দৃশ্যপট এক : গত বৃহস্পতিবার দুুপুর ১২টা। নির্বাচন কমিশন ভবনে এনআইডি সংশোধনের কাজে আসেন এক নারী। তার বাড়ি মুন্সিগঞ্জ। তার এনআইডিতে বয়স সংশোধন করতে হবে। এ জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দিয়ে আবেদন করেছিলেন। কিন্তু দীর্ঘদিন আবেদন ঝুলে থাকায় তিনি এক দালালের কাছে ১ লাখ টাকায় দফারফা করেন। তবে এতেকরে সংশোধন তো হয়ইনি, বরং দালাল তার নামে ভুয়া তদন্ত প্রতিবেদন তৈরি করে দিয়েছেন। এ কারণে তার সংশোধন আরও জটিল হয়ে পড়েছে। এবার তিনি তার সংশোধন আবেদন বাতিল করার জন্য ইসিতে এসেছেন, যাতে সব কাগজপত্র দিয়ে নতুন আবেদন করতে পারেন। ওই নারী বলেন, ‘কাজ না হলে দালাল টাকা ফেরত দেওয়ার কথা বলেছিল। কিন্তু টাকা নিয়ে দালাল লাপাত্তা হয়ে গেছে।’


দৃশ্যপট দুই : সম্প্রতি নির্বাচন প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটের সামনে চা খাচ্ছিলেন ইসির এক কর্মকর্তা। হঠাৎ এক দালাল তার কাছে এসে প্রশ্ন করে- কী সংশোধন করবেন? বয়স, না নাম? তখন ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘বয়স সংশোধন করব।’ তখন দালাল বলে, ‘এক বছর বয়স সংশোধন করতে ১০ হাজার টাকা লাগবে। আর ৪-৫ বছর সংশোধন করতে লাগবে ৫০ হাজার টাকা।’ তখন ওই কর্মকর্তা দালালকে ধরার জন্য কর্মচারীদের ডাকতে থাকেন। পরে ওই দালাল দৌড়ে পালিয়ে যায়।


দৃশ্যপট তিন : সাদেক নামে নরসিংদীর এক ব্যক্তি নির্বাচন কমিশনে আসেন তার ছোট ভাইয়ের এনআইডি সংশোধনের কাজে। এই  প্রতিবেদককে তিনি জানান, তার ভাই ইতালিতে রয়েছেন। সেখানে তিনি ক্যাম্পে আটকা আছেন। তার এনআইডিতে ১০ বছর বয়স সংশোধন করতে হবে। তা না হলে তিনি ইতালিতে থাকতে পারবেন না। নরসিংদীর এক দালাল নাম ও বয়স সংশোধনের জন্য ৫ লাখ টাকা চেয়েছে। তাই তিনি নির্বাচন কমিশনে এসেছেন সংশোধনের খবর নিতে। এক সপ্তাহ ধরে নির্বাচন ভবনে সরেজমিন ঘুরে এনআইডি সংশোধনের এসব নানা অনিয়মের চিত্র পাওয়া গেছে। জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) সংশোধনের ভোগান্তি ও দালাল চক্রের দৌরাত্ম্যের এই চিত্র নতুন নয়। ঢাকার নির্বাচন ভবনসহ সারা দেশের নির্বাচন অফিসেই দালাল চক্রের দৌরাত্ম্য দিনদিন বেড়ে চলেছে। এমনকি এনআইডি সংশোধনের দায়িত্বে থাকা শীর্ষ কর্মকর্তাদের নামেও অভিযোগ পাওয়া গেছে। মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে তারাও সংশোধন করে দিচ্ছেন। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নাগরিকরা দ্রুত ও জটিল সংশোধনের জন্য দালালদের সঙ্গে মোটা অঙ্কের টাকা লেনদেন করছেন। অনেকে সংশোধন করতেও পারছেন। আবার অনেকে করতে পারছেন না। তবে নাগরিকদের অভিযোগ, নির্বাচন কমিশন অফিসের কর্মকর্তারা যদি সহযোগিতা করত, তবে কেউ দালালের কাছে যেত না।


আবার ইসির বেশ কিছু কর্মকর্তার অভিযোগ, ইসি এনআইডি সংশোধনের বিষয়ে মাঝে মাঝেই সিদ্ধান্ত বদল করে। কখনো মাঠ কর্মকর্তাদের ক্ষমতা কমানো হয়, কখনো বাড়নো হয়। আবার কখনো ইসির এনআইডি অনুবিভাগের শীর্ষ কর্মকর্তাদের হাতে ব্যাপক ক্ষমতা দেওয়া হয়। এসব কারণেই জটিলতা বেশি হয়। তবে এনআইডি সংশোধনের ক্ষমতা বিকেন্দ্রিকরণ করলে নাগরিকের ভোগান্তি কমবে বলে মত দেন অনেক কর্মকর্তা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা বলেন, ‘বর্তমানে এনআইডি সংশোধনের ক্ষমতা ও ফাইল উপস্থাপন করার এখতিয়ার মাত্র কয়েকজনের হাতে। বিশেষ করে এনআইডি সংশোধনের নতুন ফাইল উপস্থাপনের অনুমতি দেওয়ার ক্ষমতা মাত্র একজনকে দিয়েছে কর্তৃপক্ষ।’ তার অভিযোগ, সংশোধন প্রক্রিয়া সহজ ও বিকেন্দ্রিকরণ না করার কারণেই দালালের দৌরাত্ম্য বাড়ছে। নির্বাচন কমিশনের এনআইডির সংশোধনের দায়িত্বে থাকা শীর্ষ কর্মকর্তারাও অবৈধ লেনদেনের সঙ্গে জড়িত। তারা তাদের পছন্দের কর্মকর্তাদের সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন অঞ্চলের সংশোধনীর দায়িত্বে রেখেছেন, যাতে তাদের কথার বাইরে কোনো কাজ না হয়। অভিযোগ রয়েছে, অনেক শীর্ষ কর্মকর্তার মাসিক অবৈধ আয় ১০-১৫ লাখ টাকারও বেশি।


প্রসঙ্গত, জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) নাগরিকের পরিচয়ের অন্যতম প্রধান প্রমাণ। ব্যাংক হিসাব খোলা, আর্থিক লেনদেন, সিম নিবন্ধন, পাসপোর্ট তৈরি থেকে শুরু করে সরকারি-বেসরকারি নানা সেবা পেতে এই পরিচয়পত্রের ওপর নির্ভর করতে হয়। কিন্তু এনআইডির সংশোধনকে কেন্দ্রে করে ভয়ংকর চক্র দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়েছে। জানা গেছে, এই চক্র ফেসবুক ও হোয়াটসঅ্যাপে নানা গ্রুপ খুলে তাদের কার্যক্রম চালাচ্ছে। অভিযোগ উঠেছে, এনআইডি জালিয়াতি করে অন্যের জমি দখল করারও ঘটনা ঘটেছে। সবমিলিয়ে ইসির তথ্যভান্ডার নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। নাগরিকের তথ্য অবৈধভাবে বেচাকেনা হচ্ছে। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, গত ১৫ জানুয়ারি জাতীয় পরিচয়পত্র জালিয়াতি ও নাগরিকের গোপনীয় তথ্য অবৈধভাবে বিক্রির অভিযোগে নির্বাচন কমিশনের একজন কর্মীসহ দুজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। নাগরিকের তথ্য বেচাকেনায় মাসে কোটি টাকার বেশি লেনদেন করতেন তারা। ব্রেইন স্টেশন ২৩ পিএলসির সাইবার নিরাপত্তা বিভাগ সাইবারস্টেশন সূত্র জানায়, দেশের ১৮ লাখেরও বেশি নাগরিকের তথ্য ডার্ক ওয়েবে পাওয়া গেছে। দেশের ১৫টি খাতের ৭৬৭টি ডোমেইন পর্যালোচনা করে প্রায় সবকটির ক্ষেত্রেই ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁসের প্রমাণ পেয়েছে এই সংস্থাটি। এদিকে ইসির এনআইডি অনুবিভাগের এক প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, বর্তমানে প্রায় ১ লাখ ৩৫ হাজার আবেদন নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে। গড়ে মাসে ৮০ হাজার থেকে ১ লাখ নতুন আবেদন জমা পড়ে। নতুন আবেদন আসার কারণে কিছু আবেদন পেন্ডিং রয়েছে।


ইসির এক কর্মকর্তা জানান, এনআইডি সার্ভারের তথ্য অনৈতিকভাবে সংশোধন, স্থানান্তরের জন্য ইউজার আইডি, পাসওয়ার্ড এবং ওটিপি দেওয়া হতো একটি হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে। আর এজন্য প্রতিদিন মিলত ৫ হাজার টাকা। হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপের ওই চক্রটি আবার তা সরবরাহ করত বিভিন্ন কম্পিউটার কম্পোজের দোকানে। আর এভাবেই চলত রমরমা ব্যবসা। নির্বাচন কমিশনের (ইসি) কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ঘটনাটি ঘটেছে বাগেরহাটের মোংলা উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তার কার্যালয়ে। আর এ কাজটি চলছিল অফিস সহকারী রনি গাইন-এর আইডি থেকে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশনার আবদুুর রহমানেল মাছউদ বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ইসি নাগরিকদের সেবা দিচ্ছে। অভিযোগ থাকলে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।