ঘড়ির কাঁটায় বেলা ১১টা। যানবাহনের চাপে ব্যস্ত সিরাজগঞ্জের হাটিকুমরুল মহাসড়ক। ৩ এপ্রিল নলকায় হঠাৎ রংপুর থেকে ময়মনসিংহগামী বুশরা পরিবহনের একটি বাস নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে প্রথমে সড়ক বিভাজকে উঠে যায়। পরে একটি ওভারপাসের পিলারের সঙ্গে সজোরে ধাক্কা লাগলে ঘটনাস্থলেই দুই যাত্রীর মৃত্যু হয়। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরও একজন মারা যান। আহত হন অন্তত ১০ জন। দেশের অন্যতম ব্যস্ত সিরাজগঞ্জ, পাবনা, বগুড়া, রাজশাহী মহাসড়কে প্রায় প্রতিনিয়তই দুর্ঘটনায় ঝরছে প্রাণ। গত ছয় মাসে এ চার মহাসড়কে ১৭৮ দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছে ১৭৬ জন। প্রতিদিন হাজার হাজার বাস, ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান, অ্যাম্বুলেন্স, পণ্যবাহী যান ও ব্যক্তিগত গাড়ি চলাচল করে এ চার মহাসড়কে। কিন্তু দুর্ঘটনার কবলে দেশের অর্থনীতির এই গুরুত্বপূর্ণ করিডর পরিণত হচ্ছে মরণফাঁদে। হাইওয়ে পুলিশ বগুড়া রিজিওনের সড়ক দুর্ঘটনার ছয় মাসের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, এ বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত সিরাজগঞ্জের হাটিকুমরুল, বগুড়া, পাবনা এবং রাজশাহী মহাসড়কে বিভিন্ন যানবাহনের সঙ্গে সংঘর্ষে ১৭৮টি দুর্ঘটনা ঘটেছে। এতে মারা গেছে ১৭৬ জন, আহত হয়েছে ১৭৪ জন। নিহতের মধ্যে পুরুষ ১৩০, নারী ৩৪ ও ১২ শিশু রয়েছে।
এসব দুর্ঘটনার কারণ বিষয়ে হাইওয়ে পুলিশ বগুড়া রিজিওনের পুলিশ সুপার আবু তোরাব মো. শামছুর রহমান বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘বেশ কিছু কারণে মহাসড়কে প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা ঘটে। এর মধ্যে রয়েছে অতিরিক্ত গতি, ওভারটেকিং ও ধীরগতির গাড়ি। অনেক সময় বিকল যানবাহন রাস্তাতেই মেরামত করা হয়। তখন পেছন থেকে গাড়ি এসে ধাক্কা দিলে দুর্ঘটনা ঘটে। দীর্ঘ সময় গাড়ি চালিয়ে চালক ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়লে দুর্ঘটনা ঘটে। এ ছাড়া ফুটওভার ব্রিজ না থাকলে কিংবা অসচেতনতার কারণে পথচারী সড়ক পার হতে গিয়ে দুর্ঘটনার শিকার হন।’ তিনি আরও বলেন, ‘দুর্ঘটনায় মৃত্যু প্রতিরোধে বেশ কিছু পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। চালকদের প্রশিক্ষণ, পথচারীদের নিরাপদ পারাপারের জন্য ফুটওভার ব্রিজ, আন্ডারপাস কিংবা ওভারপাস নির্মাণ। গাড়ি চালানোর সময় সড়কের গতিসীমা মেনে চলা, চালকদের কর্মঘণ্টা নির্দিষ্ট করা, দূরপাল্লার গাড়িতে একাধিক চালক রাখা এবং সড়ক-ফুটপাত দখলমুক্ত রাখা প্রয়োজন।’ পরিবহন বিশেষজ্ঞরা বলেন, দুর্ঘটনার পর তদন্ত কমিটি হয়, সুপারিশও দেওয়া হয়। কিন্তু কয়েক সপ্তাহ পেরোতেই সবকিছু আবার আগের অবস্থায় ফিরে যায়। ফলে যে কারণে গত মাসে দুর্ঘটনা ঘটেছে, একই কারণে আবারও প্রাণ ঝরে। অধিকাংশ ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটে মুখোমুখি সংঘর্ষ, নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে খাদে পড়ে যাওয়া কিংবা দ্রুতগতির বাসের পেছনে ধাক্কার ঘটনায়। এসব দুর্ঘটনার প্রায় সব ক্ষেত্রেই চালকের ভুল সিদ্ধান্ত বড় ভূমিকা রাখে। সিরাজগঞ্জ থেকে রাজশাহী, পাবনা কিংবা গাইবান্ধামুখী বাসগুলোর মধ্যে আগে পৌঁছানোর অলিখিত প্রতিযোগিতা রয়েছে বলে অভিযোগ পরিবহনসংশ্লিষ্টদের। ফলে নির্ধারিত গতিসীমা উপেক্ষা করে অনেক চালক ঘণ্টায় ৯০ থেকে ১০০ কিলোমিটার বা তারও বেশি গতিতে গাড়ি চালান। উচ্চগতিতে সামান্য ভুলও বড় দুর্ঘটনায় পরিণত হয়।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক পরিবহন বিশেষজ্ঞ ড. সামছুর রহমান বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘সিরাজগঞ্জ, বগুড়া, পাবনা, রাজশাহী এ মহাসড়কগুলো আগের তুলনায় অনেক উন্নত হয়েছে। কিন্তু অর্থ খরচ করে দ্রুতগতির রাস্তা বানালেও তা অর্থনীতিতে ভূমিকা রাখতে পারছে না। রাস্তায় যানবাহন চলাচলের পরিবেশ, চালকের প্রশিক্ষণ, গাড়ির ফিটনেস নিশ্চিত করতে না পারায় ঘটছে দুর্ঘটনা। মহাসড়কে উল্টোপথে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে বাংলার টেসলা (অটোরিকশা)। এসব কারণে দুর্ঘটনায় প্রাণ হারাচ্ছে মানুষ।’ তিনি আরও বলেন, ‘পাঁচ ঘণ্টার বেশি চালকের গাড়ি চালানোর নিয়ম নেই। মহাসড়কে চালানোর যোগ্যতা চালকের রয়েছে কি না সে বিষয় যাচাই করা জরুরি। এসব বিষয়ে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) নজরদারি করার কথা থাকলেও তাদের কোনো তদারকি নেই। এত গলদ রেখে উন্নয়ন করলে কখনো ফল পাওয়া যাওয়া না।’
পরিবহনসংশ্লিষ্টরা বলেন, উন্নত সড়ক নির্মাণের সঙ্গে কার্যকর গতিনিয়ন্ত্রণ না থাকলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়। ওভারটেকিংয়ের জন্য কয়েক সেকেন্ডে শেষ হয়ে যায় বহু জীবন। দুই মহাসড়কের সবচেয়ে বড় ঝুঁকিগুলোর একটি হচ্ছে বিপজ্জনক ওভারটেকিং। ধীরগতির ট্রাক বা অন্য যানবাহনকে অতিক্রম করতে গিয়ে অনেক বাস বিপরীত লেনে উঠে পড়ে। সামনাসামনি আরেকটি যানবাহন চলে এলে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই ঘটে ভয়াবহ সংঘর্ষ। দীর্ঘ পথে বিরতিহীন গাড়ি চালানোর কারণে চালকদের মধ্যে ক্লান্তি ও তন্দ্রা তৈরি হচ্ছে। পরিবহনশ্রমিকদের অভিযোগ, একই চালককে দিনে একাধিক ট্রিপ সম্পন্ন করতে হয়। পর্যাপ্ত বিশ্রাম ছাড়াই আবার নতুন যাত্রায় বের হতে হয়। কয়েক সেকেন্ডের ‘মাইক্রো স্লিপ’ বা ক্ষণিকের ঘুমই একটি দ্রুতগতির বাসকে কয়েক শ মিটার চালকবিহীন অবস্থায় এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে। আর সে সময়ই ঘটে প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা।