পুরান ঢাকার তাঁতীবাজার। সকাল গড়াতেই স্বর্ণের দোকানগুলোতে ক্রেতাদের আনাগোনা বাড়ে। সোনার অলংকার কেনাবেচার পাশাপাশি চলে নগদ টাকার লেনদেনও। বাইরে থেকে দেখলে সবই স্বাভাবিক। কিন্তু পুলিশের তদন্তকারীদের ভাষ্য, এই ব্যস্ত বাণিজ্যিক এলাকার একটি স্বর্ণের দোকান কয়েক বছর ধরে ব্যবহার হয়েছে মানব পাচার ও হুন্ডি চক্রের অর্থ লেনদেনের কেন্দ্র হিসেবে। অভিযোগ, লিবিয়ায় জিম্মি করে নির্যাতনের শিকার বাংলাদেশিদের মুক্তিপণের টাকা দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে এসে জমা হতো এই দোকানে। এরপর সেই অর্থ ব্যাংক হিসাব থেকে ব্যাংক হিসাবে ঘুরে, একাধিক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের আড়ালে লেয়ারিংয়ের মাধ্যমে বৈধ অর্থের সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া হতো।
পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) দীর্ঘ অনুসন্ধান শেষে যে তদন্ত প্রতিবেদন প্রস্তুত করেছে, তাতে উঠে এসেছে প্রায় ৩৭৬ কোটি ৫০ লাখ টাকার লেনদেনের তথ্য। তদন্তে ৩৪ জন ব্যক্তি এবং তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন ১৮টি প্রতিষ্ঠানের আর্থিক লেনদেন বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
লিবিয়ার মরুভূমি থেকে শুরু : সিআইডির এসআই মিজানুর রহমানের ভাষ্য অনুযায়ী, চক্রটির কার্যক্রম শুরু হতো বাংলাদেশ থেকেই। বিদেশে ভালো বেতনের চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে তরুণদের লিবিয়ায় পাঠানো হতো। সেখানে পৌঁছানোর পর তাদের একটি অংশকে বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠী বা চক্রের কাছে তুলে দেওয়া হতো। এরপর শুরু হতো নির্যাতন। পরিবারের সদস্যদের কাছে মোবাইল ফোনে কান্নার শব্দ, নির্যাতনের ভিডিও কিংবা জীবনভিক্ষার আকুতি পাঠানো হতো। একটাই দাবি, মুক্তিপণের টাকা। তদন্তকারীদের দাবি, পরিবারের সদস্যরা সন্তানের প্রাণ বাঁচাতে শেষ সম্বল বিক্রি করেও টাকা জোগাড় করতেন।
মুক্তিপণের টাকার গন্তব্য : সিআইডির অনুসন্ধানে বলা হয়েছে, মুক্তিপণের অর্থ সংগ্রহের জন্য রাজধানীর তাঁতীবাজারের ‘সততা জুয়েলার্স’ (বর্তমান নাম কাজী গোল্ড হাউস) ব্যবহার করা হতো। প্রবাসীদের স্বজনদের কেউ নগদ টাকা দোকানে জমা দিতেন। আবার কাউকে নির্দিষ্ট ব্যাংক হিসাব নম্বর দেওয়া হতো। এসআই মিজানুর রহমান বলেন, দোকানটি কার্যত একটি ‘হুন্ডি হাউস’ হিসেবে ব্যবহৃত হতো। সেখান থেকে টাকা বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের হিসাবে ছড়িয়ে দেওয়া হতো। পরে হুন্ডির মাধ্যমে বিদেশে অর্থ সমন্বয় কিংবা দেশের ভিতরে বিতরণের কাজ সম্পন্ন করা হতো। লিবিয়াফেরত আফজাল হোসেন, শেখ সজিব ও জনি শেখের ভাষ্য, লিবিয়ায় মাফিয়া চক্র গড়ে তুলে জিম্মি করে অর্থ আদায় করত, আর যারা টাকা দিতে পারতেন না তাদের ওপর চালাত অমানবিক নির্যাতন।
যার নাম সামনে : সিআইডির প্রতিবেদনে কাজী মো. বেলাল হোসেনকে এই নেটওয়ার্কের অন্যতম সমন্বয়কারী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। অনুসন্ধানে বলা হয়েছে, তার বাড়ি কুমিল্লার দাউদকান্দি উপজেলায়। তবে তিনি দীর্ঘদিন ধরে সংযুক্ত আরব আমিরাতে অবস্থান করে পুরো নেটওয়ার্ক পরিচালনা করতেন বলে অভিযোগ রয়েছে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, তিনি নিয়মিত দুবাইপ্রবাসী কয়েকজন সহযোগীর সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন। ঢাকার স্বর্ণের দোকানটি ব্যবহার করে দেশে মুক্তিপণের টাকা সংগ্রহ এবং হুন্ডির মাধ্যমে অর্থ স্থানান্তরের কাজ সমন্বয় করতেন। তদন্তে দাবি করা হয়েছে, গত কয়েক বছরে তিনি অন্তত ২৫ থেকে ৩২ বার বিদেশ সফর করেছেন।
খুলনায় সম্পদের বিস্তার : সিআইডির তদন্ত কর্মকর্তারা বলছেন, এই চক্রের সঙ্গে খুলনার কয়েকজন ব্যক্তির সম্পৃক্ততার অভিযোগও রয়েছে। সিআইডির ভাষ্য অনুযায়ী, খুলনার সোনাডাঙ্গা, তেরখাদা ও রূপসা এলাকার কয়েকজন ব্যক্তি দীর্ঘদিন ধরে চক্রটির অর্থ সংগ্রহ ও স্থানান্তরের কাজে যুক্ত ছিলেন। অভিযোগ রয়েছে, এ অর্থ দিয়ে খুলনাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বাড়ি, জমি ও অন্যান্য সম্পদ গড়ে তোলা হয়েছে। তবে এসব সম্পদের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আদালতের বিচারিক প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভর করবে।
৩৭৬ কোটি টাকার হিসাব : পুলিশের তদন্তের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হচ্ছে আর্থিক বিশ্লেষণ। সিআইডির ফিন্যান্সিয়াল ক্রাইম ইউনিট ২০২০ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৩ সালের মে পর্যন্ত ৩৪ জন ব্যক্তি এবং ১৮টি প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাব বিশ্লেষণ করে। সেখানে প্রায় ৩৭৬ কোটি ৫০ লাখ ৫৪ হাজার ৯৬৬ টাকা জমা ও উত্তোলনের তথ্য পাওয়া গেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তদন্ত কর্মকর্তাদের ধারণা, এসব লেনদেনের বড় অংশের সঙ্গে মানব পাচার, মুক্তিপণ ও হুন্ডি কার্যক্রমের যোগসূত্র রয়েছে।