হামজা দেওয়া চৌধুরী এলেন রূপকথার রাজপুত্রের মতোই। বাংলাদেশের ঘুমন্তপুরীকে জাগিয়ে তুললেন এক ম্যাচ খেলেই। ভারতের মাটিতে গত মার্চে অসাধারণ পারফর্ম করেন তিনি। ড্রিবলিং, ব্লক, ট্যাকলের এক নতুন সৌন্দর্য উপহার দেন। সেই ম্যাচের পর দক্ষিণ এশিয়ার ফুটবল ইতিহাসে এক নতুন দিগন্তের উন্মোচন হয়। বাংলাদেশের জার্সিতে এমন এক তারকা ফুটবলার খেলতে শুরু করেন, যার খ্যাতি দুনিয়াজোড়া পৌঁছে গিয়েছিল অনেক আগেই। এশিয়ান ফুটবলের অন্যতম সেরা এই তারকা এরপর দিনে দিনে ভক্তের সংখ্যা কেবল বাড়িয়েছেন।
গত জুনে ভুটানের বিপক্ষে লাল-সবুজের জার্সিতে প্রথম গোল করেন হামজা। এরপর গত অক্টোবরে গোল করেন হংকংয়ের বিপক্ষে। তবে সবকিছুকে ছাপিয়ে যায় গত নভেম্বরে নেপালের বিপক্ষে বাইসাইকেল কিক গোলটি। জামাল ভূঁইয়ার ক্রসে মাপজোখ ঠিক করে লাফিয়ে ওঠে গোলটি করেন তিনি। ঢাকা জাতীয় স্টেডিয়ামের দর্শকদের জন্য এটা ছিল এক বিরল দৃশ্য। হামজা চৌধুরী এখন কোটি কোটি ফুটবলপ্রেমীর হৃদয়ে বসবাস করেন।
কয়েক বছর আগেও ফুটবলের দুর্দিন নিয়ে কত কথাই না হয়েছে। মাইকিং করেও টিকিট বিক্রি করা সম্ভব হতো না। ফ্রি দিলেও দর্শক আসত স্টেডিয়ামে। অথচ এখন! টিকিট বিক্রি শুরু হওয়ার অপেক্ষায় থাকে লাখো দর্শক। অনলাইনে মাত্র তিন মিনিটেই শেষ হয়ে যায় গ্যালারির আসন। ম্যাচের দিন অতিরিক্ত দর্শকদের চাপ সামলাতে বাড়তি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হয়। ২০২৫ সালে এক নতুন অভিজ্ঞতা হয়েছে ফুটবল ফেডারেশনের। তাবিথ আউয়ালের নেতৃত্বে নতুন কমিটি দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই একে একে নতুন নতুন ঘটনা ঘটেছে। হামজার পথ ধরে আরও অনেকে এসেছেন লাল-সবুজের জার্সি গায়ে জড়াতে। কানাডা থেকে সামিত সোম, যুক্তরাষ্ট্র থেকে জায়ান, ইতালি থেকে ফাহমিদুলরা খেলতে এসে এক ভিন্ন উচ্চতায় নিয়ে গেছেন দেশের ফুটবলকে। একসময় স্পন্সরদের ডেকেও সাড়া পাওয়া যেত না। বর্তমানে ফুটবলের সঙ্গে যুক্ত হতে স্পন্সররা প্রতিযোগিতা করছেন।
হামজার আগমনে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় অর্জন ছিল ভারতের বিপক্ষে দারুণ এক জয়। গত ১৮ নভেম্বর ঢাকা জাতীয় স্টেডিয়ামে ভারতকে ১-০ গোলে পরাজিত করেন হামজারা। ২২ বছর পর ভারতের বিপক্ষে এই জয় দেশের ফুটবলপাগল দর্শকদের জন্য ছিল সবচেয়ে বড় পাওয়া।
অবশ্য কেবল হামজাই নন, ২০২৫ সালে বাংলাদেশ ফুটবল নতুন আরও বেশ কিছু মাইলফলক স্থাপন করেছে। প্রথমবারের মতো নারী এশিয়ান কাপের চূড়ান্ত পর্বে খেলার যোগ্যতা অর্জন করেন আফঈদা খন্দকাররা। আগামী বছরের মার্চে অস্ট্রেলিয়ায় চূড়ান্ত পর্বে খেলতে যাবে বাংলাদেশ। অনূর্ধ্ব-২০ দলের মেয়েরাও এশিয়ান কাপের চূড়ান্ত পর্ব নিশ্চিত করেছে। অনূর্ধ্ব-২০ দলের মেয়েরা সাফের শ্রেষ্ঠত্বও অর্জন করেছে গত জুলাইয়ে। মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাব ইতিহাস গড়ে ঘরোয়া ফুটবলে। প্রথমবারের মতো পেশাদার লিগ জয় করে বসুন্ধরা কিংস ও আবাহনীর মতো দাপুটে দলগুলোকে পেছনে ফেলে।
ফুটবলের জন্য ২০২৫ সাল একটা মাইলফলক হয়ে থাকবে। এত এত অর্জনের এ বছর হবে সামনের জন্য অনুপ্রেরণারও।