সীমানার ইঞ্চিখানেক জমি, পৈতৃকভিটার ভাগ কিংবা রাজনৈতিক আধিপত্য- তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে একের পর এক সংঘাতের সৃষ্টি হচ্ছে। জমিজমা ও সম্পত্তিসংক্রান্ত বিরোধের জের ধরে গত দেড় বছরে দেশের ১৭টি জেলায় ২৪টি পৃথক হত্যাকাণ্ডে প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ৩০ জন। এর মধ্যে অনেক ঘটনায় আপন ভাই, চাচা-ভাতিজা কিংবা মামা-ভাগনের হাতে প্রাণ দিতে হয়েছে স্বজনদের। অনুসন্ধান ও সারা দেশের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বিরোধের শুরুটা মূলত জমির সীমানা, উত্তরাধিকারের হিস্সা বা দখলদারিত্ব নিয়ে। স্থানীয় সালিশ বা আইনি কাঠামোর সঠিক প্রয়োগ না থাকা এবং প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তায় এসব বিরোধ বছরের পর বছর ধরে গড়ায়, যা শেষ পর্যন্ত পরিণত হচ্ছে নৃশংস হত্যাকাণ্ডে। স্বজনদের হাতেই ঝরছে ৪২ শতাংশ প্রাণ। সারা দেশের সংঘটিত ঘটনাগুলো পর্যালোচনা করে দেখা যায়, মোট প্রাণহানির ৪২ শতাংশের পেছনে রয়েছেন ভুক্তভোগীর নিকটাত্মীয়রা। নওগাঁর নিয়ামতপুরে ১৭ বিঘা পৈতৃক সম্পত্তির ভাগাভাগি নিয়ে বোনদের পরিবারের সঙ্গে দীর্ঘদিনের বিরোধের জেরে চলতি বছরের এপ্রিলে একই পরিবারের চারজন অর্থাৎ স্বামী, স্ত্রী ও তাদের দুই শিশুসন্তানকে পরিকল্পিতভাবে গলা কেটে হত্যা করা হয়।


একইভাবে শরীয়তপুরে পারিবারিক জমি বিরোধের বলি হতে হয়েছে ছয় বছরের শিশু তায়েবাকে। লালমনিরহাট, ফরিদপুর, চট্টগ্রাম, ঝিনাইদহ ও মুন্সিগঞ্জেও স্বজনদের হাত দিয়ে একই ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটেছে। গাজীপুরের শ্রীপুরে এক হামলায় ফরিদ সরকার নিহত হন। তার পরিবার জানায়, হত্যার প্রায় এক মাস আগেই প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়েছিল। সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা সত্ত্বেও পুলিশ প্রতিরোধমূলক কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। পরবর্তীতে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা করা হয় জাসাস নেতা ফরিদ সরকারকে।


বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্থানীয় পর্যায়ে যে সালিশ ব্যবস্থা রয়েছে, তার কোনো সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা না থাকায় সহিংসতা রোধ করতে পারছে না। ফরিদপুরের ভাঙ্গায় ২০২২ সালে বর্তমান ও সাবেক ইউপি চেয়ারম্যানদের দিনভর সালিশের পরপরই ১৫ বছরের কিশোর নবীন মাতুব্বরকে হত্যা করা হয়। সূত্র জানায়, গত ছয় মাসে হত্যা মামলার সংখ্যা বাড়ছে। জানুয়ারিতে ২৯৪টি থেকে জুনে বেড়ে ৩৪৪টি হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক এবং অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন, দেশে দীর্ঘকাল ধরে একটি মনস্তাত্ত্বিক ধারণা গড়ে উঠেছে যে- জমিজমাসংক্রান্ত মামলা-মোকদ্দমা যুগের পর যুগ চলতে থাকে, সহজে সুরাহা হয় না। এই দীর্ঘসূত্রতার সুযোগ নিয়ে প্রভাবশালীরা অর্থ ও ক্ষমতার জোর দেখায়। এ ছাড়া অনেক ক্ষেত্রে সরাসরি স্বার্থ না থাকলেও কিছু মধ্যস্বত্বভোগী ও তৃতীয় পক্ষ উসকানি দিয়ে সংঘাত টিকিয়ে রাখে। এদের চিহ্নিত করে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) অতিরিক্ত বিশেষ পুলিশ সুপার আবু তালেব জানান, গ্রামাঞ্চলে সাধারণত গোষ্ঠীগত দ্বন্দ্ব, জমিজমাসংক্রান্ত বিরোধ কিংবা প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করে এ ধরনের অপরাধ বেশি ঘটে। সিআইডির ডিএনএ ল্যাবের অভিজ্ঞতা বলছে, সংঘটিত অধিকাংশ হত্যাকাণ্ডের নেপথ্য কারণ বিশ্লেষণ করতে গেলেই জমিজমার বিরোধের বিষয়টিই শীর্ষে উঠে আসে।


আইনি প্রতিকার ও বাস্তবতার দূরত্ব আইনে দণ্ডবিধির ৩০২ ধারা (হত্যা) এবং নির্দিষ্ট প্রতিকার আইন, ১৮৭৭-এর আওতায় দখল উদ্ধারের দেওয়ানি বিধান থাকলেও বাস্তবায়নের ধীরগতির কারণে ভুক্তভোগীরা আইনি ব্যবস্থার ওপর আস্থা হারাচ্ছেন। ফলে দেওয়ানি প্রতিকার পাওয়ার আগেই ফৌজদারি সংঘাত ও প্রাণহানির ঘটনা বাড়ছে। শরীয়তপুরের জাজিরার স্থানীয় বাসিন্দা আবদুল মালেক বলেন, আমাদের এখানে এমন কোনো দিন বাদ পড়ে না যেদিন মারামারি হয় না। সীমানা, জমির ভাগবাঁটোয়ারা বা প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করে এই রক্তক্ষয় চলতেই থাকছে।


আলোচিত কিছু ঘটনা : খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ২০২২ সালের ২০ জানুয়ারি নরসিংদী সদরে জমি বিরোধে ছোট ভাই নবী হোসেনকে (৫০) ছুরিকাঘাতে হত্যা করেন বড় ভাই আলী হোসেন। একই বছরের ৫ নভেম্বর ফরিদপুরের ভাঙ্গায় ব্যর্থ সালিশ বৈঠকের পর কিশোর নবীন মাতুব্বরকে (১৫) গলায় ছুরিকাঘাতে ও ২০২৩ সালে ৮ মার্চ টাঙ্গাইলের ঘাটাইলে ব্যবসায়ী কহিনূর মিয়াকে ডেকে নিয়ে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। ২০২৪ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর ফরিদপুরের চরভদ্রাসনে চাচাতো ভাইদের হামলায় আমিনুল ইসলাম বাচ্চু (৩৫) নিহত হন। একই বছরের ১৮ নভেম্বর লালমনিরহাটের হাতীবান্ধায় কৃষক হাফিজার রহমান কোদালের কোপে নিহত হন। এ ঘটনায় দুজন গ্রেপ্তার হন। ২৭ ডিসেম্বর মাদারীপুর কালকিনিতে আধিপত্য বিস্তার ও জমি বিরোধে হাতবোমার আঘাতে ইউপি সদস্য আক্তার শিকদার, তার ছেলে মারুফ ও দিনমজুর সিরাজুল চৌকিদার নিহত হন। এ সময় অন্তত ১০ জন আহত হন। গত বছরের ২২ মার্চ রাজশাহীর শাহ মখদুমে জমি জরিপকালে শ্যালক মিন্টুর কোপে দুলাভাই রুহুল আমিন নিহত হন। ৫ জুলাই ঝিনাইদহের শৈলকুপায় ভাগনে ইউনুস আলী মামা আকমল হোসেনকে (৫০) গলায় গামছা পেঁচিয়ে হত্যা করেন। ২২ সেপ্টেম্বর কক্সবাজারের মহেশখালীতে শাহাদাত হোসেন দোয়েল (৪২) গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন। ১ অক্টোবর ২০২৫ শরীয়তপুরের সখিপুরে ছয় বছরের শিশু তায়েবা নিখোঁজের দুই দিন পর সেপটিক ট্যাংক থকে লাশ উদ্ধার হয়, তদন্তে বেরিয়ে আসে চাচি আয়েশা খাতুনের পরিকল্পনায় জমি বিরোধের জেরে হত্যার ঘটনাটি। ২৫ ডিসেম্বর গাজীপুরের শ্রীপুরে জাসাস নেতা ফরিদ সরকার (৪১)-কে রামদা ও লাঠি দিয়ে হত্যা করা হয়।