২ আগস্ট, ঘড়ির কাঁটায় তখন দুপুর ১২টা ৪০ মিনিট। আদালতের কার্যক্রম শুরু হওয়ার কথা অনেক আগেই। কিন্তু ঢাকার উত্তরা থেকে আসা বৃদ্ধ মাহবুব দাঁড়িয়ে আছেন আদালতের বারান্দায়। উদ্বিগ্ন কণ্ঠে মোবাইল ফোনে স্বজনদের জানান, ‘বিচারক এখনো এজলাসে বসতে পারেননি। তাই মামলার শুনানি শুরু হয়নি। কখন হবে, তাও জানা নেই। বাসায় ফিরতে দেরি হবে।’ মাহবুব একা নন। তাঁর পাশেই মামলার নথি হাতে অপেক্ষায় আইনজীবী, কিছুটা দূরে আছে প্রতিপক্ষের লোকজন। গত রবিবার সরেজমিন ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (সিএমএম) ৩১, ৩৪, ৩৬ ও ৩৭ নম্বর আদালতের বারান্দায় এমন অসংখ্য মানুষের দীর্ঘ অপেক্ষার দৃশ্য দেখা গেছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিচারক আদালতে উপস্থিত থাকলেও অনেক ক্ষেত্রে বিচারকাজ শুরু করতে পারছেন না। কারণ, তাঁর বসার জন্য খালি এজলাস নেই। যে কক্ষে তিনি বসবেন, সেখানে তখন অন্য একজন বিচারক বিচারকাজ পরিচালনা করছেন। ওই বিচারক কাজ শেষ করে কক্ষ ছাড়ার পরই পরবর্তী বিচারক এজলাসে বসতে পারেন। এটি কোনো এক দিনের ঘটনা নয়; বরং দেশের অন্যতম ব্যস্ত ফৌজদারি আদালতের প্রতিদিনের বাস্তব চিত্র। বিচারক আছেন, মামলার নথি প্রস্তুত, আইনজীবী ও বিচারপ্রার্থীরাও উপস্থিত- তবু শুধু এজলাসের অভাবে একই কক্ষে পালাক্রমে দুই বিচারককে বিচারকাজ পরিচালনা করতে হচ্ছে। আদালতসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ঢাকার সিএমএম আদালতে বর্তমানে মোট ৪৫ জন বিচারক কর্মরত। এর মধ্যে আটজন স্পেশাল মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তাঁদের মধ্যে তিনজন ঢাকা সিটি করপোরেশন আদালতে, একজন নৌ আদালতে এবং চারজন ডিপিডিসি আদালতে বিচারকাজ পরিচালনা করেন। বাকি ৩৭ জন বিচারকের জন্য সিএমএম আদালতে রয়েছে মাত্র ৩৩টি এজলাস। ফলে অন্তত চারজন বিচারকের জন্য কোনো স্থায়ী এজলাস নেই।
এ সংকটের কারণে প্রতিদিনই চারজন বিচারক আদালতে সময়মতো উপস্থিত হলেও সঙ্গে সঙ্গে বিচারকাজ শুরু করতে পারেন না। একজন বিচারকের বিচারকাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত অন্যজনকে অপেক্ষা করতে হয়। কখনো কখনো সেই অপেক্ষা কয়েক ঘণ্টায় গড়ায়। এতে প্রতিদিনই নষ্ট হচ্ছে মূল্যবান কর্মঘণ্টা, ব্যাহত হচ্ছে বিচারিক কার্যক্রম। সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ছেন বিচারপ্রার্থীরা। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে, এমনকি রাজধানীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকেও মানুষ ভোরে রওনা হয়ে আদালতে পৌঁছান। কিন্তু এজলাস সংকটের কারণে তাঁদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়। অনেক সময় নির্ধারিত দিনেও শুনানি শেষ করা সম্ভব হয় না; নতুন তারিখ নির্ধারণ করা হয়। এতে বাড়ছে যাতায়াত ব্যয়, নষ্ট হচ্ছে কর্মদিবস, ভোগান্তিও বাড়ছে কয়েক গুণ। ঢাকা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক আবুল কালাম খান বাংলাদেশ প্রতিদিনকে জানান, হাজারো মানুষ ন্যায়বিচারের আশায় ঢাকার সিএমএম আদালতে আসেন। কিন্তু বিচারপ্রক্রিয়ার শুরুতেই তাঁদের থমকে যেতে হয় একটি মৌলিক সংকটে- এজলাসের অভাবে। বিচারক আছেন, মামলা আছে, আইনজীবী আছেন, বিচারপ্রার্থীও উপস্থিত; নেই শুধু পর্যাপ্ত বিচারকক্ষ। তিনি আরও বলেন, বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর ‘প্রশ্ন’ কবিতায় লিখেছিলেন, বিচারের বাণী নীরবে নিভৃতে কাঁদে। কিন্তু ঢাকার সিএমএম আদালতের বর্তমান বাস্তবতা ও এজলাস-সংকটের কারণে বিচারের বাণী আর নীরবে নয়, আদালতের বারান্দায় যেন সরব হয়ে কাঁদছে। এজলাস সংকটের বিষয়ে জানতে চাইলে সুপ্রিম কোর্টের মুখপাত্র ও স্পেশাল অফিসার মো. মাজহারুল হক বলেন, অধস্তন আদালতের অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট এবং আইন ও বিচার বিভাগ কাজ করছে। যতটুকু জানি, এজলাস সংকট দূরীকরণে অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য প্রকল্প গ্রহণের প্রক্রিয়া চলমান।