মায়ের সঙ্গে কারাগারে থেকে শৈশব কাটছে দেশের বিভিন্ন কারাগারে থাকা ২৯৮ থেকে ৩০৩ জন শিশুর। এসব শিশুর স্বাভাবিক বিকাশ, নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা নিশ্চিত করতে বিকল্প পারিবারিক যত্ন অথবা সরকারি শিশু পরিবারে পুনর্বাসনের সুপারিশ করেছে সমাজসেবা অধিদপ্তর। কোনো শিশুকে নিকটাত্মীয়ের কাছে পুনর্বাসন করা সম্ভব না হলে নিরাপদ আবাসন কেন্দ্রে রেখে তার লালনপালন ও শিক্ষার ব্যবস্থা করার প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছে।
সম্প্রতি হাইকোর্টের নির্দেশনার পরিপ্রেক্ষিতে তৈরি করা এ-সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন সংশ্লিষ্ট আইনজীবীর কাছে পাঠানো হয়েছে। প্রতিবেদনের একটি অনুলিপি বাংলাদেশ প্রতিদিনের হাতেও এসেছে।
এ বিষয়ে অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘শিশুরা সুস্থ ও স্বাভাবিকভাবে বেড়ে উঠবে, সেটাই প্রত্যাশা। তবে মায়ের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন করে তাদের বড় করা কতটা সমীচীন, সেটিও বিবেচনার বিষয়। একই সঙ্গে কারাগারে তাদের মানসিক বিকাশ কতটা হচ্ছে, তা দেখতে হবে। এ ক্ষেত্রে মা ও শিশুর স্বার্থের মধ্যে ভারসাম্য রেখে সরকারকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।’
প্রতিবেদনের বিষয়ে রিটকারী আইনজীবী কামরুন নাহার মাহমুদ (দীপা) সাংবাদিকদের জানান, মায়েদের সঙ্গে কারাগারে অবস্থান করলেও এসব শিশুর দেখভালের দায়িত্ব পালন করছে সমাজসেবা অধিদপ্তরের শিশু সুরক্ষা ইউনিট ও প্রবেশন শাখা। এ দুটি শাখা সমন্বিতভাবে প্রতিবেদনটি তৈরি করেছে। রিট আবেদনকারী হিসেবে তিনি প্রতিবেদনটির একটি অনুলিপি পেয়েছেন।
তিনি আরও জানান, অবকাশ ছুটির পর নিয়মিত বিচারিক কার্যক্রম শুরু হলে কারা অধিদপ্তরের মাধ্যমে প্রতিবেদনটি এখতিয়ারসম্পন্ন হাইকোর্ট বেঞ্চে দাখিল করা হতে পারে।
সমাজসেবা অধিদপ্তরের প্রতিবেদনে মাঠপর্যায়ের তথ্যের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, দেশের বিভিন্ন কারাগারে বন্দি মায়েদের সঙ্গে ২৯৮ থেকে ৩০৩ জন শিশু বসবাস করছে। এসব শিশুর প্রাথমিক বিকাশ ও সুরক্ষা নিশ্চিত করতে প্রবেশন কর্মকর্তাদের তত্ত্বাবধানে নিয়মিত খেলনা, পোশাক ও পুষ্টিকর শিশুখাদ্য সরবরাহ করা হচ্ছে। জাতীয় সমাজকল্যাণ পরিষদের অনুদান এবং সমাজের হৃদয়বান ব্যক্তিদের সহায়তায় এসব কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
তবে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, শিশু সুরক্ষা ইউনিটের আওতায় কারাগারে থাকা শিশুদের জন্য পৃথক কোনো কার্যক্রম নেই। এ পরিস্থিতিতে শিশুদের নিরাপত্তা, যত্ন-পরিচর্যা, শিক্ষা ও সার্বিক বিকাশ নিশ্চিত করতে বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, কারাগারে শিশুদের বেড়ে ওঠার পরিবেশ তাদের স্বাভাবিক শারীরিক ও মানসিক বিকাশের জন্য কতটা উপযোগী, তা বিবেচনায় নেওয়া জরুরি। একই সঙ্গে মায়ের সঙ্গে শিশুর সম্পর্ক, শিশুর সর্বোত্তম স্বার্থ এবং নিরাপদ পারিবারিক পরিবেশে বেড়ে ওঠার সুযোগ নিশ্চিত করার বিষয়েও গুরুত্ব দিতে হবে।
এ বিষয়ে আইনি পদক্ষেপের সূত্রপাত হয় গত ৮ মে একটি জাতীয় দৈনিকে ‘কারাগারে বিপন্ন শৈশব’ শিরোনামে প্রতিবেদন প্রকাশের মধ্য দিয়ে। ওই প্রতিবেদন যুক্ত করে পরদিন হাইকোর্টে রিট করেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী কামরুন নাহার মাহমুদ (দীপা)।
গত ১৫ জুন রিটের প্রাথমিক শুনানি শেষে হাইকোর্ট রুলসহ আদেশ দেন। আদেশে বিভিন্ন অপরাধে জড়িত বা দণ্ডিত মায়েদের সঙ্গে কারা হেফাজতে কত শিশু রয়েছে, কোন কারাগারে কত শিশু অবস্থান করছে, তাদের বয়স কত, কী পরিবেশে তাদের রাখা হচ্ছে এবং শিশুদের পরিচর্যায় কারাগারভিত্তিক কী ব্যবস্থা রয়েছে—এসব তথ্য উল্লেখ করে দুই মাসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে কারা অধিদপ্তরের মহাপরিদর্শককে নির্দেশ দেওয়া হয়।
শিশুদের নিরাপদ শৈশব নিশ্চিত করতে এখন বিকল্প পরিচর্যা ও পুনর্বাসনের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনার সুপারিশ করা হয়েছে। তবে মায়ের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন না করে কীভাবে শিশুদের সর্বোত্তম স্বার্থ, নিরাপত্তা, শিক্ষা ও মানসিক বিকাশ নিশ্চিত করা যায়, সে বিষয়ে সমন্বিত সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রয়োজনীয়তাও উঠে এসেছে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্যে।