ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আসাদুজ্জামানের পদত্যাগ দাবিতে তাঁর কার্যালয়ে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করেছেন চিকিৎসক ও শিক্ষার্থীদের একাংশ। প্রায় দুই ঘণ্টা পরিচালকের কক্ষে অবস্থান করে তারা ‘দফা এক, দাবি এক, পরিচালকের পদত্যাগ’সহ বিভিন্ন স্লোগান দেন।


এ নিয়ে হাসপাতালে দেখা দেয় অস্থিরতা।


এদিকে একই সময়ে এক কর্মচারীকে মারধরের অভিযোগের বিচার ও দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিতে তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের পাল্টা অবস্থানে হাসপাতালের প্রশাসনিক এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। দুই পক্ষের মুখোমুখি অবস্থানে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে রোগী ও স্বজনদের মধ্যে। গতকাল দুপুর ১২টা থেকে ২টা পর্যন্ত এ পরিস্থিতি চলে। পরে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. কামরুজ্জামান চৌধুরী, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ভারপ্রাপ্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস এবং ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ড্যাব) মহাসচিব ডা. মো. জহিরুল ইসলাম শাকিলের হস্তক্ষেপে চিকিৎসক ও শিক্ষার্থীরা পরিচালকের কক্ষ থেকে বেরিয়ে যান। পরে কর্মচারীরাও অবস্থান প্রত্যাহার করেন।


চিকিৎসক ও শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নিয়োগ পাওয়া বর্তমান পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আসাদুজ্জামান দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত। জুলাই আন্দোলনের সময় আহত শিক্ষার্থীদের চিকিৎসা দিতেও বাধা দিয়েছেন তিনি। এ ছাড়া প্রশাসনিক কর্মকর্তা রেজাউল ইসলামের বদলি এবং বদলি হয়ে আসা মোজাম্মেল হকের ঢামেকে যোগদান ঠেকানোর বিষয়টি নিয়েও পরিচালকের বিরুদ্ধে ক্ষোভ রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে পরিচালকের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।


হাসপাতাল সূত্র জানায়, প্রশাসনিক কর্মকর্তা রেজাউল ইসলামের বদলি নিয়ে চিকিৎসকদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়। চিকিৎসকদের অভিযোগ, বদলি হয়ে আসা প্রশাসনিক কর্মকর্তা মোজাম্মেল হককে ঢামেকে যোগদান করতে দেওয়া হচ্ছে না। এ ঘটনায় তারা পরিচালকের পদত্যাগ এবং মোজাম্মেল হককে যোগদানের সুযোগ দেওয়ার দাবি জানান। বিক্ষোভে অংশ নেওয়া চিকিৎসক ও ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ডা. সাইফুল আলম বাদশা অভিযোগ করেন, জুলাই আন্দোলনের সময় পরিচালক আহতদের চিকিৎসাসেবা দিতে চিকিৎসকদের বাধা দিয়েছিলেন। পরিচালক পদত্যাগ না করা পর্যন্ত অবস্থান কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার কথাও জানান তিনি।


এদিকে পরিচালকের পদত্যাগ চেয়ে চিকিৎসক-শিক্ষার্থীদের অবস্থানের মধ্যেই হাসপাতালের তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের একটি অংশ পরিচালকের কার্যালয়ের বাইরে অবস্থান নেন। তাদের অভিযোগ, গত সোমবার হাসপাতালের তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারী মো. হানিফকে মারধর করা হয়েছে। এ ঘটনার বিচার ও দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিতে তারা পরিচালকের কাছে স্মারকলিপি দিতে আসেন। ঢামেক হাসপাতালের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী সমিতির সভাপতি মো. আজিম বলেন, ‘হানিফকে কেন মারধর করা হলো, আমরা এর বিচার চাই। সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করে দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে।’ তবে চিকিৎসকরা পরিচালকের কক্ষে অবস্থান নেওয়ায় কর্মচারীরা স্মারকলিপি দিতে পারেননি বলে জানান তিনি। দুই পক্ষের পাল্টাপাল্টি অবস্থানে হাসপাতালের প্রশাসনিক এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়লে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়। চিকিৎসক-কর্মচারীদের পাল্টাপাল্টি অবস্থান, স্লোগান ও উত্তেজনায় হাসপাতালজুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন চিকিৎসা নিতে আসা রোগী ও তাদের স্বজনরা। পরিস্থিতির কারণে বহির্বিভাগে চিকিৎসা নিতে আসা অনেক রোগী চিকিৎসা না নিয়েই ফিরে যান। তবে জরুরি বিভাগ ও হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের চিকিৎসাসেবা স্বাভাবিক ছিল। কেরানীগঞ্জ থেকে চিকিৎসা নিতে আসা লিয়াকত আলী বলেন, ‘চিকিৎসা নিতে এসে দেখি চিকিৎসক-কর্মচারীদের মধ্যে উত্তেজনা। চারদিকে স্লোগান ও হইচইয়ে আমরা আতঙ্কিত হয়ে পড়ি। কী হচ্ছে, বুঝতে পারছিলাম না। শেষ পর্যন্ত বহির্বিভাগে চিকিৎসা না নিয়েই ফিরে যেতে হচ্ছে।’


অপরদিকে গতকাল দুপুরে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে বৈঠক শেষে স্বাস্থ্য সচিব মো. কামরুজ্জামান চৌধুরী জানান, সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো নিয়ে মন্ত্রণালয়ে বৈঠক হবে। আশা করা হচ্ছে, দ্রুত সংকটের সমাধান হবে। তবে পরিচালককে ঘিরে চিকিৎসকদের একাংশ ও শিক্ষার্থীদের ক্ষোভ এবং কর্মচারীকে মারধরের অভিযোগ, দুই ইস্যুর সমাধানেই এখন মন্ত্রণালয়ের বৈঠকের দিকে তাকিয়ে সংশ্লিষ্টরা।