ইরানের নতুন শান্তি প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এর পরপরই আন্তর্জাতিক বাজারে আবারও বেড়েছে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম।
বিনিয়োগকারীদের আশঙ্কা, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত আরও তীব্র হলে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন পথ হরমুজ প্রণালী দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকতে পারে, যা বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করবে।
সোমবার আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম প্রায় ২ দশমিক ৯ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১০৪ দশমিক ২ ডলারে পৌঁছেছে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের বেঞ্চমার্ক ডব্লিউটিআই অপরিশোধিত তেলের দাম ২ দশমিক ৪ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ব্যারেলপ্রতি ৯৭ দশমিক ৭ ডলারে।
নিজস্ব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প বলেন, ইরানের সর্বশেষ শান্তি প্রস্তাব ‘সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য’।
ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের দাবি, তেহরান আলোচনার শর্ত হিসেবে হরমুজ প্রণালীর ওপর নিজেদের সার্বভৌম কর্তৃত্ব স্বীকৃতি এবং যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ দাবি করেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের এই অবস্থান মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে উত্তেজনা বাড়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
স্যাক্সো ব্যাংকের কৌশল বিশ্লেষক নীল উইলসন বলেন, পরিস্থিতি আবারও সংঘাতের দিকে যেতে পারে। তবে একই সঙ্গে নতুন কোনও সমঝোতার প্রচেষ্টাও দেখা যেতে পারে।
ইরান যুদ্ধ শুরুর পর থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম প্রায় ৪৫ শতাংশ বেড়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালী কার্যত অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছে। সাধারণত এই জলপথ দিয়ে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহ পরিবহন করা হয়।
যদিও সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত বিকল্প রুট ব্যবহার করে কিছু জ্বালানি রফতানি অব্যাহত রেখেছে, তবুও প্রতিদিন প্রায় ১ কোটি থেকে ১ কোটি ২০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল বৈশ্বিক বাজারে পৌঁছাতে পারছে না বলে জানিয়েছেন বিশ্লেষকরা।
জেফারিজের প্রধান ইউরোপীয় অর্থনীতিবিদ মোহিত কুমার বলেন, এখনও আলোচনার মাধ্যমে সমঝোতার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে উভয় পক্ষই আলোচনায় নিজেদের শক্ত অবস্থান নিশ্চিত করতে চাইছে। তিনি সতর্ক করে বলেন, “হরমুজ প্রণালী যত দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকবে, বৈশ্বিক অর্থনীতির ওপর এর নেতিবাচক প্রভাব ততই বাড়বে।”
বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা অব্যাহত থাকলে শুধু জ্বালানি বাজার নয়, বিশ্ব বাণিজ্য, পরিবহন খরচ এবং বিভিন্ন দেশের মূল্যস্ফীতির ওপরও বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে।
উল্লেখ্য, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের ওপর যৌথভাবে হামলা শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। এই দুই দেশই অত্যাধুনিক যুদ্ধ সরঞ্জামের অধিকারী। হামলার শুরুতেই ইরানের বহু সংখ্যক লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানে মার্কিন ও ইসরায়েলি বাহিনী। এতে দেশটির তৎকালীন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনিসহ বহু শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তা নিহত হন। এছাড়াও স্কুলে হামলা চালিয়ে অন্তত ১৭০ শিক্ষার্থীকে হত্যা করা হয়। গোটা দেশ যেন ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়।
তবে চুপ করে বসে থাকেনি ইরানও। তৎক্ষণাৎ পাল্টা হামলা শুরু করে মধ্যপ্রাচ্যের দেশটি। ইসরায়েল ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ও স্থাপনায় ভয়াবহ হামলা চালায়। এতে গোটা মধ্যপ্রাচ্য অগ্নিগর্ভে পরিণত হয়। সেই সঙ্গে বন্ধ করে দেয় বিশ্ব জ্বালানি বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রুট হরমুজ প্রণালী। এতে বিশ্বজুড়ে জ্বালানির বাজারে দেখা দেয় অস্থিরতা। গোটা দুনিয়াকে ঠেলে দেয় অর্থনৈতিক মন্দার দিকে।
টানা ৩৯ দিন ধরে এই যুদ্ধ চলে। অবশেষে গত ৮ এপ্রিল পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় দুই সপ্তাহের সাময়িক যুদ্ধবিরতিতে রাজি হয় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। ১১ এপ্রিল ইসলামাবাদে শান্তি আলোচনায় বসে দুই দেশ। কিন্তু সেই আলোচনা ব্যর্থ হয়।
পরবর্তীতে অস্থায়ী যুদ্ধবিরতির মেয়াদ শেষ হলে সেটিকে এক রকম একক সিদ্ধান্তে অনির্দিষ্টকালের জন্য সম্প্রসারিত করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এরপর থেকে পাকিস্তানের মাধ্যমে শান্তিচুক্তির চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে আমেরিকা। তবে রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত অচলাবস্থা কাটেনি।