বাংলার সড়কগুলোরও যেন ইতিহাসের খাতা আছে। সেই খাতায় সবচেয়ে ভারী কিছু পৃষ্ঠা লেখা হয়েছিল ১৯৭১ সালের শরতে, যশোর রোড ঘিরে।


সেই সময় এই সড়ক ছিল কেবল সীমান্তের দুই প্রান্তকে যুক্ত করা একটি ব্যস্ত পথ নয়; ছিল বেঁচে থাকার পথ। পূর্ব পাকিস্তান থেকে পশ্চিমবঙ্গের দিকে তখন মানুষের ঢল। কোলে শিশু, কাঁধে বয়স্ক স্বজন, সঙ্গে সামান্য কিছু কাপড়চোপড় ও রান্নার হাঁড়ি—যা কিছু সঙ্গে নেওয়া সম্ভব হয়েছিল, তাই নিয়ে মানুষ ছুটছিল সীমান্তের ওপারে।


পেছনে পড়ে থাকছিল পুড়ে যাওয়া গ্রাম, ধ্বংস হয়ে যাওয়া ঘরবাড়ি আর পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর নির্মম দমন-পীড়নের স্মৃতি।



সামনে অপেক্ষা করছিল অস্থায়ী শরণার্থীশিবির, বর্ষার কাদা, কলেরা-আমাশয়সহ নানা রোগ আর অনিশ্চয়তায় ভরা আরেক জীবন। তার মধ্যেও ছিল ক্ষীণ এক আশা—পরের সকালটি হয়তো দেখা যাবে।

১৯৭১ সালের সেপ্টেম্বর মাসে সেই শরণার্থীশিবিরগুলোর কাছে যশোর রোডে এসেছিলেন অ্যালেন গিন্সবার্গ। তিনি ছিলেন না কোনো কূটনীতিক, সেনা কর্মকর্তা কিংবা যুদ্ধের সংবাদদাতা।



আমেরিকান এই বিট কবির ভারতের সঙ্গে ছিল দীর্ঘদিনের সাহিত্যিক ও আধ্যাত্মিক সম্পর্ক।

কিন্তু সেখানে যা দেখলেন, তা নিজের মধ্যে আটকে রাখলেন না। সেই অভিজ্ঞতা ছড়িয়ে পড়ল তাঁর কবিতায়—‘September on Jessore Road’। দীর্ঘ, ক্ষুব্ধ এবং নির্মোহ এই কবিতা হয়ে উঠল প্রত্যক্ষদর্শীর এক শক্তিশালী দলিল। দূরের মানুষকে তিনি বাধ্য করতে চাইলেন চোখ মেলে তাকাতে।



ইতিহাস প্রায়ই সংখ্যার ভাষায় কথা বলে। ১৯৭১ সালের শরণার্থী সংকটও তাই। প্রায় এক কোটি মানুষ পূর্ব পাকিস্তান থেকে সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে আশ্রয় নিয়েছিল। গ্রাম ও জনপদ পুড়েছে, ঘরবাড়ি ধ্বংস হয়েছে, আর রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে জন্ম নিয়েছে স্বাধীন বাংলাদেশ।


কিন্তু সংখ্যা মানুষকে স্তব্ধ করে দেয়, আবার দূরেও সরিয়ে রাখে। গিন্সবার্গের কবিতার শক্তি ছিল সেই দূরত্ব ভেঙে দেওয়া।


তাঁর কবিতার সবচেয়ে স্মরণীয় পঙ্‌ক্তিগুলোর একটি— ‘Millions of babies watching the skies / Bellies swollen, with big round eyes’. অর্থাৎ, আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে লাখো শিশু—ফোলা পেট, বিস্ফারিত চোখ।


এখানে কোনো জটিল প্রতীক নেই, নেই সৌন্দর্যের আবরণ। আছে ক্ষুধা, বৃষ্টি, কাদা আর শিশুদের মুখ। যুদ্ধের কূটনীতি কিংবা ভূরাজনীতির অনেক ওপরে উঠে গিন্সবার্গ তাকিয়েছিলেন যুদ্ধের শেষ প্রান্তে—ট্যাংক চলে যাওয়ার পর যে মানুষগুলো পড়ে থাকে, তাদের দিকে। যশোর রোডের শিবিরে থাকা মানুষের কাছে এসব কোনো বিমূর্ত চিত্র ছিল না। সেটিই ছিল তাঁদের প্রতিদিনের জীবন।


গিন্সবার্গের ক্ষোভও ছিল স্পষ্ট। জীবনের বড় অংশজুড়ে তিনি প্রতিষ্ঠিত নীরবতা ও ভণ্ডামির বিরুদ্ধে কথা বলেছেন। পূর্ব পাকিস্তানে নৃশংসতার খবর একের পর এক প্রকাশিত হওয়ার পরও পাকিস্তানের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন তাঁকে ক্ষুব্ধ করেছিল। তখন ওয়াশিংটন ইসলামাবাদের সঙ্গে সম্পর্ককে শীতল যুদ্ধের বৃহত্তর কৌশলের অংশ হিসেবে দেখছিল। আর গিন্সবার্গ পশ্চিমবঙ্গে এসে দেখছিলেন সেই রাজনীতির মানবিক পরিণতি।


১৯৭১ সালের ১৪ নভেম্বর দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস-এ কবিতাটি প্রকাশিত হলে তা পূর্ব পাকিস্তানের বিপর্যয় নিয়ে ক্রমবর্ধমান আন্তর্জাতিক সাংস্কৃতিক প্রতিক্রিয়ার অংশ হয়ে ওঠে। কবিতাটির যাত্রা অবশ্য সংবাদপত্রের পাতায় থেমে থাকেনি। সে বছরের নভেম্বরে নিউইয়র্কের রেকর্ড প্ল্যান্ট স্টুডিওতে কবিতাটির একটি রেকর্ডিং করেন গিন্সবার্গ। সঙ্গে ছিলেন বব ডিলান এবং আরো কয়েকজন সংগীতশিল্পী, তাঁদের মধ্যে ডেভিড অ্যামরাম ও হ্যাপি ট্রমও ছিলেন।


এর কয়েক মাস আগে, ১ আগস্ট, নিউইয়র্কের ম্যাডিসন স্কয়ার গার্ডেনে জর্জ হ্যারিসন ও রবিশঙ্করের আয়োজনে অনুষ্ঠিত হয়েছিল ঐতিহাসিক 'Concert for Bangladesh'। সেখানে বব ডিলানসহ বিশ্বের খ্যাতিমান শিল্পীরা অংশ নিয়েছিলেন। লক্ষ্য ছিল পূর্ব পাকিস্তান থেকে ভারতে পালিয়ে আসা কোটি শরণার্থীর দুর্দশার দিকে বিশ্বের দৃষ্টি আকর্ষণ করা এবং মানবিক সহায়তা সংগ্রহ।


গিন্সবার্গের কবিতা সেই আন্তর্জাতিক সাংস্কৃতিক প্রতিক্রিয়ায় যোগ করল আরেকটি কণ্ঠ। স্টুডিওর সেই রেকর্ডিং ছিল না কোনো পরিপাটি পপ প্রতিবাদী গান। বরং দীর্ঘ, ঘোরলাগা এক আবৃত্তি—কথার সঙ্গে মিশে থাকা তাৎক্ষণিক সংগীত, কখনো কাঁপা, কখনো অস্থির। ১৯৭১-এর সেই সময়ের মতোই অগোছালো, কিন্তু গভীরভাবে আন্তরিক।


গ্রিনউইচ ভিলেজের লোকসংগীতের আবহ আর বিট কবিতার ভবিষ্যদ্বাণীমূলক উচ্চারণ যেন এক জায়গায় এসে মিলেছিল সেখানে। বঙ্গের শরণার্থীশিবিরের যন্ত্রণা পৌঁছে গিয়েছিল আমেরিকার সাংস্কৃতিক পরিসরে।


তবে দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাসে বাইরের মানুষের ভূমিকা নিয়ে পরিমিতিবোধ জরুরি। বৈশ্বিক দক্ষিণের কোনো বিপর্যয়ের সময় পশ্চিমা কাউন্টারকালচারের কোনো শিল্পীর উপস্থিতি অনেক সময় তাঁকেই গল্পের নায়ক করে তোলে। ১৯৭১-এর ইতিহাসে গিন্সবার্গকে সেভাবে দেখা ভুল হবে।


তিনি বাংলাদেশের ত্রাতা ছিলেন না। যুদ্ধটি করেছেন এবং সহ্য করেছেন বাঙালিরাই। মুক্তিবাহিনীর তরুণ যোদ্ধাদের পাশাপাশি ছাত্র, কৃষক, শ্রমিক, শিক্ষক এবং অগণিত সাধারণ মানুষ পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন। স্থানীয় সহযোগীদের সহায়তায় সংঘটিত নৃশংসতার শিকার হয়েছেন অসংখ্য বেসামরিক মানুষ। আর প্রায় এক কোটি মানুষ আশ্রয়ের জন্য সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে গিয়েছিলেন।


যুদ্ধ শেষে হাজার হাজার যোদ্ধা ও বেসামরিক মানুষ আর ঘরে ফেরেননি। এই বিশাল ইতিহাসের পাশে গিন্সবার্গের অবদান ছিল তুলনামূলকভাবে ছোট। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, সেটিই হয়তো দীর্ঘস্থায়ী হয়ে আছে অন্য এক অর্থে।


তিনি সেখানে গিয়েছিলেন। চোখ খোলা রেখেছিলেন। যা দেখেছিলেন, তা লিখে রেখেছিলেন। আর নিজের আন্তর্জাতিক পরিচিতিকে কাজে লাগিয়ে শরণার্থীদের দুর্দশার কথা পৌঁছে দিয়েছিলেন এমন মানুষের কাছে, যারা হয়তো কখনো যশোর রোডের কাদা কিংবা শরণার্থীশিবিরের গন্ধ অনুভব করেনি।


পাঁচ দশকেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেছে। যশোর রোড এখন ব্যস্ত, কোলাহলমুখর এক পরিবহনপথ। ১৯৭১ সালের জরুরি শরণার্থীশিবিরগুলোর অধিকাংশই আর নেই। কোথাও সেগুলোর চিহ্ন মুছে গেছে, কোথাও চারপাশের জনপদ বদলে গিয়ে মিশে গেছে দ্রুত বাড়তে থাকা নগরায়ণের সঙ্গে।


গিন্সবার্গ যে শিশুদের দেখেছিলেন, তাঁরা আজ হয় প্রবীণ, নয়তো এই পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছেন। বাংলাদেশ ১৯৭১-এর স্মৃতি ধরে রাখতে নির্মাণ করেছে স্মৃতিসৌধ, আয়োজন করেছে রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠান, প্রতি বছর ফিরে এসেছে স্বাধীনতার ইতিহাস। সাভারের স্মৃতিসৌধে দাঁড়িয়ে আমরা সেই রক্তাক্ত ইতিহাসকে স্মরণ করি।


এসব অবশ্যই প্রয়োজনীয়। তবু কখনো কখনো ফিরে তাকানো দরকার সেই দীর্ঘ, এলোমেলো, হৃদয়বিদারক ১৫২ পঙ্‌ক্তির কবিতাটির দিকে। একজন ইহুদি-আমেরিকান বিট কবি, নিউ জার্সির সন্তান, এক বর্ষণমুখর কাদামাখা সড়ক ধরে পশ্চিমবঙ্গের শরণার্থীশিবিরে গিয়েছিলেন। তিনি দেখেছিলেন মানুষের দুর্দশা। আর তা লিখে রেখেছিলেন। সেই লেখার মধ্য দিয়ে যশোর রোডের শরণার্থীদের মুখ পৌঁছে গিয়েছিল আন্তর্জাতিক সাংস্কৃতিক স্মৃতিতে।


সড়কটি হয়তো বদলে গেছে। মানুষগুলোও নেই। কিন্তু ইতিহাসের কিছু রাস্তা আসলে কখনো শেষ হয় না। তারা শুধু নতুন মানুষের পায়ের নিচ দিয়ে বয়ে যায়—আর নীরবে মনে করিয়ে দেয়, একদিন এখানে কত মানুষ বেঁচে থাকার জন্য হেঁটেছিল।