জলবায়ু পরিবর্তন আজ বাংলাদেশের জন্য একটি চলমান ও কঠিন বাস্তবতা। ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, বন্যা, খরা, নদীভাঙন ও লবণাক্ততার বিস্তার বাংলাদেশের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত কাঠামোর ওপর গভীর চাপ সৃষ্টি করছে। Global Climate Risk Index, World Risk Report, জাতিসংঘ, বিশ্বব্যাংক ও আইপিসিসির (IPCC) বিভিন্ন বিশ্লেষণে বাংলাদেশকে ধারাবাহিকভাবে বিশ্বের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর একটি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক এসব সূচক অনুযায়ী বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণে বাংলাদেশের অবদান ১ শতাংশেরও কম হলেও ক্ষতির মাত্রা তুলনাহীনভাবে অনেক অনেক গুণ বেশি।

বাংলাদেশের জলবায়ু ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা কয়েক দশকজুড়ে গড়ে ওঠা একটি প্রাতিষ্ঠানিক ও নীতিগত ধারাবাহিকতার অংশ। সেই ধারাবাহিকতার একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হলো বেগম খালেদা জিয়ার শাসনকাল (১৯৯১-১৯৯৬ ও ২০০১-২০০৬)। আজকের জলবায়ু অভিযোজন কাঠামো, দুর্যোগ প্রস্তুতি ও আন্তর্জাতিক জলবায়ু কূটনীতিতে বাংলাদেশের অবস্থান বুঝতে হলে সেই সময়কার বেগম জিয়ার নেওয়া উদ্যোগগুলো বিস্তারিত রিভিউ করা জরুরি।

বিশ্বব্যাংক ও জাতিসংঘের বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা এক মিটার বৃদ্ধি পেলে বাংলাদেশের প্রায় ১৭ শতাংশ ভূমি স্থায়ীভাবে প্লাবিত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়বে এবং দুই-তিন কোটি মানুষ বাস্তুচ্যুত হতে পারে।

এরই মধ্যে দেশের প্রায় ৪০ শতাংশ মানুষ উপকূলীয় ও দুর্যোগপ্রবণ এলাকায় বসবাস করছে। প্রতিবছর বন্যা, ঘূর্ণিঝড় ও নদীভাঙনজনিত ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ গড়ে জিডিপির ১ থেকে ২ শতাংশ, যা দেশের উন্নয়নগত অগ্রগতিকে সরাসরি ব্যাহত করে। তবে জলবায়ু ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ক্ষতি অনেকটা কমে এসেছে।

১৯৯১ সালের প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড় বাংলাদেশের ইতিহাসে এক গভীর জাতীয় ট্রমার সৃষ্টি করে।

এই দুর্যোগে প্রায় এক লাখ ৩৮ হাজার মানুষের প্রাণহানি ঘটে এবং রাষ্ট্রকে নতুন করে উপলব্ধি করায় যে প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলায় শুধু ত্রাণনির্ভর প্রতিক্রিয়া কার্যকর নয়। উল্লেখযোগ্য যে এই ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড়টি আঘাত হানে ১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিল, এমন এক সংক্রমণকালীন সময়ে যখন দেশটি রাজনৈতিকভাবে সদ্য রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। ১৯৯০ সালের গণ-আন্দোলনে রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের পতনের পর অন্তর্বর্তীকালীন রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে একটি তত্ত্বাবধায়ক সরকার নিরপেক্ষ নির্বাচনের লক্ষ্যে রাষ্ট্র পরিচালনা করে এবং সেই ধারাবাহিকতায় ১৯৯১ সালের মার্চে একটি গণতান্ত্রিক সরকার গঠিত হয়।

এই প্রেক্ষাপটে বেগম খালেদা জিয়া ১৯৯১ সালের ২০ মার্চ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের মাত্র এক মাসের মধ্যেই এই ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগের মুখোমুখি হন, যখন রাষ্ট্রযন্ত্র পুনর্গঠনের প্রাথমিক পর্যায়ে ছিলএই অভিজ্ঞতা নতুন সরকারকে স্পষ্টভাবে উপলব্ধি করায় যে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় তাৎক্ষণিক ত্রাণের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, আগাম প্রস্তুতি এবং ঝুঁকি হ্রাসভিত্তিক কাঠামো গড়ে তোলা অপরিহার্য

এই উপলব্ধির মধ্য দিয়েই বাংলাদেশে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় একটি মৌলিক দৃষ্টিভঙ্গিগত পরিবর্তনের সূচনা ঘটে, যা পরবর্তীকালে দেশের দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস ও অভিযোজন সক্ষমতা বৃদ্ধির ভিত্তি রচনা করে।

এই পরিবর্তনের প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায় ১৯৯৩ সালে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ব্যুরো (Disaster Management Burea) গঠনের মাধ্যমে। এর মাধ্যমে প্রথমবারের মতো দুর্যোগ ব্যবস্থাপনাকে উন্নয়ন পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত করা হয় এবং প্রতিক্রিয়াভিত্তিক ব্যবস্থাপনা থেকে ঝুঁকি হ্রাসভিত্তিক ব্যবস্থাপনায় রূপান্তরের পথ তৈরি হয়। এই কাঠামোই পরবর্তীকালে জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা নীতি, Standing Orders on Disaster এবং স্থানীয় পর্যায়ে দুর্যোগ প্রস্তুতির ভিত্তি হিসেবে কাজ করে।

একই সময়ে পরিবেশ শাসনব্যবস্থার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত সংস্কার হয়। ১৯৯২ সালে প্রণীত জাতীয় পরিবেশনীতি পরিবেশ সংরক্ষণকে উন্নয়নের মূলধারায় অন্তর্ভুক্ত করার একটি দিকনির্দেশনা দেয়। এর ধারাবাহিকতায় ১৯৯৫ সালে পরিবেশ সংরক্ষণ আইন প্রণীত হয়, যা দূষণ নিয়ন্ত্রণ, শিল্পকারখানার জন্য পরিবেশগত ছাড়পত্র বাধ্যতামূলক করা এবং পরিবেশ অধিদপ্তরকে কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা দেওয়ার ক্ষেত্রে একটি ভিত্তিমূলক আইন হিসেবে বিবেচিত হয়। পাশাপাশি National Environment Management Action Plan (NEMAP) প্রণয়নের মাধ্যমে পানি, বায়ু, মাটি ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণকে সমন্বিতভাবে বিবেচনার প্রচেষ্টা নেওয়া হয়।

দুর্যোগ প্রস্তুতির ক্ষেত্রে নব্বইয়ের দশকে খালেদা জিয়ার সরকারের সময় ঘূর্ণিঝড় প্রস্তুতি কর্মসূচি (CPP) উল্লেখযোগ্যভাবে সমপ্রসারিত হয়। যার মধ্যে রয়েছে উপকূলীয় ও দুর্গম এলাকায় স্বেচ্ছাসেবকের সংখ্যা বাড়ানো এবং নারী ও তরুণদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা। আগাম সতর্কবার্তা পৌঁছে দেওয়ার সক্ষমতা ৪৮ থেকে ৭২ ঘণ্টা আগে পর্যন্ত উন্নত করা। এর ফলে দুর্যোগের সময় মানুষের আশ্রয়কেন্দ্রে যাওয়া এবং উদ্ধার কার্যক্রম অনেক বেশি কার্যকর হয়ে ওঠে। ১৯৯১ থেকে ২০০৬ সালের মধ্যে উপকূলীয় অঞ্চলে এক হাজারের বেশি বহুমুখী ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র কার্যকর ব্যবহারে আসে, যা স্বাভাবিক সময়ে স্কুল বা কমিউনিটি সেন্টার হিসেবে ব্যবহৃত হতো।

এই উদ্যোগগুলোর ফলাফল ছিল অত্যন্ত স্পষ্ট। ১৯৭০ সালের ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড়ের তুলনায় পরবর্তী বড় ঘূর্ণিঝড়গুলোতে প্রাণহানি ৯০ শতাংশেরও বেশি কমে আসে। বাংলাদেশ দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় আন্তর্জাতিকভাবে একটি সফল উদাহরণ হিসেবে পরিচিতি পায়, যা জলবায়ু অভিযোজন সক্ষমতার একটি বড় সাফল্য।

উপকূলীয় সুরক্ষা ব্যবস্থার ক্ষেত্রেও এ সময়ে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। ছয় হাজার কিলোমিটারের বেশি বাঁধ ও পোল্ডার ব্যবস্থার উন্নয়ন ও রক্ষণাবেক্ষণের মাধ্যমে জলোচ্ছ্বাস ও লবণাক্ততার প্রবেশ অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে আনা হয়। একই সঙ্গে উপকূলীয় গ্রিন বেল্ট ও সামাজিক বনায়ন কর্মসূচি সম্প্রসারিত হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, একটি পরিপক্ব ম্যানগ্রোভ বন জলোচ্ছ্বাসের শক্তি ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমাতে সক্ষম। সুন্দরবন এই প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা হিসেবে প্রতিবছর বাংলাদেশকে বিপুল ক্ষয়ক্ষতি থেকে রক্ষা করছে।

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব শুধু প্রাকৃতিক দুর্যোগের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, এটি খাদ্য নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য, জীবিকা ও দারিদ্র্যের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। নব্বইয়ের দশকের শুরুতে বাংলাদেশের দারিদ্র্যের হার ছিল ৫৬ শতাংশের বেশি। বেগম খালেদা জিয়ার সরকার কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির মাধ্যমে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর সহনশীলতা বাড়ানোর চেষ্টা করে। খাদ্যশস্য উৎপাদনের উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি জলবায়ু অভিঘাত মোকাবেলায় একটি শক্ত ভিত্তি তৈরি করে। যার ফলে দারিদ্র্যের হার ৪০ শতাংশে এবং অতি দারিদ্র্যের হার ২৫.১ শতাংশে নেমে আসে।

তার দ্বিতীয় মেয়াদে, ২০০৫ সালে প্রণীত National Adaptation Programme of Action (NAPA) ছিল বাংলাদেশের প্রথম আনুষ্ঠানিক জলবায়ু অভিযোজন পরিকল্পনা। এতে উপকূলীয় বনায়ন, লবণাক্ততা ও খরা সহনশীল ফসল গবেষণা, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে অভিযোজন অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ২০০২ সালে এক আন্তর্জাতিক কর্মশালায় তিনি মন্তব্য করেন যে ‘কিছু দেশের জন্য জলবায়ু পরিবর্তন জীবনযাত্রার হুমকি হলেও বাংলাদেশের মতো দেশের জন্য এটি সরাসরি বেঁচে থাকার প্রশ্ন।’ এই দৃষ্টিভঙ্গিই পরবর্তীকালে বাংলাদেশ Climate Change Strategy and Action Plan এবং আন্তর্জাতিক অভিযোজন তহবিল আহরণের ভিত্তি তৈরি করে।

জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে যুক্ত নগর ঝুঁকি মোকাবেলায় বেগম জিয়া নগর পরিবেশ ব্যবস্থাপনায়ও বেশ কিছু সাহসী সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। ২০০২ সালে পাতলা পলিথিন ব্যাগ নিষিদ্ধ করা হয়, যা নগর জলাবদ্ধতা ও নদীদূষণ কমাতে ভূমিকা রেখেছে। ২০০৩ সালে ঢাকায় টু-স্ট্রোক থ্রি-হুইলার নিষিদ্ধ করার মাধ্যমে বায়ুদূষণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে এবং শ্বাসকষ্টজনিত রোগের হার হ্রাস পায়। এসব উদ্যোগ জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে যুক্ত নগর ঝুঁকি মোকাবেলায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে।

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বেগম খালেদা জিয়া ধারাবাহিকভাবে জলবায়ু ন্যায়বিচারের প্রশ্নটি তুলে ধরেন। ১৯৯২ সালের রিও আর্থ সামিট থেকে শুরু করে সার্ক ও জাতিসংঘের বিভিন্ন ফোরামে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণে খুবই সামান্য ভূমিকা রাখলেও ক্ষতির বোঝা বহন করছে সবচেয়ে বেশি।’ তিনি অভিযোজন তহবিল, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং উন্নত দেশগুলোর ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালনের ওপর গুরুত্বারোপ করেন, যার মাধ্যমে বাংলাদেশ জলবায়ু ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর কণ্ঠস্বর হিসেবে আন্তর্জাতিকভাবে দৃশ্যমান হয়।

তবে রাজনৈতিক অস্থিরতা, প্রশাসনিক দুর্বলতা এবং দুর্নীতির অভিযোগ অনেক ক্ষেত্রে নীতির বাস্তবায়নকে ব্যাহত করেছে। কিছু উদ্যোগ পর্যাপ্ত অর্থায়ন ও নজরদারির অভাবে প্রত্যাশিত ফল দিতে পারেনি। তবু এটাও সত্য যে আজকের ডেল্টা প্ল্যান ২১০০, BCCSAP কিংবা আন্তর্জাতিক ক্ষতিপূরণ দাবির মতো উদ্যোগগুলোর বীজ সেই সময়েই রোপিত হয়েছিল।

আজ যখন জলবায়ু পরিবর্তন বাংলাদেশের অস্তিত্বের প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। তখন বেগম খালেদা জিয়ার সময়কার উদ্যোগ আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে সীমিত সম্পদ ও বৈশ্বিক উদাসীনতার মধ্যেও সঠিক দৃষ্টিভঙ্গি ও পরিকল্পনা থাকলে ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব। বাংলাদেশের জলবায়ু ভবিষ্যৎ নিরাপদ করতে হলে অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়েই এগোতে হবে।