ইরানকে চাপে রাখতে দীর্ঘদিন ধরে আরোপিত আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা এখন ক্রমশ কার্যকারিতা হারাচ্ছে। আর এই প্রক্রিয়াকে আরও ত্বরান্বিত করেছে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধ। বিশ্লেষকদের মতে, নিষেধাজ্ঞা সরকারের পরিবর্তে সাধারণ জনগণকেই বেশি ক্ষতিগ্রস্ত করে-এমন সমালোচনা বহুদিনের। তবে সাম্প্রতিক সংঘাত দেখিয়ে দিচ্ছে, অতিরিক্ত নির্ভরতার ফলে এসব নিষেধাজ্ঞা নিজেই দুর্বল হয়ে পড়ছে।


বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই যুদ্ধ শুধু সামরিক নয়, অর্থনৈতিক কাঠামোতেও বড় পরিবর্তন আনছে। এর ফলে বিকল্প বাণিজ্য পদ্ধতি, ডলারবিমুখতা (ডি-ডলারাইজেশন) এবং অনানুষ্ঠানিক আর্থিক নেটওয়ার্কের ব্যবহার বাড়ছে-যা যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা ব্যবস্থাকে পাশ কাটানোর পথ তৈরি করছে।


ডলারের আধিপত্যে চ্যালেঞ্জ

যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে বৈশ্বিক বাণিজ্যে ডলারের প্রভাবকে ব্যবহার করে নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করে আসছে। ডলারে লেনদেন হওয়ায় নিষিদ্ধ দেশগুলোর জন্য আন্তর্জাতিক বাণিজ্য কঠিন হয়ে পড়ে। তবে এখন সেই আধিপত্য চ্যালেঞ্জের মুখে।


বিশেষ করে ক্রিপ্টোকারেন্সির ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। ব্লকচেইন বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠান চেইন অ্যানালাইসিস-এর তথ্যানুযায়ী, ২০২৫ সালে নিষেধাজ্ঞাপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে ক্রিপ্টোকারেন্সির প্রবাহ ৬৯৪ শতাংশ বেড়ে ১৫৪ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে, যা আগের বছরের ৫৯ বিলিয়ন ডলার থেকে অনেক বেশি।


ইরান এই ক্রিপ্টো সম্পদকে চীনের মুদ্রা রেনমিনবিতে রূপান্তর করে এবং তা দিয়ে রাশিয়া ও এশিয়ার অন্যান্য দেশের সঙ্গে বাণিজ্য চালাচ্ছে। এতে বিকল্প আর্থিক কাঠামো আরও শক্তিশালী হচ্ছে।


হরমুজ প্রণালী ও নতুন অর্থনৈতিক কৌশল

বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন রুট হরমুজ প্রণালী নিয়ন্ত্রণে নিয়ে ইরান নতুন কৌশল গ্রহণ করেছে বলে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। এই পথে চলাচলকারী জাহাজ থেকে ব্যারেলপ্রতি ফি আদায় করা হচ্ছে, যা বিটকয়েন বা রেনমিনবিতে পরিশোধের সুযোগ রাখা হয়েছে।


বিশ্লেষকদের মতে, এতে ডলারের ওপর নির্ভরতা কমাতে অন্যান্য দেশ ও কোম্পানিও উৎসাহিত হচ্ছে। বর্তমানে উপসাগরীয় অঞ্চলে প্রায় ১৭৫ মিলিয়ন ব্যারেল তেলবাহী জাহাজ অবস্থান করছে-যা থেকে আংশিক রাজস্ব আদায়ও বড় অংকের আয় তৈরি করতে পারে।


হাওয়ালা ও বিকল্প লেনদেনের বিস্তার

প্রচলিত ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে থাকা হাওয়ালা পদ্ধতি নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে। এই ব্যবস্থায় মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে অর্থ স্থানান্তর হয়, যেখানে সরাসরি অর্থ পাঠানোর প্রয়োজন পড়ে না।


ইরান বিভিন্ন দেশে প্রতিষ্ঠিত শেল কোম্পানি ও বিশ্বস্ত নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে আমদানি-রফতানি কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। এতে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোও অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হওয়ায় তারা এই ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত থাকতে আগ্রহী।


পণ্য বিনিময় (বার্টার) বাণিজ্যের প্রসার

নিষেধাজ্ঞা এড়াতে পণ্য বিনিময় পদ্ধতিও বাড়ছে। উদাহরণ হিসেবে, ২০২১ সালে ইরান ও শ্রীলঙ্কা চায়ের মাধ্যমে ঋণ পরিশোধের চুক্তি করে। এছাড়া পাকিস্তান, ভারত ও রাশিয়ার সঙ্গে বিভিন্ন পণ্য বিনিময় চুক্তির সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে।


বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, হরমুজ প্রণালীকেও ভবিষ্যতে এই বার্টার অর্থনীতির অংশ হিসেবে ব্যবহার করা হতে পারে।


ধীরে ধীরে ক্ষয়, দ্রুত পতন নয়

তবে ডলারের আধিপত্য দ্রুত শেষ হয়ে যাচ্ছে-এমনটা এখনই বলা যাচ্ছে না। বর্তমানে বিশ্বে প্রায় ৮০ শতাংশ তেল লেনদেন ডলারে হয় এবং বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভের প্রায় ৫৭ শতাংশ এখনও ডলারে সংরক্ষিত। তুলনায় রেনমিনবির অংশ মাত্র ২ শতাংশ।


তবুও বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান যুদ্ধ একটি ধীর কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের সূচনা করেছে। এতে নিষেধাজ্ঞা ব্যবস্থার ভিত্তিই প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে এবং ধীরে ধীরে একটি বিকল্প বৈশ্বিক অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ে উঠছে।


কৌশলগত উল্টো ফল?

বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য, এই যুদ্ধ এমন একটি বাস্তবতা তৈরি করেছে যা এর পরিকল্পনাকারীরা হয়তো অনুমান করেননি। ইরানকে বিচ্ছিন্ন করার বদলে বরং দেশটির বিকল্প অর্থনৈতিক নেটওয়ার্ক আন্তর্জাতিকভাবে বিস্তৃত হয়েছে।


এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে সবচেয়ে বড় ক্ষতির মুখে পড়তে পারে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা ব্যবস্থা-এবং এর সঙ্গে জড়িত ডলারের বৈশ্বিক আধিপত্যও।