একসময়ের সবুজ নগরী খুলনা। কালের পরিক্রমায় মানুষের লোভের মুখে সেই সবুজ প্রায় হারিয়ে গেছে। সঙ্গে বেড়েছে দুর্ভোগ। কাদাপানি আর যানজটের সঙ্গে বেড়েছে সংযোগ। এরপর অনেক সরকার এসেছে খুলনাকে আধুনিক করার নামে শুধু খোঁড়াখুঁড়িই করেছে। এখন সংকট বহুমুখী। বর্ষা মৌসুম এলেই জলজটে নাকাল হতে হয়। যানজট স্থবির হচ্ছে শহর আর ফুটপাত দখলে হাঁটা দুষ্কর। শহরে চারটি প্রবেশদ্বারে তিনটি দিয়ে চলাচলকষ্টসাধ্য। পয়ঃনিষ্কাশনের খালগুলো বেদখল। সড়কে আবর্জনার স্তূপ, ফুটপাত দখল, ইজিবাইকের দাপট সব মিলিয়ে দুর্ভোগ আর বিড়ম্বনায় অতিষ্ঠ নগরবাসী।


বৃহত্তর খুলনা উন্নয়ন সংগ্রাম সমন্বয় কমিটির সভাপতি শেখ আশরাফ উজ জামান মনে করেন, বিগত দুই দশক নগর উন্নয়নে হাজার কোটি টাকা ব্যয় হলেও নাগরিক দুর্ভোগ না কমে বরং বেড়েই চলেছে। পয়ঃনিষ্কাশনের প্রাকৃতিক খাল-নালাগুলো কংক্রিটের সরু ড্রেনে রূপান্তর করা হয়েছে। সড়কগুলোর বুক উঁচু করায় বাড়িগুলোর নিচ তলা বসবাসযোগ্যতা হারিয়েছে। এজন্য প্রয়োজন পরিকল্পিত উন্নয়নের মাস্টার প্ল্যান।


সিটি করপোরেশনে প্রশাসক নজরুল ইসলাম মঞ্জু বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, নগর উন্নয়ন সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়হীনতা এবং ভুল পরিকল্পনায় হাজার কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। ফলে দুর্ভোগ কমেনি নগরবাসীর। দায়িত্বগ্রহণের পর সমস্যাগুলো চিহ্নিত করেছি। ভোগান্তি নিরসনে এখন সমন্বিত কার্যক্রম হাতে নেওয়া হয়েছে। কয়েক বছরের নানা সমস্যা সরেজমিন দেখে ও নগরবাসীর সঙ্গে কথা বলে কিছু দুর্ভোগ নির্ণয় করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে-


বৃৃষ্টি হলেই হাঁটুপানি : ২০১৮-১৯ থেকে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে জলাবদ্ধতা নিরসনে ৮২৩ কোটি ৭৯ লাখ টাকা ড্রেনেজ ব্যবস্থা উন্নয়নে ব্যয় হয়। কিন্তু অপরিকল্পিতভাবে রাস্তা-ড্রেন উঁচু করায় বৃষ্টি হলে এখন উল্টো ড্রেনের নোংরা পানিতে বাড়ি-ঘর, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ছয়লাব হয়ে যায়।


খানজাহান আলী রোড এলাকার ড্রেনের পানি রূপসা নদীতে অপসারণের জন্য রূপসা ঘাট এলাকায় পাম্প হাউস নির্মাণের কথা থাকলেও পাঁচবার পুনঃদরপত্র করে দুই বছর সময়ক্ষেপণ করা হয়েছে। ১৩ বছরে শিপইয়ার্ড রোডের নির্মাণকাজ শেষ না হওয়ায় এখানে চারটি পয়েন্ট দিয়ে জোয়ারের পানি ঢুকছে শহরে। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে গত ৪ জুলাই এই সড়কটি সরেজমিন পরিদর্শন করেছেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনী। এ সময় তিনি প্রকল্পটির কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে ক্ষোভ প্রকাশ করেন।


ফুটপাত দখল-যানজট : ট্রাফিক পুলিশের তথ্যমতে, শহরে নিবন্ধিত ইজিবাইকের সংখ্যা ৮ হাজার। বাস্তবে নিবন্ধন ছাড়াই চলছে আরও ১৫-২০ হাজার। ডাকবাংলা মোড়, ক্লে রোড, পুরানো যশোর রোড, কেডি ঘোষ রোড, পিকচার প্যালেস, শপিং কমপ্লেক্স এলাকায় সড়ক দখল করে পসরা সাজিয়ে বসেন হকাররা।


নাজুক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা : ২০২১-২২ থেকে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা খাতে প্রায় ৩৯৩ কোটি ৪০ লাখ টাকা ব্যয় করে কেসিসি। কিন্তু কেডিএ এভিনিউ, নিউমার্কেট কাঁচাবাজার, পিটিআই মোড়সহ বিভিন্ন স্থানে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ময়লা-আবর্জনা সড়কে জমে থাকে। খোলা ট্রাকে করে দিনের বেলায় চলে ময়লা অপসারণের কাজ। দুর্গন্ধে অতিষ্ঠ জনজীবন।


ওয়াসার খোঁড়াখুঁড়ি-সমন্বয়হীনতা : নগরীর উন্নয়নে কাজ করা খুলনা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (কেডিএ), এলজিইডি, ওয়াসা, সড়ক বিভাগ ও কেসিসির মধ্যে সমন্বয় না থাকায় কে কোথায় কী কাজ করছে কেউ জানে না। দীর্ঘ বছর ধরে ওয়াসা সড়কে খোঁড়াখুঁড়ির কাজ করছে, এতে বিরক্ত নগরবাসী।


শহরে প্রবেশপথে ভোগান্তি : শিপইয়ার্ড রোড গল্লামারি ব্রিজ ও সোনাডাঙ্গা বাইপাসে সংস্কার উন্নয়ন কাজে সময়ক্ষেপণ হচ্ছে। বাইরে থেকে আসে মানুষ শহরে ঢোকার মুখেই ভাঙাচোরা সড়ক দেখে হোঁচট খায়। শহরের মধ্য দিয়ে চলা ২২টি খাল দখলমুক্ত রেখে পানি নিষ্কাশন স্বাভাবিক রাখাও বড় চ্যালেঞ্জ। প্রশাসক নজরুল ইসলাম মঞ্জু বলেন, বিগত আমলে কেউ সমস্যার গভীরে যাওয়ার চেষ্টা করেনি। ফলে সমস্যা-সংকট থেকেই গেছে।