চলন্ত ট্রেনে পাথর দিয়ে ঢিল মারার ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বেড়েই চলেছে। নানান উদ্যোগ, সচেতনতামূলক প্রচার এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরদারি সত্ত্বেও এই প্রবণতা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হচ্ছে না। প্রায়ই চলন্ত ট্রেনের জানালায় পাথর ছুড়ে মারার ঘটনায় যাত্রী আহত হচ্ছেন, ভেঙে যাচ্ছে ট্রেনের কাচ, এমনকি ঘটছে প্রাণহানির মতো মর্মান্তিক ঘটনাও। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, দেশের বিভিন্ন রেলপথে বিশেষ করে জনবসতির পাশ দিয়ে চলা অংশে ট্রেনে পাথর নিক্ষেপের ঘটনা বেশি ঘটে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কিশোর বা দুর্বৃত্তরা কৌতূহলবশত দুষ্টুমি কিংবা উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে এসব ঘটনা ঘটায়। ফলে যাত্রীরা আতঙ্ক নিয়ে ভ্রমণ করতে বাধ্য হচ্ছেন। সম্প্রতি একাধিক ঘটনায় চলন্ত ট্রেনের জানালার কাচ ভেঙে বেশ কয়েকজন যাত্রীর মাথা, মুখ ও চোখে গুরুতর আঘাত লাগে। অনেককে হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে হয়েছে। এসব ঘটনায় যাত্রীদের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা আরও বেড়েছে। সর্বশেষ গত ২৩ জুন রাত দেড়টার দিকে দুর্বৃত্তদের ছোড়া পাথরের আঘাতে চোখ হারিয়েছেন আয়কর আইনজীবী শ্যামল চন্দ্র দাস (৪৫)। চট্টগ্রামগামী তূর্ণা এক্সপ্রেস ব্রাহ্মণবাড়িয়ার তালশহর স্টেশন অতিক্রম করার সময় এই পাথর নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে।
কক্সবাজার এক্সপ্রেস ট্রেনে চড়ে গত ২৭ এপ্রিল ঢাকা ফিরছিলেন হিমেল আহমেদ (২৫) ও মোহাম্মদ আবু সাঈদ নামে দুই পর্যটক। ট্রেনটি চকরিয়া এলাকা অতিক্রম করার সময় বাইরে থেকে পাথর ছুড়ে মারা হয়। পাথরের আঘাতে দুজনই আহত হন। তাঁদের চট্টগ্রাম রেলওয়ে স্টেশনে চিকিৎসা দেওয়া হয়। একই বগিতে থাকা আহত দুজনের বন্ধু সাইদুল ইসলাম জানান, তাঁরা ১৮ জনের একটি দল দিনাজপুরের বিরামপুর থেকে কক্সবাজারে বেড়াতে গিয়েছিলেন। ফেরার পথে এ ঘটনা ঘটে। হিমেলের চারটি দাঁত ভেঙে যায় এবং নিচের ঠোঁটের ভিতরের অংশ ফেটে যায়। তাঁর তিনটি সেলাই লেগেছে। আবু সাঈদ ঘাড়ে গুরুতর আঘাত পান। আহত ব্যক্তিরা নন-এসি চেয়ার কোচে বসা ছিলেন। এর আগে ৩ মার্চ রাতে রামু এলাকায় বাইরে থেকে দুর্বৃত্তের ছোড়া পাথরে মাথায় আঘাত পান এক যাত্রী। ২ মার্চ রাতেও চকরিয়ার ডুলাহাজারা এলাকায় পাথরের আঘাতে গুরুতর আহত হন ছাবের আহমেদ (৫২) নামে এক রেলকর্মী। শুধু এসব ঘটনাই নয়, কক্সবাজার-চট্টগ্রাম রেলপথে ট্রেনে পাথর নিক্ষেপ এখন আতঙ্কের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। রেলওয়ের তথ্য বলছে, এক বছরে কক্সবাজার চট্টগ্রাম রেলপথে অন্তত ৩০ বার চলন্ত ট্রেনে পাথর ছোড়া হয়েছে। পাথরের আঘাতে আহত হয়েছেন অন্তত ২০ যাত্রী। বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক আফজাল হোসেন বলেন, ট্রেনে পাথর নিক্ষেপ একটি ফৌজদারি অপরাধ। এ ধরনের ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার চেষ্টা চলছে। পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে টহল জোরদার, স্থানীয় প্রশাসনের সহযোগিতা এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে অনেক ঘটনায় অপরাধীদের শনাক্ত করা কঠিন হওয়ায় কার্যকরভাবে এ প্রবণতা বন্ধ করা যাচ্ছে না। নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, শুধু আইন প্রয়োগ করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। স্থানীয় জনগণ, অভিভাবক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সামাজিক সংগঠনকে সম্পৃক্ত করে সচেতনতা বাড়াতে হবে। শিশু-কিশোরদের বোঝাতে হবে যে একটি ছোট পাথরও চলন্ত ট্রেনের যাত্রীর জন্য প্রাণঘাতী হতে পারে। বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, যাত্রীরা দ্রুত এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান চান। ঝুঁকিপূর্ণ রেলপথে নজরদারি বাড়ানো, প্রয়োজনীয় স্থানে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন, নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ অভিযান পরিচালনা এবং অপরাধীদের দ্রুত বিচারের আওতায় আনতে হবে। একই সঙ্গে জনসচেতনতামূলক প্রচার জোরদার করা হলে ট্রেনে পাথর নিক্ষেপের মতো বিপজ্জনক প্রবণতা অনেকটাই কমিয়ে আনা সম্ভব হবে।