রাত নামলেই আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে খুলনায়। নগরী ও আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় গোলাগুলি, হামলা, খুন ও চাঁদাবাজির ঘটনা সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ বাড়িয়ে তুলেছে। ভয়ে অনেকেই মুখ খুলতে সাহস পাচ্ছেন না। হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা থেকে বাদ পড়ছে না হাসপাতাল-ক্লিনিকও। অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, পুলিশের নিষ্ক্রিয়তা ও অপরাধ দমনে কার্যকর পদক্ষেপের ঘাটতি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকিরও ধারাবাহিক হত্যাকাণ্ড ও চাঁদাবাজির কারণে জনমনে আতঙ্ক তৈরির বিষয়টি স্বীকার করেছেন। পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিশেষ আইনি কাঠামো তৈরি এবং কমিউনিটি পুলিশিং কার্যক্রম জোরদারের উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানিয়েছেন তিনি।


সম্প্রতি খুলনার মুচিপাড়া শতরূপার মোড়ে ভাড়াসংক্রান্ত বিরোধের জেরে লাঠির আঘাতে রকিবুল ইসলাম নামে এক ভাড়াটিয়ার মৃত্যু হয়েছে। খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গতকাল তাঁর মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় বাড়ির মালিক মজলিস খানকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করেছে পুলিশ। এর আগে ২২ অক্টোবর মাদকসংক্রান্ত বিরোধের জেরে বানিয়াখামার এলাকায় তাওহিদুল তুষার এবং জিন্নাহপাড়া এলাকায় খুশি নামে এক গৃহবধূসহ দুজনকে গুলি করে হত্যা করা হয়। গত ৪ অক্টোবর দিঘলিয়ায় নিজ বাড়ির সামনে চরমপন্থি দলের আঞ্চলিক নেতা নাসিমুল করিমকে হত্যা করা হয়। এ ছাড়া ৫ অক্টোবর রূপসায় বাসশ্রমিক আক্তার ঢালী এবং এর আগে ১৫ আগস্ট তাঁর ছেলে জয় ঢালীকে গুলি করে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা।


পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরে খুলনা জেলা ও মহানগর এলাকায় ৭৫টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। কিশোর গ্যাং, মাদক কারবারি ও বিভিন্ন সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সংঘাত, চাঁদাবাজি এবং আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী, খুলনায় অন্তত ১০টি শীর্ষ অপরাধী চক্র সক্রিয় রয়েছে। মাদক ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে এসব গোষ্ঠীর মধ্যে প্রায়ই বিরোধ দেখা দেয়, যা অনেক ক্ষেত্রে প্রাণঘাতী সংঘর্ষে রূপ নেয়। অর্থের বিনিময়ে ভাড়াটে খুনি নিয়োগের ঘটনাও অপরাধ পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।


খুলনায় অপরাধপ্রবণতা বৃদ্ধির বিষয়ে মহানগর পুলিশের সহকারী কমিশনার শফিকুল ইসলাম জানান, শীর্ষ সন্ত্রাসীদের অনেকে মোবাইল ফোনের বিভিন্ন অ্যাপ ব্যবহার করে নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ রক্ষা করে। এতে তাদের অবস্থান শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে। দূরে অবস্থান করেও তারা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ও চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণ করছে। পাশাপাশি ভুক্তভোগীদের অনেকে পুলিশের কাছে তথ্য দিতে অনীহা প্রকাশ করেন। ফলে অপরাধীদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে নানা প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়তে হচ্ছে।


এ পরিস্থিতিতে অপরাধ নিয়ন্ত্রণে গত ৬ অক্টোবর থেকে বিশেষ অভিযান শুরু করেছে জেলা পুলিশ। পুলিশ সুপার সরকার ওমর ফারুক জানিয়েছেন, জেলা পুলিশ, খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশ (কেএমপি) এবং এসআরবির যৌথ উদ্যোগে বিশেষ অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। অভিযানে মাদকসংশ্লিষ্ট বেশ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।


তবে ধারাবাহিক অভিযান ও গ্রেপ্তারের পরও খুলনার সার্বিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে সাধারণ মানুষের উদ্বেগ কাটেনি। নগরবাসীর প্রত্যাশা, হত্যাকাণ্ড, অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার, মাদক ব্যবসা ও চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে। একই সঙ্গে অপরাধীদের দ্রুত শনাক্ত ও বিচারের আওতায় আনা, নিয়মিত টহল জোরদার এবং ভুক্তভোগীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মাধ্যমে খুলনায় স্বাভাবিক ও নিরাপদ পরিবেশ ফিরিয়ে আনা হবে।