চার মাস পার হলেও নিয়ন্ত্রণে আসেনি হাম। এই চার মাসেই হাম ও এর উপসর্গ কেড়ে নিয়েছে ৭৬৬ শিশুর প্রাণ। সরকার দ্রুত উদ্যোগ নিয়ে টিকা ক্যাম্পেইন চালালেও থামানো যাচ্ছে না সংক্রামক এই ব্যাধিকে। হাম প্রতিরোধে লক্ষ্যমাত্রার বেশি শিশুকে টিকা দিয়েছে স্বাস্থ্য বিভাগ। কিন্তু টিকা ক্যাম্পেইনের হিসাবে অনেক শিশু বাদ পড়ায় হাম প্রতিরোধ হচ্ছে না বলে দায়ী করছেন জনস্বাস্থ্যবিদরা।
এ বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডা. বে-নজির আহমেদ বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘হামে ৯৫ ভাগ শিশুকে টিকা দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হয়নি। প্রায় ৪০ লাখ শিশুকে টিকার হিসাবে ধরা হয়নি। তাহলে লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হবে কীভাবে? সাধারণত লক্ষ্যমাত্রা সঠিকভাবে নির্ধারণ করে টিকা দিলে ১৫-২০ দিনে সংক্রামক রোগ হাম নিয়ন্ত্রণে আসার কথা। কিন্তু এখনো হামে শিশুর মৃত্যু ঘটছে, আক্রান্ত হচ্ছে। এটা হতাশাজনক। জাতীয় কর্মসূচিতে ভুল লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করায় এত শিশুর মৃত্যু ঘটল।’
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রতিবেদনে জানা যায়, গত ২৪ ঘণ্টায় (গত সোমবার সকাল ৮টা থেকে গতকাল সকাল ৮টা) হামের উপসর্গে ছয় শিশু এবং হামে এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। গত ১৫ মার্চ থেকে দেশে শুরু হয়েছে হামের সংক্রমণ। এই চার মাসে হাম ও হামের উপসর্গে আক্রান্ত হয়েছেন ১ লাখ ২৬ হাজার ৯৭৯ শিশু, মারা গেছে ৭৬৬ শিশু।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের গত ১৩ জুলাই এর তথ্য অনুযায়ী, দেশব্যাপী চলমান হাম-রুবেলা ক্যাম্পেইনে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অতিক্রম করে এ পর্যন্ত ১ কোটি ৮৪ লাখ ৭৯ হাজার ৩৮৩ জন শিশুকে টিকা দেওয়া হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ক্যাম্পেইনে মোট ১ কোটি ৮০ লাখ ১৫ হাজার ৬৪ জন শিশুকে টিকার আওতায় আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল। সে হিসাবে জাতীয়ভাবে টিকাদানের কভারেজ দাঁড়িয়েছে ১০৩ শতাংশ।
প্রায় সব বিভাগেই লক্ষ্যমাত্রা পূরণ বা অতিক্রম করা হয়েছে। সবচেয়ে বেশি কভারেজ অর্জন করেছে চট্টগ্রাম বিভাগ। যেখানে ৪২ লাখ ৯৬ হাজার ২১৮ জনের লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে টিকা পেয়েছে ৪৪ লাখ ৫২ হাজার ৯৯২ জন, যা ১০৪ শতাংশ। ঢাকা, রাজশাহী ও রংপুর বিভাগে কভারেজ হয়েছে ১০৩ শতাংশ এবং ময়মনসিংহ বিভাগে ১০২ শতাংশ। বরিশাল ও খুলনা বিভাগে টিকাদান কভারেজ ১০১ শতাংশ হলেও সিলেট বিভাগে লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় কিছুটা কম অগ্রগতি হয়েছে। সেখানে ১৩ লাখ ২৩ হাজার ৯৬৬ জনের লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে টিকা পেয়েছে ১৩ লাখ ১৬ হাজার ৪৫৪ জন শিশু, যা ৯৯ শতাংশ কভারেজ।
সিটি করপোরেশন এলাকাগুলোতেও টিকা দেওয়া হয়েছে। মোট ১৯ লাখ ৫ হাজার ৯৫০ জন শিশুকে টিকা দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে ইতোমধ্যে টিকা পেয়েছে ২০ লাখ ৩১ হাজার ৬৬৪ জন।
ফলে সিটি করপোরেশন এলাকায় সামগ্রিক কভারেজ দাঁড়িয়েছে ১০৭ শতাংশ। বিশেষ করে গাজীপুর ও ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে টিকাদান কভারেজ যথাক্রমে ১১৪ ও ১১০ শতাংশে পৌঁছেছে, যা জাতীয় গড়ের চেয়েও বেশি।
সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) আওতায় দেশে নিয়মিত টিকা কার্যক্রমে শিশুর ৯ মাস বয়সে হামের টিকার প্রথম ডোজ দেওয়া হয়। হামের টিকার দ্বিতীয় ডোজ দেওয়া হয় শিশুর ১৫ মাস বয়সে। কিন্তু হাম-রুবেলার জাতীয় ক্যাম্পেইন শুরু হওয়ার আগে সরকার সিদ্ধান্ত নেয় টিকা দেওয়া হবে ৬ মাস থেকে ৫ বছর বয়সি দেশের সব শিশুকে। ইপিআইয়ের হিসাবে দেশে এই বয়সি শিশু আছে ১ কোটি ৮০ লাখ ১৫ হাজার ৬৪ জন।
তবে ২৮ জুন দেশব্যাপী ভিটামিন ‘এ’ ক্যাম্পেইন শুরু হওয়ার পর একই বয়সি শিশুদের সংখ্যা নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। ভিটামিন এ ক্যাপসুল খাওয়ানো হচ্ছে ৬ মাস বয়স থেকে ৫ বছর বয়সি শিশুদের। এ ক্ষেত্রে ২ কোটি ২৬ লাখ শিশুকে লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করা হয়েছে। ভিটামিন এ এবং হাম-রুবেলার ক্ষেত্রে একই বয়সি শিশুদের সংখ্যায় পার্থক্য ৪৬ লাখ। এ শিশুরা টিকা কর্মসূচির হিসাবেই নেই।
এ বিষয়ে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘যে পদ্ধতি প্রয়োগ করা হয়েছে তাতে নিয়ন্ত্রণে আনা কঠিন। মহামারী যেভাবে মোকাবিলা করা হয় সেভাবে কাজ করতে হবে। প্রাইমারি কেয়ার, সেকেন্ডারি এবং আইসিইউ এভাবে স্তরবিন্যাস করে সেবা দিতে হবে।
কমিউনিটি পর্যায়ে অপুষ্টির শিকার শিশুদের শনাক্ত করে আইসোলেশন করতে হবে। নয়তো দেখা যাচ্ছে একদিকে টিকা দিচ্ছে আরেক দিকে শিশুরা আক্রান্ত হচ্ছে।’
তিনি আরো বলেন, ‘টিকা দেওয়ার জন্য মাইক্রোপ্ল্যানের প্রয়োজন হয়। কিন্তু সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ায় এই টিকা ক্যাম্পেইনে সরকার পরিকল্পনা করার সময় পায়নি। তাই বাড়ি বাড়ি গিয়ে কাজ না করলে দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়া হামের এই সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ করা মুশকিল।’