কার্যকর ও প্রাণবন্ত সংসদ চায় বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। আজ সকালে শুরু হওয়া ত্রয়োদশ সংসদকে বিএনপি চায় সংসদীয় গণতন্ত্রের উদাহরণ করতে। এজন্য সংসদে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সংলাপ ও ঐকমত্যের ভিত্তিতে জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুর সমাধান করতে চায় দলটি। একই সঙ্গে সংসদকে একটি কার্যকর ও অর্থবহ প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ বিএনপি। এদিকে মন্ত্রী এবং দলের সংসদ সদস্যদের (এমপি) চলনে-বলনে মার্জিত ও সতর্ক থাকতে বলেছেন বিএনপি চেয়ারম্যান, সংসদ নেতা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। মন্ত্রিসভার তরুণ সদস্যদের নিয়মিত ও সময়মতো অফিস করার ওপর জোর দেন। পাশাপাশি সামনের দিনগুলোতে করণীয় বিষয়ে মন্ত্রী ও এমপিদের দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। গতকাল সকালে জাতীয় সংসদ ভবনে বিএনপির সংসদীয় দলের প্রথম সভায় এ পরামর্শ ও নির্দেশনা দেন প্রধানমন্ত্রী। সভায় অংশ নেওয়া একাধিক এমপি জানান, গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলার ক্ষেত্রেও মন্ত্রী-এমপিদের সতর্ক থাকতে বলেছেন প্রধানমন্ত্রী। বিশেষ করে যার যে দায়িত্ব, তার বাইরে যেন কেউ মন্তব্য না করেন এ বিষয়ে তিনি গুরুত্ব আরোপ করেন। সভাপতির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বিএনপির নেওয়া জনকল্যাণমুখী বিভিন্ন কর্মসূচি এবং সামনের দিনগুলোতে করণীয় বিষয়ে মন্ত্রী-এমপিদের দিকনির্দেশনা দেন। সভায় বিএনপির নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচির প্রসঙ্গ টেনে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের ফ্যামিলি কার্ড নিয়ে অনেকে অনেক কথা বলেছেন। কিন্তু ভোটের আঙুলের কালির দাগ মোছার আগেই আমরা প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন শুরু করেছি। এটাই হচ্ছে বিএনপি। এই বিএনপিই মানুষ দেখতে চায়।’
তারেক রহমান বলেন, ‘দ্রুত সময়ের মধ্যে ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি বাস্তবায়নের পাশাপাশি সারা দেশে খাল খনন শুরু করা হবে।’ ডেঙ্গুর মৌসুম সামনে রেখে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে সবাইকে সতর্ক নির্দেশনা দেন তিনি। জুলাই জাতীয় সনদের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘সনদের কিছু বিষয়ে বিভিন্ন পক্ষের নোট অব ডিসেন্ট রয়েছে। সরকার যেসব বিষয় বাস্তবায়নযোগ্য, সেগুলো বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেবে।’ মন্ত্রিসভার তরুণ সদস্যদের নিয়মিত ও সময়মতো অফিস করার ওপর জোর দেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘মন্ত্রিসভায় অনেক সিনিয়র নেতা আছেন। বিশেষ করে তরুণদের সকাল ৯টার মধ্যে অফিসে যেতে হবে।’ অফিসে যাওয়া-আসার ক্ষেত্রে ট্রাফিক আইন মেনে চলারও পরামর্শ দেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী নিজেও ট্রাফিক আইন মেনে চলেন বলে সভায় উল্লেখ করেন। এ ছাড়া দৈনন্দিন জীবনযাপনের প্রতিটি ক্ষেত্রে কৃচ্ছ্রসাধনের আহ্বান জানিয়ে তিনি আরও বলেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি বিশেষ করে ইরান ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের উত্তেজনা বিশ্ব অর্থনীতিতে চাপ সৃষ্টি করছে।’ সভায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘জুলাই জাতীয় সনদের বিষয়ে বিএনপি যতটুকুতে সম্মত হয়েছে, সরকার ততটুকুই বাস্তবায়ন করবে।’
সভায় অংশ নেওয়া শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাস এমপি বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী সবাইকে সংসদের আচরণবিধি মেনে অংশ নেওয়া ও শৃঙ্খলা বজায় রাখার নির্দেশনা দিয়েছেন। সভায় স্পিকার, ডেপুটি স্পিকার ও উপনেতা নির্বাচনের দায়িত্ব প্রধানমন্ত্রী ওপর দেওয়া হয়েছে।’
আরেক সংসদ সদস্য শাহাদাত হোসেন সেলিম বলেন, ‘মন্ত্রী-এমপিদের সময়মতো অফিস করা, সংসদীয় নিয়মনীতি মেনে চলার জন্য সতর্ক থাকতে বলেছেন। সবাইকে বিতর্কের ঊর্ধ্বে থেকে কাজ করার কথা বলেছেন।’ বেলা সোয়া ১১টায় সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে সভা শুরু হয়। সভা শেষ হয় ১টার দিকে। সভায় সংসদের চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মণি স্বাগত বক্তব্য দেন। এরপর বক্তব্য দেন বিএনপি মহাসচিব, স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। সভার মঞ্চে প্রধানমন্ত্রীর এক পাশে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও সালাহউদ্দিন আহমদ এবং অন্য পাশে চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মণি বসেন। সভায় বিএনপির ২০৯ জন সংসদ সদস্য অংশ নেন।
প্রাণবন্ত সংসদ গড়তে চায় সরকার : সরকার একটি কার্যকর ও প্রাণবন্ত সংসদ গড়ে তুলতে চায় বলে জানিয়েছেন চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মণি। তিনি বলেন, ‘আলোচনা ও সংলাপের মাধ্যমেই সংসদের ভিতরে সব সমস্যার সমাধান করা সম্ভব।’ গতকাল সংসদে সরকারদলীয় সংসদ সদস্যদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের এ কথা বলেন চিফ হুইপ। তিনি বলেন, ‘মানুষের ভোটের অধিকার প্রতিষ্ঠা, ভাতের অধিকার নিশ্চিত ও গণতন্ত্র সুসংহত করার লক্ষ্যে আমাদের প্রধানমন্ত্রী যে দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম ও ত্যাগ স্বীকার করেছেন, তারই ধারাবাহিক প্রতিফলন হচ্ছে আজকের এই জাতীয় সংসদ।’ তিনি বলেন, ‘জাতীয় সংসদ কেবল একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানই নয়, এটি বাংলাদেশের মানুষের অধিকার, মর্যাদা ও গণতান্ত্রিক আকাক্সক্ষার প্রতীক। আমাদের লক্ষ্য হচ্ছে একটি কার্যকর, প্রাণবন্ত ও দায়িত্বশীল সংসদ পরিচালনা করা।’ তিনি বলেন, ‘আমরা চাই সংসদে জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়সমূহ নিয়ে গঠনমূলক আলোচনা, যুক্তিপূর্ণ তর্ক ও সুস্থ বিতর্কের পরিবেশ সৃষ্টি হোক।’ তিনি বলেন, ‘আমরা বিশ্বাস করি যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সংলাপ ও ঐকমত্যের ভিত্তিতে জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়সমূহের সমাধান করা সম্ভব এবং সেই পথ ধরেই আমরা জাতিকে আরও শক্তিশালী ও স্বাবলম্বী ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে নিতে পারব।’
স্পিকার ও সংসদ উপনেতা পদে এগিয়ে যাঁরা : বিএনপির নির্ভরযোগ্য একাধিক সূত্র জানিয়েছেন, বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির বেশির ভাগ সদস্যকে মন্ত্রিসভার পাশাপাশি সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ দেওয়া হলেও ড. আবদুল মঈন খান ও গয়েশ্বর চন্দ্র রায় এখনো সরকারের বাইরে আছেন। স্পিকারের আসনে বসতে পারেন স্থায়ী কমিটির অন্যতম সদস্য ড. আবদুল মঈন খান। ক্লিন ইমেজের নেতা হিসেবে মঈন খানকে স্পিকার নির্বাচিত করার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি। আর সংসদের উপনেতা পদে গয়েশ্বর চন্দ্র রায়ের নাম আলোচনায় আছে।
জানা গেছে, মঈন খান মোট পাঁচবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। দলের ভিতরে স্পিকার পদে বর্ষীয়ান এই পালামেন্টারিয়ানকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। মঈন খানের বাবা ড. আবদুল মোমেন খান জিয়াউর রহমান সরকারের মন্ত্রী ছিলেন। আরেক বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ গয়েশ্বর চন্দ্র রায়কে সংসদের উপনেতা হিসেবে বা অন্য কোনো গুরুত্বপূণ পদে দেখা যেতে পারে। খালেদা জিয়ার মন্ত্রিসভার প্রতিমন্ত্রী ছিলেন গয়েশ্বর চন্দ্র রায়। অনেকের মতে প্রবীণ নেতা ড. মঈন খানকে স্পিকার পদে নির্বাচিত করা হলে তিনি ভালো করবেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক হিসেবে সবার কাছে গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে তাঁর। ডেপুটি স্পিকার পদে আলোচনায় আছেন চারজন। এঁরা হলেন কিশোরগঞ্জ-৩ আসন থেকে নির্বাচিত সাবেক শিক্ষামন্ত্রী ড. মুহাম্মদ ওসমান ফারুক, এয়ার ভাইস মার্শাল আলতাফ হোসেন চৌধুরী, ভাইস চেয়ারম্যান জয়নুল আবেদীন, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির (বিজেপি) চেয়ারম্যান আন্দালিব রহমান পার্থ।
প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে এবি পার্টির প্রতিনিধিদলের বৈঠক : প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জুর নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল। গতকাল দুপুরে প্রধানমন্ত্রীর সংসদ ভবন কার্যালয়ে এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সাক্ষাতে মজিবুর রহমান মঞ্জু দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক বঞ্চনা ও স্বৈরশাসনের অবসানের পর জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে দেশের দায়িত্ব গ্রহণ করায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে অভিনন্দন জানান। তিনি দলের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রীকে দুটি পৃথক চিঠি হস্তান্তর করেন। প্রধানমন্ত্রী প্রতিনিধিদলের বক্তব্য ধৈর্য সহকারে শোনেন এবং দেশ ও জনগণের পক্ষে ইতিবাচক রাজনীতির ওপর গুরুত্বারোপ করেন। এবি পার্টির প্রতিনিধিদলে ছিলেন দলের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান মেজর (অব.) আবদুল ওহাব মিনার, সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ এবং দপ্তর সম্পাদক আবদুল্লাহ আল মামুন রানা।
ডেঙ্গু মোকাবিলায় পরিচ্ছন্নতা অভিযানের ঘোষণা প্রধানমন্ত্রীর : ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ার মতো মরণঘাতী রোগ থেকে জনগণকে রক্ষা করতে আগামী ১৪ মার্চ থেকে সারা দেশে বড় পরিসরে পরিচ্ছন্নতা অভিযান শুরুর ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। গতকাল দেশবাসীর উদ্দেশে দেওয়া বিশেষ ভিডিও বার্তায় এ ঘোষণা দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। একই সঙ্গে তিনি এ রোগ মোকাবিলায় সবাইকে সচেতন হওয়ার এবং প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার উদাত্ত আহ্বান জানিয়েছেন।