তথ্যপ্রযুক্তি খাতে বিপ্লব, অর্ধ লক্ষাধিক দক্ষ-অদক্ষ তরুণ-তরুণীর কর্মসংস্থান, দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ এবং প্রযুক্তিনির্ভর শিল্পায়নের স্বপ্ন দেখিয়ে সিলেটে যাত্রা করেছিল হাইটেক পার্ক। স্থানীয় অর্থনীতিতে গতি সঞ্চারের পাশাপাশি উৎপাদিত পণ্য ও সেবা দেশের অভ্যন্তরে এবং ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের ‘সেভেন সিস্টার্সে’ রপ্তানিরও প্রত্যাশা ছিল। তবে ৩৩৬ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই মেগা প্রকল্পের সেই স্বপ্ন এখন অনেকটাই ফিকে। গ্যাস ও নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের অভাবে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন বিনিয়োগকারীরা। প্লট ও স্পেস বরাদ্দ নেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর অধিকাংশই এখনো কার্যক্রম শুরু করতে পারেনি। ফলে প্রকল্পটির ভবিষ্যৎ নিয়ে দেখা দিয়েছে অনিশ্চয়তা।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার বর্ণি এলাকায় ১৬২ দশমিক ৮৩ একর জমিতে গড়ে তোলা হয় হাইটেক পার্কটি। মাটি ভরাট ও অবকাঠামো নির্মাণসহ প্রকল্পে ব্যয় হয়েছে ৩৩৬ কোটি টাকা। ২০২১ সালের ১২ ডিসেম্বর এর উদ্বোধন করা হয়। এখানে হার্ডওয়্যার, সফটওয়্যার ও ইলেকট্রনিকস পণ্য উৎপাদনের পাশাপাশি গ্রাফিকস ডিজাইন, অ্যান্ড্রয়েড, জাভা, ওয়েব অ্যাপ্লিকেশন ডেভেলপমেন্ট, নেটওয়ার্ক ও সার্ভার অ্যাডমিনিস্ট্রেশন, বিপিও, ই-কমার্সসহ বিভিন্ন বিষয়ে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা রাখা হয়। এজন্য আইটি সেন্টারসহ দুটি প্রশিক্ষণকেন্দ্রও নির্মাণ করা হয়েছে। পার্কটি পুরোদমে চালু হলে অর্ধ লক্ষাধিক মানুষের কর্মসংস্থান হবে এবং স্থানীয়ভাবে প্রযুক্তিনির্ভর শিল্পের বিকাশ ঘটবে-এমন প্রত্যাশা ছিল সংশ্লিষ্টদের। এ লক্ষ্যে ১২টি প্রতিষ্ঠানকে ৭১ দশমিক ৩৯৯ একর জমি এবং ছয়টি প্রতিষ্ঠানকে ১৪ হাজার ৭৬০ বর্গফুট স্পেস ৪০ বছরের জন্য ইজারা দেওয়া হয়। কিন্তু বরাদ্দ নেওয়ার পরও অনেক প্রতিষ্ঠান বিনিয়োগে এগোয়নি। কেউ ব্যাংকঋণ না পেয়ে সরে দাঁড়িয়েছে, আবার কেউ গ্যাস ও নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের নিশ্চয়তা না পেয়ে বিনিয়োগ স্থগিত রেখেছে। নোহা অ্যান্ড সোহান এন্টারপ্রাইজ পাঁচতারা হোটেল নির্মাণের জন্য জমি বরাদ্দ নিয়েও ব্যাংকঋণ না পাওয়ায় চুক্তি বাতিল করেছে। একই কারণে সিমেড লিমিটেডও বরাদ্দকৃত জমি ছেড়ে দিয়েছে। ১৮টি প্রতিষ্ঠানকে জমি ও স্পেস বরাদ্দ দেওয়া হলেও এখন পর্যন্ত সীমিত পরিসরে কার্যক্রম শুরু করেছে মাত্র একটি প্রতিষ্ঠান। বর্তমানে র্যাংগস গ্রুপ তাদের ফ্রিজ ম্যানুফ্যাকচারিং ইউনিট চালু করেছে। তবে গ্যাসের অভাবে প্রতিষ্ঠানটির অন্য ইউনিটগুলো চালু করা সম্ভব হয়নি। সিলিন্ডার গ্যাস ব্যবহার করে কারখানা চালু রাখা ব্যয়বহুল হওয়ায় উৎপাদনও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। হাইটেক পার্কের উপমহাব্যবস্থাপক মো. মোরশেদুল আলম বলেন, শুরুতে বিনিয়োগকারীদের গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানির নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছিল। সিলেটে গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকট তুলনামূলক কম থাকায় বিনিয়োগকারীরাও আগ্রহী হয়েছিলেন। কিন্তু এখন পর্যন্ত পার্কে গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব হয়নি। এ কারণে বিনিয়োগকারীরা শিল্পকারখানা স্থাপনে পিছিয়ে গেছেন। তিনি বলেন, ‘বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে কয়েকবার বৈঠক হয়েছে। তারা গ্যাস ও বিদ্যুতের নিশ্চয়তা চাচ্ছেন। কিন্তু আমরা তা দিতে পারছি না। অন্তর্বর্তী সরকারের জ্বালানি উপদেষ্টা সিলেট হাইটেক পার্কে গ্যাস সংযোগের নির্দেশ দিয়েছিলেন। কিন্তু পেট্রোবাংলা তা আটকে দেয়। বর্তমান সরকার বিষয়টি নিয়ে ইতিবাচক। বিদ্যমান সমস্যার সমাধান হলে বিনিয়োগকারীরা আবার ফিরবেন বলে আশা করছি।’ এদিকে পার্কটি সচল করতে সরকারিভাবে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। ২০২৪ সালের নভেম্বরে প্রকল্পটি স্থগিত বা বাতিলের নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। এতে বরাদ্দ নেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তায় পড়ে। পরে ২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচনের পর প্রকল্পের অগ্রগতি ও অর্থায়ন পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে পুনর্বিন্যাসের প্রস্তাব দেয় হাইটেক পার্ক কর্তৃপক্ষ। ওই প্রস্তাবের পর সরকার হাইটেক পার্কগুলোকে কার্যকর করার পরিকল্পনা নিয়েছে। তবে বিদ্যমান সংকট কাটিয়ে কবে নাগাদ বিনিয়োগের অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিত করা যাবে, তা এখনো চূড়ান্ত হয়নি।