একটি রাজনৈতিক দল অনেক কিছু পরিবর্তন করতে পারে-প্রার্থী, স্লোগান, প্রচারণার কৌশল, নেতৃত্ব, এমনকি নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছানোর ভাষাও। কিন্তু একটি বিষয় কোনো দলই পরিবর্তন করতে পারে না-ইতিহাস।
কুষ্টিয়ায় ১৬ আগস্টের এক সমাবেশে জামায়াতের সংসদ সদস্য মুফতি আমির হামজা ‘রাজাকার’ ও ‘আল-বদর’ শব্দ দু’টিকে ‘ভারতীয় নাটক’ বলে উড়িয়ে দিয়েছেন বলে খবর প্রকাশিত হয়েছে। যদি খবরটি সঠিকভাবে উদ্ধৃত হয়ে থাকে, তাহলে এই মন্তব্য ঐতিহাসিক নথির কোনো গুরুতর জবাব নয়; বরং এটি মূল বিষয় থেকে দৃষ্টি সরানোর চেষ্টা।
জামায়াতের জন্য সমস্যাটি হলো, ১৯৭১-এর ইতিহাস আজকের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের ওপর নির্ভর করে না। এটি ভারত, কোনো একটি সংবাদপত্র বা কোনো একটি সরকারের ওপরও নির্ভরশীল নয়। সমসাময়িক নথি, ঐতিহাসিক বিবরণ, বিভিন্ন রেফারেন্স গ্রন্থ, পাকিস্তানি উৎস, রাজনৈতিক প্রকাশনা এবং বিচারিক নথিতে এই ইতিহাস সংরক্ষিত রয়েছে।
বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে পর্যালোচিত প্রমাণ এড়িয়ে যাওয়া বিশেষভাবে কঠিন। কামারুজ্জামানের বিরুদ্ধে মামলার কার্যক্রমে সুপ্রিম কোর্টের রায়ে এমন ঐতিহাসিক উপাদান উদ্ধৃত হয়েছে, যেখানে আল-বদরকে জামায়াত ও তাদের ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্রসংঘের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি ‘অ্যাকশন সেকশন’ বা সশস্ত্র শাখা হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। রায়ে জামায়াত নেতাদের সঙ্গে পাকিস্তানি সামরিক কর্তৃপক্ষের সম্পর্ক এবং আল-বদর ও আল-শামস গঠনের বিষয়ও পর্যালোচনা করা হয়েছে।
গোলাম আযমের মামলার রায়ে আরও বিস্তৃতভাবে জামায়াতের স্বাধীনতাবিরোধী অবস্থানের প্রেক্ষাপটে শান্তি কমিটি, রাজাকার, আল-বদর ও আল-শামসের গঠন ও কার্যক্রমে জামায়াতের ভূমিকা-সংক্রান্ত প্রমাণ পরীক্ষা করা হয়েছে। ট্রাইব্যুনাল নিয়ে রাজনৈতিক মতপার্থক্য যাই থাকুক না কেন, এগুলো বিচারিক নথি, যেখানে ঐতিহাসিক প্রমাণ বিস্তারিতভাবে পর্যালোচনা করা হয়েছে-এসবকে স্রেফ ‘ভারতের বানানো’ বলে উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
তাহলে কোনো জামায়াত নেতা যখন রাজাকার ও আল-বদরের ঐতিহাসিক পরিচয়কে ‘ভারতীয় নাটক’ বলে অভিহিত করেন, তখন স্বাভাবিক প্রশ্ন ওঠে: ভারত ঠিক কী বানিয়েছিল? ভারত কি বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতায় জামায়াতের অবস্থান বানিয়েছিল? তারা কি জামায়াতের ছাত্র সংগঠনের যুদ্ধকালীন কর্মকাণ্ড বানিয়েছিল? পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সঙ্গে সহযোগিতার সমসাময়িক বিবরণ কি ভারত তৈরি করেছিল? আল-বদর, আল-শামস ও শান্তি কমিটি সম্পর্কে ঐতিহাসিক নথিও কি ভারত জাল করেছিল?এই প্রশ্নগুলো ‘ভারতীয় ষড়যন্ত্র’ যুক্তির দুর্বলতা প্রকাশ করে। প্রমাণ এসেছে একাধিক উৎস থেকে এবং বিচারিক কার্যক্রমে সেগুলো পরীক্ষা করা হয়েছে। প্রকৃত প্রশ্ন হলো, ইতিহাসের কিছু অংশ কি এখনো জামায়াতের কাছে এতটাই অস্বস্তিকর যে দলটি সেগুলোর মুখোমুখি হতে চাইছে না?
বাংলাদেশের একটি প্রতিষ্ঠিত তথ্যসূত্র বাংলা পিডিয়া আল-বদরকে ১৯৭১ সালের যুদ্ধের সময় পাকিস্তান সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় গঠিত একটি আধাসামরিক বাহিনী হিসেবে বর্ণনা করেছে, যার উদ্দেশ্য ছিল দখলদার বাহিনীকে সহায়তা করা। গণহত্যা সম্পর্কে তাদের বিবরণে স্বাধীনতার আন্দোলন দমনে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর পাশাপাশি রাজাকার, আল-বদর ও আল-শামসের ভূমিকার কথাও উল্লেখ রয়েছে।
এটি শুধু জামায়াতকে কেউ পছন্দ করে কি না বা অপছন্দ করে কি না-সেই প্রশ্ন নয়। এটি প্রমাণের প্রশ্ন। আর প্রমাণ গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এর পরিণতি ছিল বাস্তব এবং ভয়াবহ। ১৯৭১ সালের ডিসেম্বরে বাঙালি বুদ্ধিজীবীদের হত্যাকাণ্ড বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সবচেয়ে অন্ধকার অধ্যায়গুলোর একটি। ঐতিহাসিক ও বিচারিক নথিতে বুদ্ধিজীবী হত্যার অভিযানে পাকিস্তানি সামরিক কর্তৃপক্ষ এবং তাদের স্থানীয় সহযোগীদের ভূমিকা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। কিন্তু এখানেই সাম্প্রতিক জামায়াতের বক্তব্য আরও গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করে।
২০২৫ সালের ১৪ ডিসেম্বর জামায়াতের শীর্ষ এক নেতা দাবি করেছিলেন যে বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ড ছিল ভারতীয় সেনাবাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর একটি সুপরিকল্পিত ষড়যন্ত্রের অংশ। তাঁর যুক্তি ছিল, পাকিস্তানি বাহিনী, রাজাকার ও আল-বদরের সদস্যরা তখন আত্মসমর্পণ বা পালিয়ে যাওয়ায় ব্যস্ত ছিলেন এবং তাই তারা হত্যাকাণ্ড ঘটাতে পারেননি।এটি কেবল ইতিহাসের ব্যাখ্যা নিয়ে মতপার্থক্য নয়। এটি বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে মর্মান্তিক অধ্যায়গুলোর একটি সম্পর্কে দীর্ঘদিনের প্রতিষ্ঠিত বিবরণকে মৌলিকভাবে চ্যালেঞ্জ করা। জামায়াতের কাছে নতুন কোনো প্রমাণ থাকলে তা উপস্থাপনের অধিকার তাদের রয়েছে। কিন্তু অস্বাভাবিক ঐতিহাসিক দাবির জন্য শক্তিশালী প্রমাণ প্রয়োজন। কোনো রাজনৈতিক নেতা জনসমাবেশে একটি দাবি করলেই তা প্রতিষ্ঠিত সত্যে পরিণত হতে পারে না।
সাম্প্রতিক বিতর্ক জামায়াতের নিজেদের বক্তব্যের মধ্যেও একটি অমীমাংসিত দ্বন্দ্ব প্রকাশ করছে। ২০২৫ সালের মে মাসে জামায়াত নেতা এ টি এম আজহারুল ইসলামকে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সুপ্রিম কোর্ট খালাস দেওয়ার পর জামায়াতের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ দল বা তার কর্মীদের দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত যেকোনো ব্যক্তির কাছে নিঃশর্ত ক্ষমা চেয়েছিলেন।
এরপর অক্টোবরে দলের শীর্ষ নেতা ১৯৪৭ সাল থেকে জামায়াতের কারণে সৃষ্ট যেকোনো কষ্টের জন্য আবারও নিঃশর্ত ক্ষমা চান। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, তিনি স্বীকার করেন যে ১৯৭১ সালে জামায়াত পাকিস্তান ভেঙে যাওয়ার বিরোধিতা করেছিল এবং বলেন, দলটির নেতৃত্বের উচিত ছিল বাংলাদেশের মানুষের আকাঙ্ক্ষাকে সম্মান করা।
এই স্বীকারোক্তি অবশ্যই গুরুত্ব পাওয়ার যোগ্য। কিন্তু একটি সাধারণ ক্ষমাপ্রার্থনা বিস্তারিত ঐতিহাসিক জবাবদিহির সমতুল্য নয়। এতে দলটির সাংগঠনিক ভূমিকা, পাকিস্তানি সামরিক কর্তৃপক্ষের সঙ্গে তার সম্পর্ক এবং তার রাজনৈতিক ও ছাত্র নেটওয়ার্কের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বাহিনীগুলোর কর্মকাণ্ড নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায় না। আর যখন এমন একটি ক্ষমা প্রার্থনার পর জামায়াতেরই জ্যেষ্ঠ নেতারা বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের সম্পূর্ণ ভিন্ন ব্যাখ্যা দেন, তখন জনগণের প্রশ্ন করার অধিকার রয়েছে-দলটি কি সত্যিই তার অতীতের মুখোমুখি হয়েছে, নাকি শুধু সেই অতীত নিয়ে কথা বলার ভাষা বদলেছে?
এ টি এম আজহারুল ইসলামের বিষয়টিও একইভাবে আলাদা করে দেখা জরুরি। ২০২৫ সালের মে মাসে সুপ্রিম কোর্ট তাকে খালাস দেওয়ার পর তিনি মানবতাবিরোধী মামলায় দণ্ডিত ও মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া অন্যান্য জামায়াত নেতার মৃত্যুদণ্ডকে ‘বিচারিক হত্যাকাণ্ড বলে অভিহিত করেন এবং এর জন্য দায়ীদের বিচারের দাবি জানান।
তার ব্যক্তিগত মামলায় সুপ্রিম কোর্টের সিদ্ধান্ত অবশ্যই সম্মান করতে হবে। কিন্তু একটি ফৌজদারি মামলায় খালাস পাওয়া মানেই মুক্তিযুদ্ধের সময় জামায়াতের বৃহত্তর রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক অবস্থান সম্পর্কে ঐতিহাসিক প্রশ্নের নিষ্পত্তি হয়ে যাওয়া নয়। এই পার্থক্যটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
জামায়াতের বর্তমান নেতৃত্বের যুক্তি দেওয়ার অধিকার রয়েছে যে আজকের দলটি ১৯৭১ সালের সংগঠন থেকে ভিন্ন। রাজনৈতিক দল পরিবর্তিত হতে পারে। সংগঠন সংস্কার হতে পারে। নতুন প্রজন্ম পূর্বসূরিদের কাছ থেকে উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া ধারণাগুলো নতুনভাবে মূল্যায়ন ও সংশোধন করতে পারে। কিন্তু প্রকৃত পরিবর্তনের জন্য অতীতের সঙ্গে সৎভাবে হিসাব-নিকাশ করা প্রয়োজন।
আজকের জামায়াত যদি সত্যিই ভিন্ন হয়ে থাকে, তাহলে তাদের স্পষ্টভাবে বলতে সক্ষম হওয়া উচিত: আমরা ঐতিহাসিক নথিকে স্বীকার করি, আমরা ভুক্তভোগীদের কষ্টকে স্বীকৃতি দিই এবং আমরা সেই রাজনৈতিক অবস্থান প্রত্যাখ্যান করি, যা আমাদের পূর্বসূরিদের বাংলাদেশের মানুষের আকাঙ্ক্ষার বিপরীতে দাঁড় করিয়েছিল। এর চেয়ে কম কিছু করলে এমন ধারণা তৈরি হতে পারে যে দলটি জবাবদিহিতার নৈতিক বোঝা ছাড়াই রাজনৈতিক পুনর্বাসনের সুবিধা নিতে চায়।
জামায়াতের কিছু নেতার আরেকটি বক্তব্যও প্রত্যাখ্যান করা দরকার-আজকের তরুণ বাংলাদেশিরা আর মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে ভাবেন না। এই ধারণা শুধু ভুল নয়; এটি তরুণদের প্রতি অবজ্ঞাপূর্ণও। তরুণ বাংলাদেশিরা তাদের বাবা-মা ও দাদা-দাদির প্রজন্মের চেয়ে ভিন্নভাবে ১৯৭১ নিয়ে আলোচনা করতে পারেন। তারা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের রাজনৈতিক ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারেন। কোনো রাজনৈতিক দলের মুক্তিযুদ্ধের উত্তরাধিকারকে একচেটিয়া করে নেওয়ার চর্চাকে তারা প্রত্যাখ্যান করতে পারেন। কিন্তু এসবের কোনোটির অর্থ এই নয় যে তারা মুক্তিযুদ্ধ ভুলে গেছে।
বরং চলমান বিতর্কই এর বিপরীত প্রমাণ করে। জামায়াত নিজেই ১৯৭১-এর বিভিন্ন দিককে ক্রমাগত ব্যাখ্যা, রক্ষা, পুনর্মূল্যায়ন ও বিতর্ক করে চলেছে। ইতিহাস যদি সত্যিই তরুণ প্রজন্মের কাছে অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যেত, তাহলে আজকের রাজনৈতিক নেতাদের এতটা প্রচেষ্টা চালিয়ে সেটিকে নতুনভাবে ব্যাখ্যা করার প্রয়োজন হতো না। তরুণ বাংলাদেশিদের বলা যে তাদের ১৯৭১ নিয়ে ভাবা উচিত নয়-এটি রাজনৈতিক প্রজ্ঞা নয়। এটি ঔদ্ধত্য।
মুক্তিযুদ্ধ আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জামায়াত বা অন্য কোনো রাজনৈতিক সংগঠনের সম্পত্তি নয়। এটি বাংলাদেশের। এর ইতিহাস তাদের, যারা সেই সময় বেঁচে ছিলেন-যেসব পরিবার প্রিয়জন হারিয়েছে, যুদ্ধের কারণে বাস্তুচ্যুত হওয়া লাখো মানুষ, স্বাধীনতার জন্য লড়াই করা মুক্তিযোদ্ধা এবং অগণিত সাধারণ মানুষ, যারা সহিংসতা ও নিপীড়নের শিকার হয়েছেন। এই কারণেই প্রতিটি অস্বস্তিকর ঐতিহাসিক প্রশ্নকে ভারতীয় ষড়যন্ত্রে পরিণত করার ব্যাপারে জামায়াতের অত্যন্ত সতর্ক থাকা উচিত।
বাংলাদেশিরা প্রশ্ন করার অধিকার রাখে। তারা প্রমাণ দাবি করার অধিকার রাখে। তারা ভিন্ন ভিন্ন বিবরণ পরীক্ষা করার অধিকার রাখে। এবং শক্তিশালী প্রমাণ ছাড়া দেশের প্রতিষ্ঠার ইতিহাসকে নতুনভাবে লেখার প্রচেষ্টা প্রত্যাখ্যান করার অধিকারও তাদের রয়েছে।
জামায়াতের রাজনীতিতে অংশ নেওয়ার পূর্ণ গণতান্ত্রিক অধিকার রয়েছে। তাদের সমর্থকদেরও দলটির পক্ষে অবস্থান নেওয়া এবং সমালোচকদের চ্যালেঞ্জ করার পূর্ণ অধিকার রয়েছে। কিন্তু গণতন্ত্র কোনো রাজনৈতিক সংগঠনকে ইতিহাস পুনর্লিখনের অধিকার দেয় না, কিংবা জাতিকে কী মনে রাখতে হবে তা নির্ধারণ করার অধিকারও দেয় না।
জামায়াত তাদের প্রার্থী বদলাতে পারে, স্লোগান বদলাতে পারে, প্রচারণার কৌশল নতুন করে সাজাতে পারে এবং অতীতের জন্য ক্ষমা চাইতে পারে। তারা নিজেদের নতুনভাবে উপস্থাপন করতে পারে এবং নতুন প্রজন্মের কাছে নতুন রাজনৈতিক চেহারা তুলে ধরতে পারে। কিন্তু তারা ১৯৭১-কে নতুন করে লিখতে পারে না।
তারা তাদের পূর্বসূরিদের নেওয়া সিদ্ধান্ত মুছে ফেলতে পারে না, নথিভুক্ত ইতিহাস মুছে ফেলতে পারে না কিংবা বর্তমান রাজনৈতিক সুবিধার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ইতিহাসকে বদলে দিতে পারে না। কোনো পুনর্ব্র্যান্ডিং অতীতকে পরিবর্তন করতে পারে না; কোনো স্লোগান তাকে নীরব করতে পারে না; কোনো রাজনৈতিক প্রচারণা মুক্তিযুদ্ধকে অদৃশ্য করে দিতে পারে না। নথি রয়ে গেছে। সাক্ষ্য রয়ে গেছে। ঐতিহাসিক রেকর্ড রয়ে গেছে। আর ভুক্তভোগীদের স্মৃতিও রয়ে গেছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো-বাংলাদেশ রয়ে গেছে।
জামায়াত যদি সত্যিই তার অতীতের অধ্যায় বন্ধ করতে চায়, তাহলে তার একমাত্র বিশ্বাসযোগ্য পথ হলো সেই অধ্যায়ের সৎভাবে মুখোমুখি হওয়া। প্রমাণে যা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে তা স্বীকার করা। ১৯৭১ সালে নেওয়া রাজনৈতিক সিদ্ধান্তগুলো কেন ভুল ছিল তা ব্যাখ্যা করা। ভুক্তভোগীদের কষ্টকে স্বীকৃতি দেওয়া। এবং কথা ও কাজের মাধ্যমে দেখানো-কীভাবে মৌলিক পরিবর্তন ঘটেছে। এটাই হবে রাজনৈতিক পরিপক্বতা।
জামায়াত যা করতে পারে না, তা হলো যে পাতাগুলো তাদের অপছন্দ সেগুলো ছিঁড়ে ফেলে বাংলাদেশকেই সেই পাতাগুলো মনে রাখার জন্য অভিযুক্ত করা। রাজনীতিবিদরা অস্বীকার করলেই ইতিহাস অদৃশ্য হয়ে যায় না। মৃতরা, শহীদরা এসব অস্বীকারের জবাব দিতে পারেন না। কিন্তু নথি পারে। প্রমাণ পারে। একটি জাতির স্মৃতি পারে। তাই জামায়াতের প্রকৃত পরীক্ষা হলো, তারা বাংলাদেশিদের ১৯৭১ ভুলিয়ে দিতে পারে কি না-তা নয়। বরং তারা প্রমাণ করতে পারে কি না যে তারা সত্যিই ১৯৭১ থেকে শিক্ষা নিয়েছে।
যতদিন না তারা তা করতে পারছে, ততদিন ‘ভারতীয় নাটক’ বলে ঐতিহাসিক নথিকে উড়িয়ে দেওয়ার প্রতিটি প্রচেষ্টা, বুদ্ধিজীবী হত্যার দায় অন্যের ওপর চাপানোর প্রতিটি প্রচেষ্টা এবং তরুণ বাংলাদেশিরা মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে আর আগ্রহী নয়-এমন প্রতিটি দাবি কেবল সেই প্রশ্নটিই আরও জোরালো করবে, যার উত্তর জামায়াত এখনো দিতে পারেনি:
দলটি কি সত্যিই তার ইতিহাসের মুখোমুখি হয়েছে-নাকি শুধু সেই ইতিহাস নিয়ে কথা বলার ধরন বদলেছে? জামায়াত হয়তো ১৯৭১-এর পরবর্তী অধ্যায়ে যেতে চায়। কিন্তু বাংলাদেশের সত্য থেকে দূরে সরে যাওয়ার কোনো বাধ্যবাধকতা নেই।