পাকিস্তানের সেনাবাহিনী সম্প্রতি তাদের অস্ত্রাগারে যুক্ত করেছে অত্যাধুনিক সুপারসনিক ক্রুজ মিসাইল 'ফাতাহ-৩'। প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, এই মিসাইলটি কেবল পাকিস্তানের সামরিক শক্তিই বাড়াবে না, বরং দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের দীর্ঘদিনের একক আধিপত্যের মুখে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে। বিশেষ করে ভারতের রুশ-নির্মিত 'ব্রহ্মোস' মিসাইলের পাল্টা জবাব হিসেবে ফাতাহ-৩-কে দেখছেন বিশ্লেষকরা।
চীনের তৈরি এইচডি-১ মিসাইলের প্রযুক্তিতে তৈরি এই ফাতাহ-৩ মিসাইলটি শব্দের চেয়ে ২.৫ থেকে ৪ গুণ দ্রুতগতিতে (ম্যাক ২.৫ - ৪) লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম। এটি প্রায় ২৯০ থেকে ৪৫০ কিলোমিটার পাল্লার মধ্যে থাকা শত্রুর যুদ্ধজাহাজ বা স্থলভাগের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা গুঁড়িয়ে দিতে পারে। এর সমুদ্রপৃষ্ঠ ঘেঁষে উড়ে যাওয়ার ক্ষমতা রাডার ব্যবস্থাকে ফাঁকি দিতে অত্যন্ত কার্যকর। ফলে প্রতিপক্ষের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বিভ্রান্ত হয়।
প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক গ্যাব্রিয়েল হোনরাডার মতে, এই মিসাইলটি পাকিস্তানের 'প্রাক-প্রচলিত সংঘাত' কৌশলের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠবে। পাকিস্তানের বর্তমান সামরিক ডকট্রিন অনুযায়ী, সরাসরি পারমাণবিক যুদ্ধে না গিয়েও ভারতের কৌশলগত এবং পারমাণবিক কমান্ড সেন্টারগুলোতে নিখুঁতভাবে প্রচলিত হামলা চালানোর সক্ষমতা অর্জন করল ইসলামাবাদ। এটি ভারতের ব্রহ্মোস মিসাইলের মাধ্যমে পাওয়া গত কয়েক বছরের একতরফা সুবিধাকে সীমিত করে দেবে।
২০২৫ সালের মে মাসে কাশ্মীর সীমান্ত নিয়ে উত্তেজনার সময় ভারত পাকিস্তানের নূর খান এয়ারবেসের কাছে ব্রহ্মোস মিসাইল মোতায়েন করেছিল। সেই সময় পাকিস্তানের এই ধরনের সুপারসনিক ক্রুজ মিসাইলের অভাব স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছিল। ফাতাহ-৩ এখন সেই শূন্যস্থান পূরণ করবে এবং দক্ষিণ এশিয়ায় দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বীর মধ্যে একটি 'প্রচলিত শক্তির ভারসাম্য' তৈরি করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তবে এই মিসাইলের প্রভাব কেবল দক্ষিণ এশিয়ায় সীমাবদ্ধ নয়। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, পাকিস্তান এখানে চীনের হয়ে একটি মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করতে পারে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো যেমন; সৌদি আরব, যারা ইরানের ক্রমবর্ধমান সামরিক শক্তিতে উদ্বিগ্ন, তারা পাকিস্তানের মাধ্যমে এই চীনা প্রযুক্তির সুপারসনিক মিসাইল সংগ্রহ করার বিষয়ে আগ্রহী হতে পারে।
সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে জানা গেছে, সৌদি আরবের সাথে পাকিস্তানের 'স্ট্র্যাটেজিক মিউচুয়াল ডিফেন্স এগ্রিমেন্ট' স্বাক্ষরিত হওয়ার পর থেকেই দুই দেশের সামরিক সম্পর্ক এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে। পাকিস্তান ইতিমধ্যে সৌদি আরবে জেএফ-১৭ ব্লক-৩ যুদ্ধবিমান মোতায়েন করেছে। এখন ফাতাহ-৩ মিসাইলটিও সৌদি আরবের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় যুক্ত হওয়ার জোরালো সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, যা রিয়াদকে ইরানের বিরুদ্ধে একটি শক্ত প্রতিরক্ষা বলয় তৈরিতে সাহায্য করবে।
ইরানের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং এর পারমাণবিক কর্মসূচির অনিশ্চয়তার কারণে সৌদি আরব তাদের ব্যালেস্টিক মিসাইল বাহিনীকে আধুনিকায়ন করতে চাইছে। পাকিস্তানের তৈরি বা পাকিস্তান-চীন যৌথ উদ্যোগের এই মিসাইলগুলো সৌদি আরবের ভিশন-২০৩০ লক্ষ্যমাত্রার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এর মাধ্যমে চীন সরাসরি লিপ্ত না হয়েও পাকিস্তানের মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যের অস্ত্র বাজারে নিজের প্রভাব বিস্তার করতে পারছে।
ফাতাহ-৩ মিসাইলের আত্মপ্রকাশ কেবল একটি অস্ত্রের সংযোজন নয়, এটি একটি ভূ-রাজনৈতিক চাল। এটি ভারত-পাকিস্তান সীমান্ত থেকে পারস্য উপসাগর পর্যন্ত যুদ্ধের গতিপ্রকৃতি বদলে দিতে পারে। এর ফলে আগামী দিনে দক্ষিণ এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যে প্রচলিত ও পারমাণবিক যুদ্ধের মাঝখানের যে ধোঁয়াশাচ্ছন্ন সীমানা রয়েছে, তা আরও সংবেদনশীল হয়ে উঠবে।