জাগতিক জীবনের সবকিছু ছেড়ে মহান সৃষ্টিকর্তার আহ্বানে সাড়া দিয়ে চিরবিদায় নিয়েছেন বাংলাদেশের গণতন্ত্র ও সার্বভৌমত্বের প্রতীক, কিংবদন্তি রাজনীতিক ও আপসহীন দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া। দীর্ঘ অসুস্থতার পর গতকাল মঙ্গলবার ভোর ৬টায় রাজধানীর বসুন্ধরায় এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। তাঁর বয়স হয়েছিল ৭৯ বছর। বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটা অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি ঘটল।
গতকাল সকাল ৮টায় এভারকেয়ার হাসপাতালে এক সংবাদ সম্মেলনে বিএনপি চেয়ারপারসনের চিকিৎসায় গঠিত মেডিকেল বোর্ডের প্রধান অধ্যাপক ডা. শাহাব উদ্দীন তালুকদার বেগম খালেদা ইন্তেকালের কথা ঘোষণা করেন। আজ বাদ জোহর (বেলা ২টায়) জাতীয় সংসদ ভবনের সামনে ঐতিহাসিক মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে বেগম খালেদা জিয়ার জানাজা অনুষ্ঠিত হবে। জানাজায় নারীদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। জানাজা শেষে বেলা সাড়ে ৩টায় তাঁকে রাজধানীর জিয়া উদ্যানে শায়িত স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের কবরের পাশে দাফন করা হবে। সাবেক এই প্রধানমন্ত্রীর মৃত্যুতে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ও প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসসহ জাতীয় ও বিশ্বনেতারা গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন। শোকবার্তায় ড. ইউনূস বলেন, দেশের মানুষের হৃদয়ে অক্ষয় হয়ে থাকবেন বেগম খালেদা জিয়া। এদিকে জানাজায় অংশগ্রহণের সুবিধার্থে অতিরিক্ত মেট্রোরেল চলবে। এই মহীয়সী নারীর মৃত্যুতে অন্তর্বর্তী সরকার বাংলাদেশে আজ এক দিনের সাধারণ ছুটি এবং রাষ্ট্রীয়ভাবে তিন দিনের শোক কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। সকাল সাড়ে দশটায় রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় অনুষ্ঠিত উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত হয়। প্রধান উপদেষ্টার ব
খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে তাঁর গুলশানের কার্যালয়ে শোক ও পরিদর্শন বই খোলা হয়েছে। সেখানে গতকাল পর্যন্ত ২৮টি দেশের কূটনীতিক, কয়েকজন উপদেষ্টা, দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা ও বিশিষ্ট ব্যক্তিরা স্বাক্ষর করেছেন।
বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রপতি শহীদ জিয়াউর রহমানের সহধর্মিণী এবং দেশবিদেশে তথা দক্ষিণ এশিয়ায় নারী প্রধানমন্ত্রীদের মধ্যে জনপ্রিয় এ নেত্রী দীর্ঘ চার দশকেরও বেশি রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন। শেষ সময়ে খালেদা জিয়ার পাশে ছিলেন ১৭ বছর নির্বাসনের পর দেশে ফেরা জ্যেষ্ঠ পুত্র বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান, পুত্রবধূ ডা. জুবাইদা রহমান, নাতনি ব্যারিস্টার জাইমা রহমান, ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকোর স্ত্রী সৈয়দা শামিলা রহমান, ছোট ভাই শামীম এস্কান্দারসহ পরিবারের সদস্য, দলীয় নেতা-কর্মী ও শুভানুধ্যায়ীরা। গতকাল সংবাদ সম্মেলনে বিএনপির পক্ষ থেকে দলীয়ভাবে সাত দিনের শোক কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। এই সাত দিন দলীয় কার্যালয়ে কালো পতাকা, দলীয় পতাকা অর্ধনমিতকরণসহ নেতা-কর্মীরা কালো ব্যাজ ধারণ করবেন। এ সময় বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস, সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীসহ অন্যান্য দলীয় নেতা উপস্থিত ছিলেন।
বেগম খালেদা জিয়ার এই বিদায় শুধু একজন রাজনৈতিক নেত্রীর নয়, তিনি ছিলেন একটি প্রজন্মের সাহস। এটি মায়ের মতো সমগ্র জাতিকে আগলে রাখা এক অভিভাবকের বিদায়। তিনি নির্যাতিতকে সাহস দিয়েছেন, আশাহতকে ভরসা জুগিয়েছেন, হতাশ জনতাকে দেখিয়েছেন সামনে এগিয়ে যাওয়ার পথ। ছিলেন একটি জাতির আত্মবিশ্বাস, সংগ্রামের প্রতীক। নির্যাতন, কারাবাস, দেশিবিদেশি শত ষড়যন্ত্রের মুখেও তিনি আজীবন আপসহীন থেকেছেন গণতন্ত্র ও জনগণের অধিকারের প্রশ্নে। অন্যায় ও অবিচারের বিরুদ্ধে তিনি মাথা নত করেননি, আপস করেননি কখনো। বরং দেশ ও মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন দৃঢ়চেতা মনোবল নিয়ে। তাঁর কণ্ঠে ছিল দৃঢ়তা, মনে ছিল অটল বিশ্বাস, আর হৃদয়ের প্রতিটি স্পন্দনে ছিল বাংলাদেশ ও তার জনগণ।
গণতন্ত্রের প্রতি তাঁর এই অবিচল মনোভাব আর সুদীর্ঘ লড়াই-সংগ্রামের স্বীকৃতিস্বরূপ আন্তর্জাতিক বিশ্ব তাঁকে ‘মাদার অব ডেমোক্রেসি’, ‘ফাইটার অব ডেমোক্রেসি’সহ বিভিন্ন সম্মাননায় ভূষিত করেছে। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে অসামান্য অবদানের জন্য বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে ২০১৮ সালের ৩১ জুলাই মাদার অব ডেমোক্রেসি সম্মাননায় ভূষিত করে কানাডিয়ান হিউম্যান রাইটস ইন্টারন্যাশনাল অরগানাইজেশন (সিএইচআরআইও)। ওই সময় তিনি ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকারের মিথ্যা মামলায় অসুস্থ অবস্থায় কারান্তরিন ছিলেন পুরান ঢাকার নাজিমুদ্দিন রোডের পরিত্যক্ত কারাভবনে। চিকিৎসা লাভের মৌলিক অধিকারটুকুও তাঁর কেড়ে নিয়েছিল স্বৈরাচার আওয়ামী সরকার। ঠিক সেই অবস্থায় কানাডীয় প্রতিষ্ঠানটি দেশনেত্রীকে মাদার অব ডেমোক্রোসি অ্যাওয়ার্ড প্রদান করে। এর প্রায় সাড়ে তিন বছর পরে ২০২২ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি এক সংবাদ সম্মেলনে কানাডার এই প্রতিষ্ঠানটির দেওয়া ক্রেস্ট ও সনদপত্র সাংবাদিকদের সামনে উপস্থাপন করেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনসহ সারা দেশে সর্বস্তরের মানুষ এবং প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে। শোকাচ্
বেগম খালেদা জিয়ার জানাজা ও দাফনকার্য নির্বিঘ্নে করার জন্য প্রধান উপদেষ্টার বাসভবন, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং জাতীয় সংসদ ভবন এলাকায় একাধিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। প্রধান উপদেষ্টার নির্দেশ অনুযায়ী, সব ধরনের প্রস্তুতি সুচারুভাবে সম্পন্ন করা হয়েছে। জাতীয় এই নেতার জানাজায় দেশের সর্বস্তরের জনগণ যেন নির্বিঘ্নে অংশ নিতে পারে, সেজন্য সব রকম ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
এভারকেয়ার থেকে যে পথে নেওয়া হবে সংসদ ভবন এলাকায় : বসুন্ধরার এভারকেয়ার হাসপাতাল থেকে মরহুমার লাশ আজ সকালে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ পশ্চিম প্রান্তে নেওয়া হবে। রুটটি হলো-এভারকেয়ার হাসপাতাল-৩৬ জুলাই এক্সপ্রেসওয়ে-কুড়িল ফ্লাইওভার-নৌ সদর দপ্তর হয়ে বাসভবন ফিরোজা-গুলশান-২-কামাল আতাতুর্ক অ্যাভিনিউ-এয়ারপোর্ট রোড-মহাখালী ফ্লাইওভার-জাহাঙ্গীর গেট-বিজয় সরণি-উড়োজাহাজ ক্রসিং হয়ে ডানে মোড় নিয়ে জাতীয় সংসদ ভবনের ৬ নম্বর গেট দিয়ে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ পশ্চিম প্রান্তে নিয়ে যাওয়া হবে দেশনেত্রীর কফিন। তাঁর লাশ বহনকারী কনভয়ের যাতায়াতের সময় সংশ্লিষ্ট সড়কসমূহে যান চলাচল নিয়ন্ত্রিত থাকবে। এ ব্যাপারে পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে জনসাধারণের সহযোগিতা কামনা করা হয়।
ফাইটার ফর ডেমোক্রেসি : গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা ও রাজনৈতিক সংগ্রামে দীর্ঘ শক্তিশালী ভূমিকার স্বীকৃতি হিসেবে বেগম খালেদা জিয়া আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একাধিক সম্মাননা লাভ করেন। তার মধ্যে ২০১১ সালের ২৪ মে যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সি স্টেট সিনেট তাঁকে ফাইটার ফর ডেমোক্রেসি পদকে ভূষিত করে। যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট সিনেট কর্তৃক কোনো বিদেশি রাজনৈতিক নেতাকে এ ধরনের সম্মান দেওয়ার ঘটনা এটিই প্রথম ছিল বলে জানানো হয়। গণতন্ত্র, সাংবিধানিক শাসন ও স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে তাঁর অনবদ্য ভূমিকার স্বীকৃতি হিসেবেই এই সম্মাননা দেওয়া হয়। এসব আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ছিল বেগম খালেদা জিয়ার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা, ভোটাধিকার রক্ষা এবং স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে তাঁর ভূমিকা ও অবদানের প্রতিফলন।
সংক্ষিপ্ত জীবনী : বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) চেয়ারপারসন ও তিনবারের প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ১৯৪৬ সালের ১৫ আগস্ট অবিভক্ত ভারতের জলপাইগুড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ১৯৯১-১৯৯৬ সাল, ১৯৯৬ সালে মাস দুয়েক এবং ২০০১-২০০৬ সাল পর্যন্ত তিন দফায় ১০ বছর প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি বাংলাদেশের প্রথম ও মুসলিম বিশ্বের দ্বিতীয় মহিলা প্রধানমন্ত্রী। দেশের রাজনৈতিক সংকট নিরসন ও গণতন্ত্র রক্ষার্থে জাতীয় সংসদে নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিল পাস করানোর জন্য ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত সরকারে স্বল্প সময়ের জন্য তিনি প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন।
খালেদা জিয়ার পরিবার : বেগম খালেদা জিয়ার প্রকৃত নাম খালেদা খানম, ডাক নাম পুতুল। তিন বোন এবং দুই ভাইয়ের মধ্যে তিনি তৃতীয়। ভাইয়েরা সবার ছোট। তাঁর পিতামহ হাজি সালামত আলী, মাতামহ জলপাইগুড়ির তোয়াবুর রহমান। বাবা এস্কান্দার মজুমদার এবং মা বেগম তৈয়বা মজুমদার। খালেদা জিয়ার স্বামী শহীদ জিয়াউর রহমান বীরউত্তম স্বাধীনতার ঘোষক, মুক্তিযুদ্ধে প্রথম ব্রিগেড জেড ফোর্সের কমান্ডার ও সেক্টর কমান্ডার হিসেবে রণাঙ্গনে নেতৃত্ব দেন। তিনি বাংলাদেশের সাবেক সেনাপ্রধান, সাবেক ভিশনারি রাষ্ট্রনায়ক ছিলেন। তাঁর দুই ছেলের মধ্যে বড় ছেলে তারেক রহমান (জন্ম : ২০ নভেম্বর ১৯৬৭) বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির বর্তমান ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান। কনিষ্ঠ ছেলে আরাফাত রহমান কোকো (জন্ম : ১২ আগস্ট, ১৯৭০)। আরাফাত রহমান কোকো ২০১৫ সালের ২৪ জানুয়ারি মালয়েশিয়ার ইউনিভার্সিটি মালায়া হাসপাতালে হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে মারা যান। আরাফাত রহমান একজন ব্যবসায়ী ছাড়াও বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড ও সিটি ক্লাবের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
খালেদা জিয়ার স্থায়ী নিবাস : দিনাজপুর শহরের মুদিপাড়া খালেদা জিয়ার বাড়ি। আদি পিতৃভিটা ফেনী জেলার ফুলগাজী উপজেলার শ্রীপুর গ্রামের মজুমদার বাড়ি। বাবা এস্কান্দার মজুমদার ছিলেন একজন ব্যবসায়ী। এস্কান্দার মজুমদার ১৯১৯ সালে ফেনী থেকে জলপাইগুড়ি যান। বোনের বাসায় থেকে মেট্রিক পাস করেন ও পরে চা ব্যবসায়ে জড়িত হন। জলপাইগুড়ির নয়াবস্তি এলাকায় ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত তিনি বসবাস করেন। ১৯৮৪ সালের ১৫ নভেম্বর তিনি ইন্তেকাল করেন। মা বেগম তৈয়বা মজুমদার ছিলেন একজন গৃহিণী।
খালেদা জিয়ার বিয়ে : ১৯৬০ সালের আগস্ট মাসে ক্যাপ্টেন জিয়াউর রহমানের সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়। জিয়াউর রহমানের ডাক নাম কমল। জিয়া তখন ছিলেন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর একজন ক্যাপ্টেন। ডিএফআইয়ের অফিসার হিসেবে তখন দিনাজপুরে কর্মরত ছিলেন তিনি।
সংসার জীবন : ১৯৬৫ সালে খালেদা জিয়া স্বামীর সঙ্গে পশ্চিম পাকিস্তানে (বর্তমানে পাকিস্তান) যান। ১৯৬৯ সালের মার্চ পর্যন্ত করাচিতে স্বামীর সঙ্গে ছিলেন। এরপর ঢাকায় চলে আসেন। কিছুদিন জয়দেবপুর থাকার পর চট্টগ্রামে স্বামীর পোস্টিং হলে তাঁর সঙ্গে সেখানে এবং চট্টগ্রামের ষোলশহর একালায় বসবাস করেন। মুক্তিযুদ্ধের শুরুতে খালেদা জিয়া কিছুদিন আত্মগোপন করে থাকার পর ১৬ মে নৌপথে ঢাকায় চলে আসেন। বড় বোন খুরশিদ জাহানের বাসায় ১৭ জুন পর্যন্ত থাকেন। ২ জুলাই সিদ্ধেশরীতে এস আবদুল্লাহর বাসা থেকে পাকসেনারা তাঁকে দুই ছেলেসহ বন্দি করে। ১৯৭১ সালের ১৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত তিনি ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে বন্দি ছিলেন। ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ স্বাধীন হলে তিনি মুক্তি পান। রাজনীতিতে আসার আগপর্যন্ত বেগম জিয়া একজন সাধারণ গৃহবধূ ছিলেন। জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি থাকাকালীনও রাজনীতিতে বেগম জিয়ার কোনো উপস্থিতি ছিল না।
রাজনীতিতে বেগম জিয়া : ১৯৮১ সালের ৩০ মে কতিপয় উচ্চাভিলাষী সেনাসদস্যের এক ব্যর্থ সামরিক অভুত্থ্যানে জিয়াউর রহমান নিহত হন। এরপর বিএনপির বিভিন্ন স্তরের নেতা-কর্মীদের আহ্বানে তিনি ১৯৮২ সালের ৩ জানুয়ারি বিএনপিতে যোগ দেন। ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ তৎকালীন সেনাপ্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল এরশাদ বিচারপতি আবদুস সাত্তারকে ক্ষমতাচ্যুত করেন। বেগম জিয়া এর বিরোধিতা করেন। ১৯৮৩ সালের মার্চ মাসে তিনি বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান হন। ১৯৮৩ সালের ১ এপ্রিল দলের বর্ধিত সভায় তিনি প্রথম বক্তৃতা করেন। বিচারপতি সাত্তার অসুস্থ হয়ে পড়লে তিনি পার্টির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসন হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮৪ সালের ১০ মে দলের চেয়ারপারসন হিসেবে তিনি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন। তাঁর নেতৃত্বেই মূলত বিএনপির পূর্ণ বিকাশ হয়।
আন্দোলন-সংগ্রাম : ১৯৮৩ সালের বেগম জিয়ার নেতৃত্বে সাতদলীয় জোট গঠিত হয়। একই সময় এরশাদের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু হয়। বেগম জিয়া প্রথমে বিএনপিকে নিয়ে ১৯৮৩-এর সেপ্টেম্বর থেকে সাতদলীয় জোটের মাধ্যমে এরশাদবিরোধী আন্দোলন শুরু করেন। একই সময় তাঁর নেতৃত্বে ৭ দল আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৫ দলের সঙ্গে যৌথভাবে আন্দোলনের কর্মসূচি শুরু করে। ১৯৮৬ সাল পর্যন্ত পাঁচ দফা আন্দোলন চলতে থাকে। কিন্তু ১৯৮৬ সালের ২১ মার্চ রাতে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা এরশাদের অধীনে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনে বাধার সৃষ্টি হয়। ১৫ দল ভেঙে ৮ দল ও ৫ দল হয়। ৮ দল নির্বাচনে যায়। এরপর বেগম জিয়ার নেতৃত্বে ৭ দল, পাঁচদলীয় জোট আন্দোলন চালায় এবং সে নির্বাচন প্রত্যাখ্যান করে। ১৯৮৭ সাল থেকে খালেদা জিয়া ‘এরশাদ হটাও’ এক দফার আন্দোলন শুরু করেন। এর ফলে এরশাদ জাতীয় সংসদ ভেঙে দেন। পুনরায় শুরু হয় ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন। এরশাদের পতনের পর ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে বিএনপি। খালেদা জিয়া বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন। সেই নির্বাচনে খালেদা জিয়া মোট পাঁচটি আসনে অংশ নিয়ে সব কটিতেই
১৯৯১ সালের ১৯ মার্চ বেগম খালেদা জিয়া গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী নিযুক্ত হন। তাঁর সরকার দেশে প্রেসিডেন্সিয়াল পদ্ধতির বদলে সংসদীয় পদ্ধতির সরকার কায়েম করে। ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচন হয়। খালেদা জিয়া ও তাঁর দল একক নির্বাচন করে। এই সংসদ মাত্র ১৫ দিন স্থায়ী হয়। খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন। এ সংসদে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিল পাস হয় এবং পরে খালেদা জিয়া পদত্যাগ করেন। এটি মূলত দেশকে তৎকালীন সৃষ্ট গণতন্ত্র ও রাজনৈতিক সংকটের হাত থেকে রক্ষায় জাতীয় সংসদে নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিল পাস করানোর জন্যই তিনি এই নির্বাচনের আয়োজন করেন।
১৯৯৬ সালের ১২ জুন সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি মোট ১১৬ আসনে জয় লাভ করে। সে সংসদে বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্ববৃহৎ বিরোধী দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে বিএনপি। তিনি তখন বিরোধীদলীয় নেত্রী ছিলেন। ২০০১ সালের ১ অক্টোবর সংসদ নির্বাচনে বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট বিপুল ভোটে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করে। খালেদা জিয়া এই সংসদেও প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর এই সংসদের মেয়াদ শেষ হয়।
গ্রেপ্তার ও কারাগার : ১৯৭১ সালের ২ জুলাই ঢাকায় এক আত্মীয়ের বাসা থেকে দুই শিশু পুত্রসহ বেগম খালেদা জিয়াকে পাকবাহিনী গ্রেপ্তার করে কারাগারে রাখে। ১৯৮২ সালের ৩ জানুয়ারি বিএনপির প্রাথমিক সদস্য হিসেবে দলে যোগ দেওয়ার পর থেকে মোট ছয়বার তিনি গ্রেপ্তার হন। এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় ১৯৮৩ সালের ২৮ নভেম্বর, ১৯৮৪ সালের ৩ মে, ১৯৮৭ সালের ১১ নভেম্বর গ্রেপ্তার হন। ২০০৭ সালের সেপ্টেম্বর ৩ তারিখে পুত্রসহ গ্রেপ্তার হন। ২০০৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বর তিনি হাই কোর্টের নির্দেশে মুক্তিলাভ করেন। তত্ত্বাবধায়ক সরকার কর্তৃক গ্রেপ্তার হওয়ার পর দীর্ঘ এক বছর সাত দিন কারাগারে ছিলেন তিনি। ভোটারবিহীন দখলদার আওয়ামী লীগ সরকার রাজনৈতিক প্রতিহিংসায় দুদকের করা মামলায় ফরমায়েসি রায়ে ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি তাঁকে ১০ বছরের সাজা দেয়। তখন তিনি প্রায় আড়াই বছর নাজিমুদ্দিন রোডের পরিত্যক্ত ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে থাকেন। ফ্যাসিস্ট হাসিনার পলায়নের পর ২০২৪ সালের ৬ আগস্ট রাষ্ট্রপতির নির্বাহী আদেশে তিনি মুক্তি পান।
সেনানিবাসের বাসা থেকে উচ্ছেদ : ১৩ নভেম্বর ২০১০ বেগম জিয়াকে বলপ্রয়োগে তাঁর ৪০ বছরের আবাসস্থল ছেড়ে যেতে বাধ্য করা হয়। ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকারের অনুগত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা তাঁকে টেনেহিঁচড়ে নিজের বাসা থেকে বের করে। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সাল থেকে অ্যাডজুট্যান্ট জেনারেল হিসেবে জিয়াউর রহমানের সঙ্গে শহীদ মইনুল সড়কের ৬ নম্বর বাড়িতে ওঠেন খালেদা জিয়া। ১৯৮১ সালের ৩০ মে রাষ্ট্রপতি জিয়া চট্টগ্রামে এক ব্যর্থ সেনা অভ্যুত্থানে নিহত হলে ১২ জুন তৎকালীন অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি আবদুস সাত্তার সেনানিবাসের ওই বাড়িটি খালেদা জিয়ার নামে বরাদ্দ দেন। সে বাড়ি থেকে ফ্যাসিস্ট হাসিনা তাঁকে উচ্ছেদ করেন। বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে শোকে বিহ্বল পুত্র তারেক রহমান। মায়ের মৃত্যুর আট ঘণ্টা পর জাতির উদ্দেশে মাকে নিয়ে লিখেন নিজের আবেগ, অনুভূতি এবং মনের ভিতরের কথা। মমতাময়ী মা বেগম খালেদা জিয়ার রুহের মাগফিরাত কামনায় দেশবাসীর কাছে দোয়া চেয়েছেন তিনি।