রাজধানী ঢাকায় সিএনজি অটোরিকশার নম্বর প্লেটের রং নিয়ে নতুন করে জটিলতা তৈরি হয়েছে। সবুজ রঙের অটোরিকশা ও নম্বর প্লেটের রং কাছাকাছি হওয়ায় সিসি ক্যামেরা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির ক্যামেরায় নম্বর শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ছে। ফলে ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনকারী যানবাহনের বিরুদ্ধে স্বয়ংক্রিয়ভাবে মামলা দেওয়ার ক্ষেত্রে বাধার মুখে পড়ছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। একই সঙ্গে অপরাধে ব্যবহৃত অটোরিকশা শনাক্ত করাও পুলিশের জন্য কঠিন হয়ে উঠছে।


সম্প্রতি রাজধানীর মগবাজারে বিশাল সেন্টারের সামনে জনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পী আসিফ আকবরের গাড়ি লক্ষ্য করে গুলি চালানোর ঘটনায় বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। পুলিশ ঘটনাস্থল ও আশপাশের সিসি ক্যামেরার ফুটেজ বিশ্লেষণ করে একটি সবুজ রঙের সিএনজি অটোরিকশার উপস্থিতি শনাক্ত করে। ফুটেজে দেখা যায়, ওই অটোরিকশা থেকে এক ব্যক্তি নেমে আসিফ আকবরের গাড়ি লক্ষ্য করে গুলি চালান। পরে তিনি আবার অটোরিকশাটিতে উঠে পালিয়ে যান। তবে ঘটনার তিন দিন পার হলেও অটোরিকশাটি ও গুলি চালানো ব্যক্তিকে শনাক্ত করতে পারেনি পুলিশ বলে তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।


তদন্তসংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, সিএনজি অটোরিকশার গায়ের রং এবং নম্বর প্লেটের রং কাছাকাছি হওয়ায় ভিডিও ফুটেজে নম্বর স্পষ্টভাবে বোঝা যাচ্ছে না। শুধু সিসি ক্যামেরার ফুটেজ নয়, রাজধানীর বিভিন্ন সিগন্যাল ও গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে স্থাপিত এআই ক্যামেরার ক্ষেত্রেও একই সমস্যা দেখা দিচ্ছে। ফলে অপরাধে ব্যবহৃত যান শনাক্ত করা এবং ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনের ঘটনায় স্বয়ংক্রিয়ভাবে ব্যবস্থা নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে।


ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) ট্রাফিক বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, রাজধানীতে চলাচলকারী অধিকাংশ সিএনজি অটোরিকশার রং সবুজ। এসব যানবাহনের নম্বর প্লেটও সবুজ রঙের, যার ওপর কালো রঙে নম্বর লেখা থাকে। ফলে দূর থেকে কিংবা কম আলোতে নম্বর পড়া কঠিন হয়ে যায়। এর ওপর কিছু অটোরিকশার নম্বর প্লেটে অক্ষর ও সংখ্যা স্পষ্ট করার জন্য ব্যবহৃত কালো রং উঠে যাওয়ায় সমস্যা আরও বাড়ছে। এতে কোনো অটোরিকশা ট্রাফিক আইন ভঙ্গ করলেও ক্যামেরায় নম্বর শনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে না অনেক ক্ষেত্রে।


সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি, রাজধানীতে বৈধ ও অবৈধ মিলিয়ে ২৫ হাজারের বেশি সিএনজি অটোরিকশা চলাচল করছে। এসব যানবাহনের একটি অংশ সড়কে চলাচলের সময় ট্রাফিক আইন অমান্য করছে, সিগন্যাল ভাঙছে এবং যানজট সৃষ্টির কারণ হচ্ছে। কিন্তু নম্বর প্লেট স্পষ্টভাবে শনাক্ত করা না যাওয়ায় আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো সব ক্ষেত্রে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে পারছে না। এ পরিস্থিতিতে নম্বর প্লেটের রং ও নকশা পরিবর্তনের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে।


সমস্যা সমাধানে ঢাকা মহানগর পুলিশের পক্ষ থেকে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষকে (বিআরটিএ) চিঠি দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা মনে করছেন, নম্বর প্লেট এমনভাবে তৈরি করা প্রয়োজন, যাতে দিনের আলো ও রাতের অন্ধকার—উভয় পরিস্থিতিতেই ক্যামেরা সহজে নম্বর শনাক্ত করতে পারে। এতে একদিকে ট্রাফিক আইন প্রয়োগ সহজ হবে, অন্যদিকে অপরাধে ব্যবহৃত যানবাহন শনাক্ত করতেও পুলিশ সুবিধা পাবে।


ঢাকা মহানগর সিএনজি অটোরিকশাচালক ঐক্য পরিষদের আহ্বায়ক শেখ হানিফ বলেন, রাজধানীতে নিবন্ধিত অটোরিকশার পাশাপাশি অনেক অবৈধ যানও চলাচল করে। তাঁর দাবি, কিছু ব্যক্তি ব্যক্তিগত ব্যবহারের অটোরিকশার নিবন্ধন নিয়ে রং পরিবর্তন করে সেগুলো বাণিজ্যিকভাবে চালাচ্ছেন। সড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে নম্বর প্লেটের রং পরিবর্তন প্রয়োজন হলে তা সবার জন্য একইভাবে কার্যকর করা উচিত বলে তিনি মনে করেন।


এদিকে সিএনজি অটোরিকশাকে কেন্দ্র করে ছিনতাই, ডাকাতি, অপহরণ ও মলমপার্টির মতো অপরাধের অভিযোগও প্রায়ই সামনে আসে। গোয়েন্দা সূত্রের মতে, অপরাধীরা অনেক সময় শনাক্ত এড়াতে ভুয়া নম্বর প্লেট ব্যবহার করে। আবার একই নম্বর প্লেট একাধিক অটোরিকশায় ব্যবহারের অভিযোগও রয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে একটি নম্বর প্লেট ব্যবহার করে পাঁচ থেকে সাতটি অটোরিকশা চালানোর তথ্য পাওয়া গেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। এ ধরনের অনিয়মের কারণে অপরাধে ব্যবহৃত যানবাহন শনাক্ত ও অপরাধীদের গ্রেপ্তারে তদন্তকারীদের বাড়তি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হচ্ছে।


গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের মতে, নম্বর প্লেট স্পষ্ট ও সহজে শনাক্তযোগ্য হলে অপরাধ তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি সম্ভব। ক্যামেরায় ধারণ করা নম্বরের সঙ্গে নিবন্ধনসংক্রান্ত তথ্য মিলিয়ে যানবাহনের মালিক বা ব্যবহারকারীর বিষয়ে অনুসন্ধান করা সহজ হবে। তবে এ ক্ষেত্রে শুধু রং পরিবর্তনই যথেষ্ট নয়; নম্বর প্লেটের মান, দৃশ্যমানতা, নিবন্ধনের নির্ভুলতা এবং ভুয়া নম্বর প্লেটের বিরুদ্ধে কার্যকর নজরদারিও নিশ্চিত করতে হবে।


ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগ জানিয়েছে, রাজধানীর ১১টি গুরুত্বপূর্ণ ইন্টারসেকশনে এআই ক্যামেরা স্থাপনের পর ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনের ঘটনায় জরিমানার পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। সংশ্লিষ্ট বিভাগের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত তিন মাসে মোট ৫১ কোটি ৮৩ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। এর মধ্যে সেপ্টেম্বরে ২০ কোটি ১৮ লাখ টাকা, আগস্টে ১৪ কোটি ৬১ লাখ টাকা এবং জুলাইয়ে ১৭ কোটি ৪ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। এআই ক্যামেরার মাধ্যমে করা মামলায় মাইক্রোবাস, ব্যক্তিগত গাড়ি, মোটরসাইকেল ও বাসের বিরুদ্ধে তুলনামূলক বেশি জরিমানা হয়েছে। বিপরীতে সিএনজি অটোরিকশার বিরুদ্ধে মামলার সংখ্যা তুলনামূলক কম।


ট্রাফিক সংশ্লিষ্টদের ধারণা, নম্বর প্লেট শনাক্তের সমস্যা দূর করা গেলে আইন লঙ্ঘনকারী সিএনজি অটোরিকশার বিরুদ্ধেও আরও কার্যকরভাবে ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হবে। এতে সড়কে শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং অপরাধ প্রতিরোধে প্রযুক্তির ব্যবহার আরও ফলপ্রসূ হবে।


রাজধানীর সড়ক ব্যবস্থাপনা আধুনিক করতে আরও ৩১টি ইন্টারসেকশনে এআই ক্যামেরা স্থাপনের প্রস্তুতি চলছে। পর্যায়ক্রমে মোট ১২০টি ইন্টারসেকশনে এ ধরনের ক্যামেরা স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে ট্রাফিক বিভাগের। তবে ক্যামেরার সংখ্যা বাড়ানোর পাশাপাশি নম্বর প্লেট শনাক্তের প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা দূর করাও জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।


সিএনজি অটোরিকশার রং ও নম্বর প্লেটের জটিলতা প্রসঙ্গে ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ট্রাফিক) মো. আনিছুর রহমান বলেন, অটোরিকশার গায়ের রং এবং নম্বর প্লেটের রং কাছাকাছি হওয়ায় শনাক্তকরণে সমস্যা হচ্ছে। দিনের বেলায় নম্বর কিছুটা বোঝা গেলেও রাতে তা প্রায় অস্পষ্ট হয়ে যায়। এ সমস্যা সমাধানে দ্রুত বিআরটিএকে চিঠি দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।


অন্যদিকে বিআরটিএর উপপরিচালক (ইঞ্জিনিয়ারিং-২) মো. ফারুক আহমেদ জানিয়েছেন, এ বিষয়ে কর্তৃপক্ষ এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক চিঠি পায়নি।


সব মিলিয়ে রাজধানীর সড়কে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, ট্রাফিক আইন কার্যকর করা এবং অপরাধে ব্যবহৃত যানবাহন শনাক্তের ক্ষেত্রে সিএনজি অটোরিকশার নম্বর প্লেট একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, নম্বর প্লেটের দৃশ্যমানতা বাড়ানো, নিবন্ধনব্যবস্থায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং ভুয়া নম্বর প্লেটের বিরুদ্ধে কঠোর নজরদারি চালু করা গেলে এ সমস্যা অনেকটাই কমানো সম্ভব। একই সঙ্গে এআই ক্যামেরার কার্যকারিতা বাড়াতে প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা দূর করা গেলে রাজধানীর সড়ক ব্যবস্থাপনায় আরও শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার পথ সুগম হতে পারে।