রাজধানীর গণপরিবহনে শৃঙ্খলা ফেরাতে একের পর এক উদ্যোগ নেওয়া হলেও কাক্সিক্ষত পরিবর্তন আসেনি। নগর পরিবহন বন্ধ হয়ে গেছে। বাসে ই-টিকেটিং পদ্ধতিও অনেক ক্ষেত্রে মানা হচ্ছে না। নির্ধারিত স্টপেজ ও যাত্রী ছাউনির পরিবর্তে রাস্তার মাঝখানেই চলছে যাত্রী ওঠানো-নামানো। এমনকি নিষিদ্ধ সত্ত্বেও ফ্লাইওভারে বাস থামিয়ে যাত্রী ওঠানো-নামানো হচ্ছে। এসবের কারণে যানজটের কবলে পড়েন নগরবাসী। ঢাকার যানজটে নতুন বিষফোড়া হয়ে দাঁড়িয়েছে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা। সম্প্রতি ডিজেলের মূল্য বাড়ায় ভাড়া নিয়ে নতুন করে নৈরাজ্যের সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে সিএনজির মূল্য না বাড়ানো হলেও বর্ধিত হারে বাসভাড়া আদায় করা হচ্ছে। এসব কারণে ঢাকায় বসবাসকারী মানুষের মনের কোণে প্রতিদিনকার প্রশ্ন-কবে গণপরিবহনের নৈরাজ্য বন্ধ হয়ে শৃঙ্খলা ফিরবে?
ঢাকায় ফিটনেসবিহীন লক্কড়ঝক্কড় বাস দুর্দান্ত প্রতাপে চলছে। সংশ্লিষ্টদের হিসাবে সারা দেশে ফিটনেসবিহীন ও মেয়াদোত্তীর্ণ ৫ লাখের বেশি যানবাহন সড়কে চলছে।
ঢাকার সড়কে সাড়ে ৩ হাজার বাস-মিনিবাস যাত্রী পরিবহন করছে। এর বাইরে ফিটনেসবিহীন যানবাহনের সংখ্যা কত-সেই পরিসংখ্যান নেই ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষের (ডিটিসিএ) কাছে।
জানা যায়, ঢাকায় গণপরিবহনে শৃঙ্খলা আনতে প্রায় ছয় বছর আগে শুরু হয়েছিল বাস রুট রেশনালাইজেশনের কার্যক্রম। কিন্তু এ পদ্ধতি বাস্তবায়নের প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়ে যায়। এবার বাসরুট ফ্র্যাঞ্চাইজিং প্রকল্প সফল করতে চায় ডিটিসিএ। ২০১৫ সালে ঢাকা উত্তর সিটির তৎকালীন মেয়র আনিসুল হক রুটভিত্তিক কোম্পানির অধীনে বাস চালানোর উদ্যোগ নিয়েছিলেন। ২০১৭ সালের ৩০ নভেম্বর তিনি মারা গেলে বাস রুট রেশনালাইজেশন কমিটির দায়িত্ব পান ঢাকা দক্ষিণ সিটির তৎকালীন মেয়র সাঈদ খোকন। তিনি ১১টি সভা করেন। এরপর পরবর্তী মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস কমিটির দায়িত্ব পান। তাঁর তত্ত্বাবধানে ২৭তম সভা পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হয়। ২০২১ সালে চালু হয় ঢাকা নগর পরিবহন। ২০২৪-এর ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর তা বন্ধ হয়ে যায়। এরপর ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশপনের প্রশাসক নজরুল ইসলামের সভাপতিত্বে এ কমিটির সবশেষ ২৯তম সভা অনুষ্ঠিত হয়। তিনি দুটি সভা করেছেন। সব বাস কোম্পানিকে কয়েকটির মাধ্যমে পরিচালনা করার উদ্যোগের নামই ‘বাস রুট রেশনালাইজেশন’। এ উদ্যোগের মাধ্যমে চেষ্টা ছিল ধীরে ধীরে পুরো রাজধানীর গণপরিবহনব্যবস্থা একটি কোম্পানির আওতায় আনা। এ ছাড়া ফিটনেসবিহীন লক্কড়ঝক্কড় বাস সড়ক থেকে তুলে নিয়ে আধুনিক মানের বাস নামানো, শহরের বাইরের চারদিকে আন্তজেলা বাস টার্মিনাল ও ডিপো নির্মাণ করা। ঢাকার জন্য কোম্পানিভিত্তিক বাস সেবা প্রবর্তনের রূপরেখা তৈরি করে ডিটিসিএ। বাসগুলো পরিচালনার দায়িত্বে থাকার কথা ছিল নির্দিষ্ট কোম্পানির। সেই কোম্পানিগুলো গঠন করা হয় জয়েন্ট ভেঞ্চার পদ্ধতিতে। ২০২১ সালের সেই কার্যক্রম সফল হয়নি।
ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির নেতারা বলছেন, বিগত সরকারের আমলে পরিবহন নেতারা খুবই প্রভাবশালী ছিলেন। তাঁরা চাইতেন না ঢাকা নগর পরিবহন চালু হোক। তাঁরা সব সময় এর বিরোধিতা করতেন। কোনো বাস মালিক রেজিস্ট্রেশনের মাধ্যমে ঢাকা নগর পরিবহনে বাস ঢোকাতে চাইলে পরিবহন মালিক সমিতির নেতারা তাঁকে নানাভাবে হয়রানি করতেন, বাধা দিতেন। বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘গণপরিবহনে শৃঙ্খলা ফেরাতে যে নীতিতে চলা দরকার, তার উল্টো নীতিতে চলছে। সরকার আসে সরকার যায়, কিন্তু গণপরিবহনে শৃঙ্খলা ফেরে না। স্মার্ট বাংলাদেশ গড়তে হলে গণপরিবহনকে স্মার্ট হতে হবে। স্মার্ট গণপরিবহনের বিকল্প নেই। গণপরিবহনের মান উন্নত করতে হবে। সরকার চাইলেই সবকিছু সম্ভব। তেমনি সরকার চাইলেই সড়কে ফিটনেসবিহীন গণপরিবহন চলাচল বন্ধ করা আরও সহজ।’ তিনি বলেন, ‘বর্তমানে ঢাকার রাজপথে বিষফোড়া হয়ে দাঁড়িয়েছে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা। শহরের অলিগলি থেকে এখন মূল সড়কে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে এসব অবৈধ যান। সে কারণে ঢাকার যানজট ও বিশৃঙ্খলা বেড়েছে।’
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) প্রফেসর ও পরিবহন বিশেষজ্ঞ ড. শামসুল হক বলেন, ‘গণপরিবহনে শৃঙ্খলা ফেরানোর জন্য গণপরিবহনসংশ্লিষ্ট কোনো লোক নেই। যাঁদের এসব দেখভালের কথা তাঁরা যথাযথ দায়িত্ব পালন করছেন না। সড়কে যানবাহন সমস্যা সমাধানে যদি ধ্যানজ্ঞান না থাকে তাহলে শৃঙ্খলা আসবে না। ঢাকার ভিতরেই হাতিরঝিলে সুশৃঙ্খল গণপরিবহন আছে। বাস স্টপেজে লাইনে দাঁড়িয়ে সেবা দেয়। কাজেই দায়িত্বশীলরা সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে চাইলে তা সম্ভব। সড়কে ফিটনেসবিহীন ও মেয়াদোত্তীর্ণ যানবাহনের চলাচল বন্ধ করলেই অর্ধেক সমস্যার সমাধান হয়ে যায়।’ নগরজীবনের অন্যতম প্রধান অবলম্বন গণপরিবহনে যাত্রীসেবার মাধ্যম আজ অনেক ক্ষেত্রে মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়েছে। রাস্তায় চলছে যানবাহনের অসুস্থ প্রতিযোগিতা; যার শিকার হচ্ছেন সাধারণ যাত্রীরা। সিএনজিচালিতে বাসে ডিজেলচালিত হারে ভাড়া আদায় করা হচ্ছে। এ নিয়ে বাসের হেলপারদের সঙ্গে যাত্রীদের প্রায় হাতাহাতি ঘটছে। বিআরটিএ নির্দিষ্ট করে দিলেই বিষয়টির সুরাহা হওয়া সম্ভব। অথচ তা করা হচ্ছে না। এ ছাড়া যাত্রী তোলার প্রতিযোগিতায় চালকরা হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। বেশি যাত্রী ওঠাতে বেপরোয় হয়ে ওঠেন। এক বাস আরেক বাসকে পেছনে ফেলতে পাল্লা দেয়। নির্ধারিত স্টপেজের বাইরে রাস্তার মাঝখানে যাত্রী ওঠানো-নামানো করে, অতিরিক্ত গতি ও ট্রাফিক আইন অমান্য করে। ফলে প্রায়ই ঘটছে দুর্ঘটনা। জানা গেছে, চালকদের দৈনিক নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা জমা দিতে হয়। এজন্য যাত্রী তোলার প্রতিযোগিতায় নামেন তাঁরা। নিরাপত্তার চেয়ে তখন আয়ই হয়ে ওঠে তাঁদের প্রধান বিবেচ্য। সড়ক আইন প্রয়োগের কার্যকারিতা না থাকায় এমন ঘটনা ঘটছে। দুর্ঘটনার জন্য দোষী চালক বিচারের আওতায় আসেন না। অপর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ, স্বল্প মজুরিও সড়কে বিশৃঙ্খলার অন্যতম কারণ। পরিবহন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব দুর্ঘটনার বড় অংশ সচেতনতা, জবাবদিহি এবং কঠোর নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে প্রতিরোধ করা সম্ভব। এর জন্য চালকদের প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করা, চুক্তিভিত্তিক মজুরি পদ্ধতির পরিবর্তে স্থায়ী বেতনব্যবস্থা চালু, ট্রাফিক আইন কঠোরভাবে বাস্তবায়ন এবং সড়কে আধুনিক নজরদারি ব্যবস্থা স্থাপন করা জরুরি। সেই সঙ্গে যাত্রীদের মধ্যেও সচেতনতা বাড়াতে হবে। তবেই আশা করা যায় ভোগান্তি কমার।