শারদীয় দুর্গাপূজা ও সাপ্তাহিক ছুটি মিলিয়ে টানা পাঁচ দিনের অবকাশ ঘিরে দেশের প্রধান পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে বাড়ছে আগাম বুকিং। কক্সবাজার, সিলেট, রাঙামাটি, বান্দরবান, খাগড়াছড়ি, কুয়াকাটা ও সুন্দরবনঘেঁষা রিসোর্টগুলোতে হোটেল-মোটেলের অধিকাংশ কক্ষ ইতোমধ্যে বুকিং হয়ে গেছে। কোথাও কোথাও ছুটির প্রধান দিনগুলোয় সব কক্ষই পূর্ণ। পর্যটকদের সম্ভাব্য চাপ সামাল দিতে আবাসন, পরিবহন ও নিরাপত্তাব্যবস্থা প্রস্তুত রাখছেন সংশ্লিষ্টরা।


কক্সবাজার২০ থেকে ২৪ অক্টোবরের ছুটিকে কেন্দ্র করে সমুদ্রসৈকত, পাহাড়, চা-বাগান ও বনাঞ্চল ঘুরে দেখার পরিকল্পনা করছেন ভ্রমণপিপাসুরা। এর সঙ্গে ২৩ ও ২৪ অক্টোবর কুয়াকাটায় দুই দিনব্যাপী পর্যটন কার্নিভাল যুক্ত হওয়ায় সেখানে বাড়তি আকর্ষণ তৈরি হয়েছে। দীর্ঘদিনের মন্দাভাব কাটিয়ে ব্যবসায় গতি ফেরার প্রত্যাশা করছেন পর্যটন খাতের উদ্যোক্তারা।


 


কক্সবাজার হোটেল-মোটেল ও গেস্ট হাউস মালিক সমিতির সভাপতি আবুল কাশেম সিকদার বলেন, এবারের ছুটিতে তারকা ও মাঝারি মানের হোটেল-মোটেলের ৯০ থেকে ৯৫ শতাংশ কক্ষ বুকিং হয়েছে। কিছু রিসোর্ট, গেস্ট হাউস ও কটেজে কক্ষ খালি থাকলেও শিগগিরই সেগুলো পূর্ণ হবে বলে আশা করছেন তিনি।


তারকা হোটেল ওশান প্যারাডাইস লিমিটেডের পরিচালক আবদুল কাদের মিশু জানান, তাঁদের হোটেলে ইতোমধ্যে ৯০ শতাংশ বুকিং হয়েছে। পর্যটকদের সেবা দিতে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি রয়েছে এবং ছুটির আগেই শতভাগ বুকিং পূর্ণ হবে বলে আশা করছেন তাঁরা।


 


সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, কক্সবাজার শহর ও আশপাশের ৫ শতাধিক হোটেল-মোটেল, রিসোর্ট, গেস্ট হাউস ও কটেজে প্রায় ১ লাখ ৭০ হাজার পর্যটকের রাতযাপনের ব্যবস্থা রয়েছে। তবে পর্যটকের চাপ বেড়ে গেলে আবাসনসংকট দেখা দিতে পারে। পরিবহন ব্যবসায়ীদের তথ্য অনুযায়ী, কক্সবাজারগামী বাসের অধিকাংশ টিকিট আগাম বিক্রি হয়েছে। ঢাকা-কক্সবাজার রেলপথের আসনও বুকিং হয়ে গেছে।


কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান বলেন, পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সৈকতে প্রতিমা বিসর্জন উৎসব শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন করতে প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। পর্যটকদের হয়রানি রোধ ও সেবা নিশ্চিত করতে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে একাধিক ভ্রাম্যমাণ আদালত মাঠে থাকবে। ট্যুরিস্ট পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. আজমল হোসেন জানান, জেলা পুলিশের সঙ্গে সমন্বয় করে পর্যটকদের নিরাপত্তায় একাধিক দল কাজ করবে।


কক্সবাজার


সিলেটে ৮০-৯০ শতাংশ কক্ষ বুকিং


পাহাড়, নদী, ঝরনা ও চা-বাগানের সৌন্দর্য উপভোগ করতে দুর্গাপূজার ছুটিতে সিলেটে পর্যটকদের ব্যাপক সমাগমের প্রত্যাশা করছেন ব্যবসায়ীরা। ইতোমধ্যে মানসম্পন্ন অধিকাংশ হোটেল-মোটেলের ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ কক্ষ বুকিং হয়েছে। অনুকূল আবহাওয়া ও স্থিতিশীল পরিস্থিতি বজায় থাকলে ছুটির পরও পর্যটকদের আনাগোনা অব্যাহত থাকতে পারে বলে তাদের ধারণা। সিলেট হোটেল মোটেল অ্যান্ড গেস্ট হাউস ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সুমাত নূরী জুয়েল বলেন, অধিকাংশ হোটেলের কক্ষ বুকিং শেষ হওয়ার পথে। গত দুই থেকে তিন মাস ধরেই সিলেটে পর্যটকদের আগমন তুলনামূলক বেশি। এবার পূজার ছুটিতেও ভালো ব্যবসার প্রত্যাশা করছেন তাঁরা। মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জের মানসম্পন্ন হোটেল, মোটেল ও গেস্ট হাউসেও একই ধরনের বুকিং চাপ রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।


পাহাড়ে আবাসনসংকটের আশঙ্কা


রাঙামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়িতে দুর্গাপূজার ছুটিতে পর্যটকদের বাড়তি উপস্থিতির প্রত্যাশায় হোটেল-মোটেল, রিসোর্ট ও বিনোদনকেন্দ্রগুলো প্রস্তুত করা হয়েছে। পাহাড়, লেক, ঝরনা ও মেঘের সৌন্দর্য উপভোগ করতে এসব গন্তব্যে ভ্রমণের পরিকল্পনা করছেন অনেকে।


রাঙামাটি পর্যটন হলিডে কমপ্লেক্সের ইউনিট ব্যবস্থাপক আলোক বিকাশ চাকমা বলেন, পর্যটকদের বরণ করতে সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। ঝুলন্ত সেতু সংস্কার, পরিচ্ছন্নতা এবং হোটেলের কক্ষ ও প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি মেরামত করা হয়েছে। তবে এবার পর্যটকদের জন্য বিশেষ ছাড়ের ব্যবস্থা রাখা হয়নি।


কাপ্তাই হ্রদে ভ্রমণের জন্য প্রায় ১০০টি ট্যুরিস্ট বোট প্রস্তুত রয়েছে। পর্যটন নৌযান ঘাটের ট্যুরিস্ট বোট ব্যবস্থাপক মো. ফকরুল ইসলাম বলেন, সব বোট মেরামত ও রং করে প্রস্তুত রাখা হয়েছে।


বান্দরবান হোটেল, মোটেল ও রিসোর্ট ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক জসিম উদ্দিন জানান, জেলার হোটেল-মোটেল ও রিসোর্টের ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ কক্ষ আগাম বুকিং হয়েছে। পর্যটকের সংখ্যা আরও বাড়লে আবাসনসংকট দেখা দিতে পারে।


পর্যটকদের যাতায়াত নির্বিঘ্ন রাখতে প্রায় ৪০০টি গাড়ি প্রস্তুত রেখেছেন পরিবহন ব্যবসায়ীরা। মাইক্রোবাস শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি মো. নুরুল ইসলাম বাচ্চু বলেন, পর্যটকদের সেবা দিতে তাঁরা প্রস্তুত রয়েছেন।


অন্যদিকে, সাজেক ভ্রমণকে কেন্দ্র করে খাগড়াছড়ির হোটেল-মোটেলগুলোতেও বুকিংয়ের চাপ বেড়েছে। সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের দাবি, সেখানকার হোটেল-মোটেলের সব কক্ষ ইতোমধ্যে বুকিং হয়েছে। আগাম বুকিং ছাড়া পর্যটক এলে আবাসন ব্যবস্থাপনায় চাপ তৈরি হতে পারে।


পাহাড়ি জেলাগুলোতে নিরাপত্তাব্যবস্থাও জোরদার করা হচ্ছে। রাঙামাটির পুলিশ সুপার মুহম্মদ আবদুল রকিব জানান, বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্রে ট্যুরিস্ট পুলিশ মোতায়েন থাকবে। বান্দরবানের পুলিশ সুপার মো. ওহাবুল ইসলাম খন্দকার বলেন, পর্যটকদের নিরাপদ ভ্রমণ ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।


কক্সবাজার


কার্নিভাল ঘিরে কুয়াকাটায় বাড়তি আকর্ষণ


দুর্গাপূজার ছুটির সঙ্গে পর্যটন কার্নিভাল যুক্ত হওয়ায় কুয়াকাটায় এবার রেকর্ডসংখ্যক পর্যটক সমাগমের প্রত্যাশা করছেন ব্যবসায়ীরা। ২৩ ও ২৪ অক্টোবরের আয়োজন ঘিরে হোটেল-মোটেল, রিসোর্ট, রেস্তোরাঁ ও পর্যটনকেন্দ্রিক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রস্তুতি চলছে।


ট্যুর অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব কুয়াকাটার (টোয়াক) সেক্রেটারি জেনারেল আসাদুজ্জামান মিরাজ বলেন, ২০ থেকে ২৪ অক্টোবর পর্যন্ত কুয়াকাটায় বিপুলসংখ্যক পর্যটক আসতে পারেন। সেখানে ৩ শতাধিক হোটেলে প্রায় ৫০ হাজার মানুষের থাকার ব্যবস্থা রয়েছে। বাড়তি চাপ সামাল দিতে আশপাশের পাঁচটি গ্রামের প্রায় ৬০০ পরিবারও প্রস্তুত রয়েছে।


কুয়াকাটা হোটেল-মোটেল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি এম এ মোতালেব শরীফ জানান, পর্যটকদের মানসম্মত সেবা দিতে হোটেল-মোটেলগুলো প্রস্তুত রাখা হচ্ছে।


কুয়াকাটা ট্যুরিস্ট পুলিশের পরিদর্শক নাজমুল হাসান বলেন, পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জেলা ও উপজেলা প্রশাসন, ট্যুরিস্ট পুলিশ এবং থানা পুলিশ সমন্বিতভাবে কাজ করবে। সৈকতসহ পর্যটকদের সমাগমস্থলে সার্বক্ষণিক নজরদারি থাকবে, যাতে কেউ হয়রানি বা অনাকাক্সিক্ষত পরিস্থিতির শিকার না হন।


সুন্দরবনঘেঁষা রিসোর্টেও কক্ষ পূর্ণ


খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরার সুন্দরবনসংলগ্ন ইকো কটেজ ও রিসোর্টগুলোতেও দুর্গাপূজার ছুটিতে ব্যাপক সাড়া মিলেছে। এসব এলাকায় প্রায় অর্ধশত ইকো কটেজ ও রিসোর্ট রয়েছে। ২০, ২১ ও ২২ অক্টোবরের জন্য অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের সব কক্ষ বুকিং হয়েছে। কোনো কোনো রিসোর্টে ২৩ ও ২৪ অক্টোবরের কক্ষও আগাম বুকিং রয়েছে। খুলনার পশ্চিম ঢাংমারীর জঙ্গলবাড়ি রিসোর্টের বুকিং ম্যানেজার তাহমিনা সুলতানা বলেন, ২০ থেকে ২২ অক্টোবরের সব কক্ষ আগেই বুকিং হয়েছে। ২৩ অক্টোবর দু-একটি কক্ষ খালি থাকলেও ২৪ অক্টোবরের সব কক্ষ বুকিং রয়েছে।


মোংলার অরণ্যবাড়ি রিসোর্টের বুকিং ম্যানেজার মেহেদী হোসেন জানান, ২০ থেকে ২২ অক্টোবরের সব কক্ষ আগেই বুকিং হয়েছে। ছুটির শেষ দুই দিনেও চাহিদা রয়েছে এবং অধিকাংশ কক্ষ বুকিং সম্পন্ন হয়েছে। দীর্ঘ ছুটিকে কেন্দ্র করে দেশের প্রধান পর্যটন গন্তব্যগুলোতে আগাম বুকিংয়ের ইতিবাচক চিত্র দেখা যাচ্ছে। এতে পর্যটন ব্যবসায় গতি ফেরার আশা তৈরি হলেও বাড়তি চাপ সামাল দিতে পর্যাপ্ত আবাসন, পরিবহন ও মানসম্মত সেবা নিশ্চিত করা জরুরি। পাশাপাশি পর্যটকদের নিরাপত্তা, পরিচ্ছন্নতা এবং হয়রানিমুক্ত ভ্রমণ নিশ্চিত করাই সংশ্লিষ্টদের প্রধান চ্যালেঞ্জ।