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন, জনশক্তি রপ্তানির লাইসেন্স এবং পেমেন্ট সার্ভিস প্রোভাইডার (পিএসপি) লাইসেন্স। সব মিলিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, রাষ্ট্র সংস্কারের ব্যস্ততার মধ্যেই কি শক্তিশালী হয়েছে ইউনূসের প্রতিষ্ঠিত ‘গ্রামীণ’ পরিসর? কেন তদন্ত করে ওই সময়ে সব প্রকৃত ঘটনা জনগণের সামনে আনা হবে না?


আর সেই প্রশ্নের উত্তর পেতে হলে দরকার সিদ্ধান্তগুলোর পূর্ণ নথি প্রকাশ। কে প্রস্তাব করেছে, কোন মন্ত্রণালয় যাচাই করেছে, কারা অনুমোদন দিয়েছে, প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের ভূমিকা কী ছিল এবং একই সময়ে একই ধরনের সুবিধার জন্য অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোর আবেদন কী অবস্থায় ছিল। এসব তথ্য প্রকাশ না হলে ‘রাষ্ট্র সংস্কার’ আর ‘গ্রামীণ প্রতিষ্ঠানের সম্প্রসারণ’-দুই প্রক্রিয়ার সীমারেখা নিয়ে বিতর্ক থেকেই যাবে।


এ বিষয়ে বিশ্লেষকরা জানান, রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদে থেকে ক্ষমতা ব্যবহার করে নিজের প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানকে বিশেষ আর্থিক সুবিধা দেওয়া, জনশক্তি রপ্তানির লাইসেন্স দেওয়া ও বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন নেওয়াসহ সার্বিক বিষয়ে তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। তারা যুক্তি দিয়ে বলেন, বিগত আওয়ামী লীগ শাসনামলের অনিয়ম, দুর্নীতি ও অপশাসনের বিচার হওয়াকে মানুষ সাধুবাদ জানাচ্ছেন। জুলাই অভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্রে সুশাসন ও সংস্কার কার্যক্রম চালাতে অর্পিত দায়িত্ব পালনকারী অন্তর্বর্তী সরকারও যদি কোনো অনিয়ম ও দুর্নীতি করে থাকে, তাদেরও বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো উচিত। দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হলে আইন সবার জন্য সমান হিসেবেই প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ৮ আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব নেন ড. ইউনূস। এর মাত্র দুই মাসের মাথায়, ১০ অক্টোবর, গ্রামীণ ব্যাংকের আয়কর অব্যাহতি পুনর্বহাল করে এনবিআর। প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ১০ অক্টোবর থেকে ২০২৯ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত ব্যাংকটির আয়কর অব্যাহতি কার্যকর হয়। গ্রামীণ ব্যাংক ১৯৮৩ সাল থেকে কর অব্যাহতি পেয়ে এলেও আগের সুবিধার মেয়াদ শেষ হয়েছিল ২০২০ সালের ডিসেম্বরে। এরপর আসে আরও বড় কাঠামোগত পরিবর্তন। ২০২৫ সালের মে মাসে অধ্যাদেশ জারি করে গ্রামীণ ব্যাংকে সরকারের মালিকানা ২৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশ করা হয়। একই সঙ্গে ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে সরকারের নিয়ন্ত্রণও কমে যায়। অধ্যাদেশ অনুযায়ী, বাকি ৯০ শতাংশ মালিকানা থাকবে ব্যাংকের ঋণগ্রহীতা-শেয়ারহোল্ডারদের হাতে। ঘটনাটি বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ ওই সিদ্ধান্তের নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল প্রধান উপদেষ্টার সভাপতিত্বে উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে। ফলে প্রশ্ন উঠেছে-নিজের প্রতিষ্ঠিত গ্রামীণ ব্যাংকের কাঠামো পরিবর্তনের সিদ্ধান্তে প্রধান উপদেষ্টার ভূমিকা কী ছিল এবং সম্ভাব্য স্বার্থের সংঘাত এড়াতে কী ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল?


শুধু ব্যাংক নয়, গ্রামীণ ট্রাস্টের অধীনে এসেছে বিশ্ববিদ্যালয়ও। ‘গ্রামীণ ইউনিভার্সিটি’ প্রতিষ্ঠার জন্য আবেদন করা হয় ২০২৪ সালের ১৭ ডিসেম্বর। মাত্র তিন মাসের মধ্যে ২০২৫ সালের ১৭ মার্চ শিক্ষা মন্ত্রণালয় ২২টি শর্তে প্রতিষ্ঠানটির সাময়িক অনুমোদন দেয়। এটি অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে অনুমোদিত প্রথম বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়। গ্রামীণ ট্রাস্টের প্রতিষ্ঠাতা ড. ইউনূস এবং ট্রাস্টের চেয়ারম্যান মো. আশরাফুল হাসান বিশ্ববিদ্যালয়টির ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যানও হন। এরপর গ্রামীণ নামের সঙ্গে যুক্ত হয় জনশক্তি রপ্তানির ব্যবসা। গ্রামীণ এমপ্লয়মেন্ট সার্ভিসেস লিমিটেড জনশক্তি রপ্তানির লাইসেন্স পায় এবং পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সিজের সদস্য হয়। বর্তমানে বায়রার তালিকাতেও প্রতিষ্ঠানটির রিক্রুটিং লাইসেন্স নম্বর ২৮০৬ হিসেবে রয়েছে। আর্থিক প্রযুক্তির ক্ষেত্রেও এগিয়েছে গ্রামীণ। গ্রামীণ টেলিকমের সহযোগী প্রতিষ্ঠান সমাধান সার্ভিসেস লিমিটেড ২০২১ সালের নভেম্বরে পিএসপি লাইসেন্সের আবেদন করেছিল। দীর্ঘ সময় সিদ্ধান্ত ঝুলে থাকায় ইউনূস প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব নেওয়ার পর ২০২৪ সালের  ২৯ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ ব্যাংক এনওসি দেয়। ২০২৫ সালের ২ জুন প্রতিষ্ঠানটিকে পিএসপি লাইসেন্স দেওয়া হয়। সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে গ্রামীণ কল্যাণের ৬৬৬ কোটি টাকার কর নিয়ে। বিষয়টি ‘কর মওকুফ’ বলে চালিয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। বরং গত ১০ সেপ্টেম্বর হাই কোর্ট গ্রামীণ কল্যাণের করা রিট খারিজ করে এনবিআরের প্রায় ৬৬৬ কোটি টাকার কর দাবি বহাল রেখেছেন। বিচারপতি মো. মজিবুর রহমান মিয়ার নেতৃত্বাধীন হাই কোর্ট বেঞ্চ এ রায় ঘোষণা করেন। এই কর দাবি ২০১২-১৩ থেকে ২০১৬-১৭ করবর্ষের। গ্রামীণ কল্যাণের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তারা রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করবে। গত বৃহস্পতিবার রায়ের পর ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মো. আবদুস সামাদ আজাদ সাংবাদিকদের বলেন, ‘গ্রামীণ কল্যাণের রিটের পর কর কমিশনের সিদ্ধান্তের বৈধতা নিয়ে হাই কোর্ট যে রুল জারি করেছিলেন, তা খারিজ করে দিয়েছেন হাই কোর্ট। ফলে সরকারের কর বিভাগ আইন অনুযায়ী ইচ্ছা করলে ডিমান্ড নোটিস জারির মাধ্যমে গ্রামীণ কল্যাণ থেকে প্রদেয় আয়কর আদায় করতে পারবে।’ এর আগে জুলাই গণ অভ্যুত্থানের পর ৪ অক্টোবর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের মালিকানাধীন গ্রামীণ কল্যাণের কাছ থেকে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) দাবি করা ৬৬৬ কোটি টাকা দেওয়ার রায় স্বতঃপ্রণোদিতভাবে প্রত্যাহার করে নেন হাই কোর্ট। দায়িত্বের শেষ পর্যায়েও সুবিধার প্রশ্ন থেকে যায়। নির্বাচনের মাত্র দুই দিন আগে, চলতি বছরের ১০ ফেব্রুয়ারি গেজেট জারি করে দায়িত্ব হস্তান্তরের তারিখ থেকে এক বছরের জন্য ড. ইউনূসকে ভিভিআইপি মর্যাদা দেওয়া হয়। এর ফলে তিনি এক বছর বিশেষ নিরাপত্তা বাহিনী-এসএসএফের নিরাপত্তা পাওয়ার সুযোগ পান। অর্থাৎ দেড় বছরের শাসনামলের ঘটনাপ্রবাহে একটি অস্বস্তিকর কাকতালীয় ঘটনা স্পষ্ট, রাষ্ট্র সংস্কারের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তির প্রতিষ্ঠিত ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো একই সময়ে পেয়েছে কর-সুবিধা, মালিকানা কাঠামোয় পরিবর্তন, বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদন, জনশক্তি রপ্তানির লাইসেন্স এবং আর্থিক প্রযুক্তিতে প্রবেশের সুযোগ। কিন্তু প্রশ্নটি সেখানেই শেষ হয় না। রাষ্ট্র সংস্কারের নামে ক্ষমতার কেন্দ্রে থাকা একজন ব্যক্তির প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানগুলো যখন একের পর এক সরকারি সুবিধা ও সিদ্ধান্ত পায়, তখন সেই সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় তাঁর ব্যক্তিগত বা প্রাতিষ্ঠানিক স্বার্থ থেকে পূর্ণ দূরত্ব নিশ্চিত করা হবে কি না- সেটিই বড় প্রশ্ন হিসেবে দেখা দিয়েছে।