দেশে প্রতি বছর জন্মগ্রহণ করে প্রায় ৩৬ লাখ শিশু। এর মধ্যে গর্ভধারণজনিত জটিলতায়, প্রসবকালে ও প্রসব-পরবর্তী বিভিন্ন সমস্যায় বছরে মৃত্যু হচ্ছে ৩ হাজার ৭০০ প্রসূতির। এ হিসাবে প্রতিদিন গড়ে মারা যাচ্ছেন ১০ জন মা। স্বাস্থ্য চেকআপ না করা, অদক্ষ হাতে সন্তান প্রসব এবং বাল্যবিয়ের কারণে বাড়ছে মাতৃমৃত্যু। ফলে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রায় (এসডিজি) পিছিয়ে পড়ছে দেশ, ঝুঁকিতে পড়ছে নিরাপদ মাতৃত্ব।
এ পরিস্থিতিতে আজ পালিত হচ্ছে বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস। এ বছরের প্রতিপাদ্য- ‘তারুণ্যের আশা-আকাক্সক্ষার বাস্তবায়ন করি, আজকের প্রস্তুতিতে সুন্দর আগামী গড়ি।’ স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মেটারনাল অ্যান্ড পেরিনেটাল ডেথ সার্ভিলেন্স অ্যান্ড রেসপন্সের (এমপিডিএসআর) পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১৭ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত দেশে ধারাবাহিকভাবে মাতৃমৃত্যু কমলেও ২০২৩ ও ২০২৪ সালে আবার বেড়েছে। ২০২২ সালে প্রতি লাখে মাতৃমৃত্যু হার ছিল ৬২ জন। ২০২৩ সালে এ সংখ্যা ছিল প্রতি লাখে ৭৫ জন। ২০২৪ সালে তা বেড়ে ৯০ জনে পৌঁছায়। ২০২৪ সালে মাতৃমৃত্যু সবচেয়ে বেশি ছিল সিলেট বিভাগে।
যদিও বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০২৩ সালের হিসাব অনুসারে, প্রতি ১ লাখ জীবিত শিশু জন্ম দিতে গিয়ে ১৩৬ জন মা মারা যান। আগের বছর এ সংখ্যা ছিল ১৫৩। ২০২১ সালে মাতৃমৃত্যুর হার ছিল ১৬৮। নিউট্রিশন ইন্টারন্যাশনালের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী- দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে কিশোরীদের গর্ভধারণের হার বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি। ১৯ বছর বয়সের আগে প্রতি হাজারে ১১৩ কিশোরী গর্ভধারণ করে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কিশোরী অবস্থায় বিয়ে ও গর্ভধারণের হার বেড়ে যাওয়ায় মাতৃমৃত্যু বাড়ছে। বাংলাদেশ এখনো টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অনুযায়ী ২০৩০ সালের মধ্যে মাতৃমৃত্যুর হার ৭০-এর নিচে নামাতে পারেনি। ‘মেরী স্টোপস বাংলাদেশ’র প্রধান পার্টনারশিপ, ফান্ডরাইজিং অ্যান্ড অ্যাডভোকেসি মনজুন নাহার বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘মাতৃমৃত্যু কমাতে পরিবারকে সচেতন করতে হবে। আমাদের সমাজ অনেক ক্ষেত্রে রক্ষণশীল। মেয়েদের স্বাস্থ্যের জন্য খরচ করতে চায় না। অনেকে বলে আগের দিনেও তো নারীরা সন্তান প্রসব করেছে। কিন্তু তখন মৃত্যুহার যে অনেক বেশি ছিল সেটাও দেখতে হবে। এখন অনেকটা কমিয়ে এনেছে সরকার। মূলত তিন কারণে মাতৃমৃত্যুর ঘটনা ঘটছে। গর্ভকালীন অন্তঃসত্ত্বা মায়ের চারটা চেকআপের প্রয়োজন হয়। কিন্তু প্রথম চেকআপের পর মায়েদের সংখ্যা কমতে থাকে। এখনো হাসপাতাল বা স্বাস্থ্যকেন্দ্রের বাইরে অদক্ষ হাতে ৫০ শতাংশ প্রসবের ঘটনা ঘটছে। বাল্যবিয়ের কারণে অল্প বয়সে গর্ভধারণে মাতৃমৃত্যুর ঘটনা বাড়ছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘জন্ম নিয়ন্ত্রণ সামগ্রীর সংকটে অনাকাক্সিক্ষত গর্ভধারণের ঘটনা বাড়ছে। এর ফলে অনিরাপদ গর্ভপাত মাতৃমৃত্যুর শঙ্কা আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। কারণ দেশে গর্ভপাতে এক ধরনের লুকোচুরি, ট্যাবু রয়েছে। তাই নিরাপদ মাতৃত্ব নিশ্চিত করতে সচেতনতা বাড়াতে সরকারকে জোরেশোরে উদ্যোগ নিতে হবে। দুর্গম প্রত্যন্ত অঞ্চলের অন্তঃসত্ত্বা নারীর পাশাপাশি শহরে, নগরে, বস্তি এলাকায় অন্তঃসত্তা নারীরা কোথায় সেবা নিতে যাবেন সে ব্যবস্থাও করতে হবে।’ জানা যায়, দেশে প্রতিষ্ঠানভিত্তিক প্রসবের হার বাড়লেও এখনো বিপুলসংখ্যক নারী বাড়িতে সন্তান জন্ম দেন। অনেক ক্ষেত্রেই এসব প্রসব পরিচালনা করেন অদক্ষ বা প্রশিক্ষণবিহীন ধাত্রী। প্রসবকালীন অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ, খিঁচুনি, দীর্ঘ সময় প্রসব বেদনা কিংবা নবজাতকের জটিলতা দেখা দিলে সময়মতো চিকিৎসা না পাওয়ায় মা ও শিশুর জীবন ঝুঁকিতে পড়ে। এ ব্যাপারে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, দেশের প্রতিটি এলাকায় দক্ষ মিডওয়াইফের সেবা নিশ্চিত করতে হবে। এটি শুধু কর্মসংস্থানের বিষয় নয়; বরং জাতির স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়। চলতি বছর স্বাস্থ্য খাতে ১ লাখ নতুন কর্মী নিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৮০ হাজার নারী নিয়োগ দেওয়া হবে। তাদের বড় অংশই মিডওয়াইফ হিসেবে কাজ করবেন, যাতে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত মাতৃ স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়া যায়। জানা যায়, গর্ভাবস্থায় অন্তত চারবার স্বাস্থ্য পরীক্ষা করার সুপারিশ রয়েছে। কিন্তু দেশের বহু নারী প্রয়োজনীয় সংখ্যক চেকআপ করান না। বাংলাদেশে এখনো বাল্যবিয়ের হার দক্ষিণ এশিয়ায় বেশি। কম বয়সে গর্ভধারণের ফলে কিশোরীদের শরীর পুরোপুরি প্রস্তুত থাকে না। এতে প্রসবজনিত জটিলতা, রক্তশূন্যতা, অপরিণত শিশুর জন্ম এবং মাতৃমৃত্যুর ঝুঁকি কয়েক গুণ বেড়ে যায়। পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচিতে জন্ম নিয়ন্ত্রণ সামগ্রীর সরবরাহে অনিয়ম ও সংকটের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। এর ফলে অনাকাক্সিক্ষত গর্ভধারণ বাড়ছে। এতে ঝুঁকিতে পড়ছে নিরাপদ মাতৃত্ব।