ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক ও ঢাকা-৮ আসনের সম্ভাব্য এমপি প্রার্থী শরিফ ওসমান হাদি খুনের বিচার দাবিতে গতকাল রাজধানীসহ সারা দেশ ছিল ক্ষোভ-বিক্ষোভে উত্তাল। সকাল থেকেই শাহবাগে জড়ো হতে থাকে ছাত্র-

জনতা। শাহবাগ মোড় ব্যারিকেড করে বিক্ষোভ করতে থাকে তারা। ছাত্র-জনতার বিক্ষোভে দিনভর উত্তাল ছিল শাহবাগ প্রাঙ্গণ। বেলা ১১টার মধ্যে লোকারণ্য হয়ে ওঠে শাহবাগ চত্বর। রাজধানীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হাজার হাজার মানুষ উপস্থিত হয় শাহবাগে। দুপুরে উপস্থিত মুসল্লিরা শাহবাগ মোড়েই জুমার নামাজ আদায় করেন। নামাজে ইমামতি করেন শায়খুল হাদিস জসিম উদ্দিন রহমানী। পরে শহীদ শরিফ ওসমান হাদির রুহের মাগফিরাত কামনায় দোয়া মোনাজাত করা হয়। বিকালে ঢাকার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে খণ্ড খণ্ড মিছিল নিয়ে শাহবাগ মোড়ে উপস্থিত হন লাখো ছাত্র-জনতা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শাহবাগ মোড় ছাড়িয়ে ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলের সামনে পর্যন্ত অবস্থান নেন বিক্ষুব্ধরা।

ইনকিলাব মঞ্চের আয়োজনে শাহবাগে দিনভর বিক্ষোভ সমাবেশে বক্তব্য দেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) ভিপি সাদিক কায়েম, জিএস এস এম ফরহাদ, গণঅধিকার পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রাশেদ খান, র‌্যাব-৭ এর সাবেক অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল হাসিনুর রহমান, ইসলামী ছাত্র আন্দোলনের সভাপতি মুনতাসির আহমাদ, সাইমুম শিল্পী গোষ্ঠীর পরিচালক জাহিদুল ইসলাম, শায়খুল হাদিস আল্লামা জসিমুদ্দীন প্রমুখ। এ সময় বিক্ষোভকারীরা শাহবাগ চত্বরকে ‘শহীদ হাদি চত্বর’ হিসেবে ঘোষণা করেন। সরকারি বিভিন্ন দপ্তরে শাহবাগের পরিবর্তে হাদি চত্বর নাম ব্যবহারের আহ্বান জানান বক্তারা।

বিক্ষোভ সমাবেশে আগতরা ‘ইনকিলাব ইনকিলাব জিন্দাবাদ জিন্দাবাদ, হাদি ভাইয়ের রক্ত বৃথা যেতে দেব না, আমরা সবাই হাদি হব যুগে যুগে লড়ে যাব, তুমি কে আমি কে হাদি হাদি, দিল্লি না ঢাকা ঢাকা ঢাকা, ভারত না বাংলাদেশ বাংলাদেশ বাংলাদেশ, একটা দুটা লীগ ধর ধরে ধরে জবাই কর, ফ্যাসিবাদের আস্তানা জ্বালিয়ে দাও পুড়িয়ে দাও’ ইত্যাদি স্লোগান দেন।

বক্তব্যে সাদিক কায়েম বলেন, শহীদ হাদি ভাই কোনো ভায়োলেন্সের মাধ্যমে ফ্যাসিবাদী ও আধিপত্যবাদী শক্তিকে পরাজিত করতে চান নাই। তার আদর্শ ছিল মেধা-মনন, জ্ঞান দিয়ে ফ্যাসিবাদী ও আধিপত্যবাদী শক্তিকে পরাজিত করা। কোন ফাঁদে পা না দিয়ে শহীদ হাদির আদর্শ বুকে ধারণ করে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন জারি রাখার আহ্বান জানান তিনি। এস এম ফরহাদ বলেন, আমরা আওয়ামী ফ্যাসিবাদের বিদায় করেছি। ভারতীয় আধিপত্যবাদেরও পতন করব ইনশাল্লাহ।

রাশেদ খান বলেন, হাদি হত্যার বিচার হতেই হবে। ছাত্র-জনতা আন্দোলন করে আওয়ামী ফ্যাসিবাদের বিদায় ঘটিয়েছে কিন্তু ভারতীয় আধিপত্যবাদের বিদায় হয়নি। দেশে ভারতীয় আধিপত্যবাদের রাজনীতি আর চলবে না। চলতে দেওয়া হবে না। মুনতাসির আহমাদ বলেন, সব খুনি ভারতে আশ্রয় পায়। এ থেকে প্রমাণিত হয় ভারত আমাদের বন্ধু নয়। ভারতীয় আধিপত্যবাদ এদেশে মেনে নেব না। রাত ৮টায় এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত শাহবাগের হাদি চত্বরে বিক্ষোভ চলছিল।

বায়তুল মোকাররমে বিক্ষোভ : জুলাই আন্দোলনের সম্মুখসারির সংগঠক ও ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদিকে গুলি করে হত্যার প্রতিবাদে রাজধানীর বায়তুল মোকাররমে বিক্ষোভ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে। গতকাল জুমার নামাজ শেষে জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররম প্রাঙ্গণে এ কর্মসূচি শুরু হয়। ‘শরিফ ওসমান হাদির ওপর হামলাকারীদের গ্রেপ্তার করে দ্রুত বিচার, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার ও লীগ সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তার’ এই দাবিতে বাংলাদেশ খেলাফত ছাত্র মজলিস বিক্ষোভ কর্মসূচির আয়োজন করে। কর্মসূচির শুরুতে সংগঠনটির নেতা-কর্মীরা বিভিন্ন স্লোগান দেন। একই সময়ে জুমার নামাজ শেষে খেলাফত মজলিসের ঢাকা মহানগর দক্ষিণ শাখার পক্ষ থেকেও বায়তুল মোকাররম এলাকায় হাদি হত্যার প্রতিবাদে ও জড়িত ব্যক্তিদের বিচারের দাবিতে আলাদা বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করা হয়।

বিক্ষোভকারীরা হাদি হত্যার ঘটনায় দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার পাশাপাশি দায়ীদের গ্রেপ্তার এবং অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারের দাবি জানান। এ সময় বায়তুল মোকাররম ও আশপাশের এলাকায় আইনশৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের সতর্ক অবস্থানে দেখা যায়।

গণঅধিকার পরিষদের মিছিল : শরিফ ওসমান হাদিকে হত্যার প্রতিবাদে রাজধানীতে বিক্ষোভ মিছিল করেছে গণঅধিকার পরিষদবিক্ষোভ চলাকালে সংগঠনটির নেতা-কর্মীরা হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তার এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান। গতকাল দুপুরে গণঅধিকার পরিষদের নেতা-কর্মীরা রাজধানীর পল্টন মোড়ে জড়ো হয়ে একটি সংক্ষিপ্ত সমাবেশ করেন। পরে সেখান থেকে বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে তারা শাহবাগের উদ্দেশে রওনা দেন। বিক্ষোভ মিছিলের নেতৃত্ব দেন সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক রাশেদ খান।

সমাবেশে বক্তারা বলেন, শরিফ ওসমান হাদি ছিলেন একজন স্পষ্টভাষী মানুষ। জুলাইয়ের পরও তিনি ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে নিজের কণ্ঠস্বর অব্যাহত রেখেছিলেন। অন্যায়ের সঙ্গে কোনো ধরনের আপস করেননি। ঢাকা ছাড়াও গতকাল সারা দেশের বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ সমাবেশ করেছে।

খেলাফত মজলিসের সমাবেশ : শরিফ ওসমান হাদিকে হত্যার প্রতিবাদে বিক্ষোভ সমাবেশ করেছে খেলাফত মজলিস। গতকাল বাদ জুমা উত্তরা আজমপুর কেন্দ্রীয় ঈদগাহ মসজিদ থেকে শুরু হয়ে উত্তরা ৬ নম্বর সেক্টর, ৪ নম্বর সেক্টরের বিভিন্ন সড়ক ঘুরে এসে আজমপুর মেইন রোডে প্রতিবাদ সমাবেশের মাধ্যমে শেষ হয়। প্রধান অতিথি ছিলেন ঢাকা মহানগরী উত্তরের সভাপতি অধ্যক্ষ মাওলানা সাইফ উদ্দিন আহমদ খন্দকার।

উত্তাল জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় : জাবি প্রতিনিধি জানান, শরিফ ওসমান হাদি হত্যার ঘটনায় বিচারের দাবিতে বিক্ষোভে উত্তাল জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় (জাবি) ক্যাম্পাস। বৃহস্পতিবার রাতে গুলিবিদ্ধ হাদির মৃত্যুর খবর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে তাৎক্ষণিক রাত ১১টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলা এলাকায় শিক্ষার্থীরা জমায়েত হওয়া শুরু করেন। পরে জাকসু প্রতিনিধিদের নেতৃত্বে সেখান থেকে একটি প্রতিবাদ মিছিল নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে গিয়ে সমাবেশ করেন তারা। এ সময়, তারা হাদি হত্যার বিচার নিশ্চিতের শপথ পাঠ এবং তার রুহের মাগফিরাত কামনায় দোয়া মোনাজাত করেন।

বিক্ষোভ মিছিলে শিক্ষার্থীদের ‘ফ্যাসিবাদের দালালেরা, হুঁশিয়ার সাবধান’; ‘ভারতের দালালেরা, হুঁশিয়ার সাবধান’; ‘আমার ভাই শহীদ কেন, ইন্টেরিম জবাব দে’; ‘হাদি ভাইয়ের রক্ত, বৃথা যেতে দিব না’; ‘একটা একটা লীগ ধর, ধইরা ধইরা জবাই কর’; ‘আওয়ামী লীগের আস্তানা, ভেঙে দাও-গুঁড়িয়ে দাও’; ‘রুখে দাও জনগণ, ভারতীয় আগ্রাসন’ ইত্যাদি স্লোগান দিতে দেখা গেছে। এতে জাবি শাখা ইসলামী ছাত্রশিবির, জাতীয় ছাত্রশক্তি, আধিপত্যবাদ বিরোধী মঞ্চসহ বিভিন্ন সংগঠনের নেতা-কর্মীরা অংশ নেন। এ সময়, জাকসুর সাধারণ সম্পাদক ও শিবির নেতা মাজহারুল ইসলাম বলেন, ‘আওয়ামী লীগ আমাদের চিনতে পারেনি, ভারতও আমাদের চিনতে পারছে না। তারা ভেবেছে হাদিকে হত্যার মধ্য দিয়ে আমাদের আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে কথা বলা বন্ধ করে দিবে। কিন্তু তারা জানে না আমরা তিতুমীরের উত্তরসূরি।

জাকসুর ভিপি আবদুর রশিদ জিতু বলেন, ‘আমাদের লড়াই চলবে ভারতীয় আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে। আমাদের দেশের ৫৬ হাজার বর্গমাইলে কোনো আধিপত্যবাদীর থাবা পড়তে দেব না। আমরা হাদির ফেলে যাওয়া কাজ সম্পন্ন করব ইনশাল্লাহ।’ এ সময়, হাদির রেখে যাওয়া কাজ সমাপ্ত করার শপথ বাক্য পাঠ করান জাকসুর ভিপি আবদুর রশিদ জিতু। এ ছাড়া, শরিফ ওসমান হাদির হত্যার বিচার নিশ্চিতের জন্য শপথ নেন শিক্ষার্থীরা।

সারা দেশের মসজিদে হাদির জন্য দোয়া : ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরিফ ওসমান হাদির রুহের মাগফিরাত কামনায় সারা দেশে বিশেষ দোয়া অনুষ্ঠিত হয়েছে। গতকাল বাদ জুমা জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমসহ সারা দেশে তার জন্য দোয়া করা হয়। ইমামরা স্বতঃপ্রণোদিত হয়েই হাদির জন্য দোয়া করেন।

মোনাজাতের মাঝে ইমামরা বলেন, ‘শরিফ ওসমান হাদি ছিলেন এ দেশের বিপ্লবী কণ্ঠস্বর। তরুণ সমাজের কাছে প্রতিবাদের আদর্শ। সেই প্রতিবাদী তরুণের পরিবারকে যাতে মহান আল্লাহ ধৈর্য দেন, তার অপূর্ণতাকে যেন পূর্ণতায় ভরে দেন।’ এ সময় অনেকে কান্নায় ভেঙে পড়েন। মুসল্লিদের আমিন আমিন শব্দে মুখরিত হয় মসজিদগুলো।